খুঁজে পাওয়া - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প।

 আমার আজকের গল্পের নায়ক নায়িকা আদি আর মিতালী—ভালোবাসার বিয়ে তাদের। সবাইকে না জানিয়ে নয়, লড়াই করেই একসাথে হওয়া। দুই পরিবার প্রথমে মানতে চায়নি, তবুও সময়ের সাথে আর তাদের জেদের সাথে হার মেনে অবশেষে মেনে নিয়েছিল। তখন তাদের মনে হয়েছিল—এবার আর কোনো কিছুই আমাদের আলাদা করতে পারবে না।

কলেজেই প্রথম পরিচয় হয় তাদের, বন্ধুত্ব, তারপর ভালোবাসা। কত স্বপ্ন দেখেছিল তারা দুজন দুজনের কাঁধে মাথা রেখে —একসাথে একটা ছোট্ট সংসার, কাজের ফাঁকে এক কাপ চা, ছুটির দিনে ঘুরতে যাওয়া। সে স্বপ্ন কি করে বিফলে যেতে দিত তারা!


বিয়ের প্রথম বছরটা যেন স্বপ্নের মতো কেটেছিল।

ছোট্ট ফ্ল্যাট, বেশ সাজানো গোছানো! মিতালী মনের মত করে সাজিয়েছিল নিজের সংসারটাকে একটু একটু করে। ব্যালকনিতে ফুলের গাছ, রান্নাঘরের মসলার কৌটো , জানালার পর্দা , দেওয়ালে ফটো ফ্রেম আরো কত কিছু । 


সকালে একসাথে চা খাওয়া, রাতে একসাথে রান্নাকরা— তো কখনো কখনো একে অপরের অবস্থা বুঝে বলা -

--"আজ তুমি রান্না করো না, আমি করছি

--না, তুমি বসো, আমি করে দিচ্ছি"


এই ছোট ছোট ভালোবাসাগুলোতেই ভরেছিল তাদের সংসার। কিন্তু সময় বদলাতে বেশি দেরি হয় না দুজনেরই কাজের চাপ বাড়তে থাকে।

মিতালী একটা কর্পোরেট অফিসে চাকরি করে —রয়েছে ডেডলাইন, প্রেজেন্টেশন, বসের চাপ।

আদি আইটি কোম্পানিতে—রাত জাগা, ক্লায়েন্ট কল, স্ট্রেস। সকাল ৮টায় বেরিয়ে গেলে কখনো রাত ৯টা, কখনো ১০টা—বাড়িতে ফিরে দুজনেই ক্লান্ত।

প্রথমে তারা চেষ্টা করত-একে অপরকে সময় দিতে। চেষ্টা করত ভালো-মন্দ কথা বলতে।কিন্তু ক্লান্ত শরীর আর মাথা… কথাগুলো আর বেরোত না। তারপর ধীরে ধীরে কথার জায়গায় আসতে লাগল অভিযোগ।


“তুমি আগে এমন ছিলে না…” — মিতালীর গলায় কষ্ট।

“তুমিও তো বদলে গেছো!” — আদির রাগ।


আর পারছিল না মিতালী। তাই একদিন সে এদিকে বলল—

“আমরা একসাথে থাকি বটে, কিন্তু আমাদের মধ্যে কোনো ‘আমরা’ নেই।”


আদি চুপ করে ছিল। কারণ সে জানত—কথাটা ভুল নয়। ধীরে ধীরে ঝগড়া বাড়তেই থাকে। কখনো রাতের খাবার নিয়ে, কখনো ফোন না ধরার জন্য, তো কখনো সময় না দেওয়া নিয়ে… 

ছোট ছোট কথা বড় হতে হতে একদিন এমন জায়গায় পৌঁছাল, যেখানে ভালোবাসাটাই যেন চাপা পড়ে গেল অহংকারের নিচে।

একদিন রাতে, খুব বড় ঝগড়া হয় তাদের মধ্যে।

“তুমি কখনো সময় দাও না!” — মিতালীর কণ্ঠে অভিমান।

“আমি কি ইচ্ছা করে দিই না? কাজটা না করলে চলবে?” —আদি চিৎকার করে ওঠে। তারপর দীর্ঘ নীরবতা। সেই নীরবতা ভেদ করে মিতালী ধীরে বলে—

“এইভাবে আর আমি পারছি না… আমাদের একটু দূরে থাকা উচিত।”


আদি চোখ বন্ধ করে।

তার ভেতরে হাজারটা কথা… কিন্তু মুখে আসে শুধু—

“ঠিক আছে…”


পরদিন মিতালী নিজের কিছু জিনিস গুছিয়ে নেয়।

আলমারি খুলতেই থেমে যায়— ওখানে তাদের একসাথে তোলা ছবি, আদির দেওয়া শাড়ি…

সবকিছু যেন তাকে থামাতে চায়। তবুও সে বেরিয়ে যায়।


মিতালী ফিরে আসে তার বাপের বাড়িতে। ঘরটা চেনা, মানুষগুলো আপন… তবুও যেন কোথাও একটা শূন্যতা।

রাতে বিছানায় শুয়ে সে অভ্যাস মতো পাশ ফিরতে গিয়ে থেমে যায়—ওখানে তো কেউ নেই আর। তার মনে পড়ে—আদির হাসি, তার ছোট ছোট যত্ন, অফিস থেকে ফেরার পর “কেমন ছিল দিনটা?” বলে জিজ্ঞেস করা… এসব কি সত্যিই শেষ? পর মুহূর্তেই আবার মনে পড়ে যায় মান অভিমান গুলোর কথা।


ওদিকে আদি…প্রথম কয়েকদিন নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করে।বন্ধুদের সাথে কথা বলে, কাজে ডুবে থাকে। কিন্তু বাড়িতে ফিরলেই সেই নিঃসঙ্গতা। সেই সাথে সারা ঘরময় এখন শুধু ছড়িয়ে থাকে নিঃশব্দতা। ডাইনিং টেবিলে একা বসে খাওয়া, রান্নাঘরে মিতালীর না থাকা, আলমারিতে তার শাড়িগুলোর গন্ধ…সবকিছু তাকে ভেতর থেকে কেমন যেন ভেঙে দেয়।


তবুও—অভিমান।

ও আগে ফোন করুক…না, কেন আমি করব?”

এই অদৃশ্য দেয়ালটা ভাঙতে পারে না কেউ।


এভাবেই কেটে যায় কয়েকটা বিরহ মাখা দিন। তারপর আসে পয়লা বৈশাখ। মিতালীদের বাড়িতে আজ কোনো উৎসব নেই। পাড়ায় ঢাক বাজছে, বাচ্চারা নতুন জামা পরে ঘুরছে… কিন্তু মিতালী চুপচাপ বারান্দায় বসে আছে। তার মনে পড়ে—গত বছরের দিনটার কথা। সকালে কত যত্ন করে বাড়ি সাজিয়েছিল সে—আলপনা, ফুল, পর্দা… দিয়ে 

আদি তাকে হাতে হাতে সাহায্য করেছিল।


তারপর সকালে সে রান্না করেছিল—, ইলিশ মাছ ভাজা আর আলু ভর্তা সঙ্গে ছিল পান্তা… দুপুরে ছিল মাছের কালিয়া, ইলিশ ভাপা, মাটন আর ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত।

আদি খেতে খেতে বলেছিল—

“তোমার হাতের রান্না খাওয়ার জন্যই আমি বেঁচে আছি!”


তারপর বিকেল বেলা তারা গিয়েছিল মেলায় - 

ভিড়ের মধ্যে আদি তার হাত শক্ত করে ধরেছিল, যেন হারিয়ে না যায়। আজ সেই হাতটা নেই। মিতালী আর ধরে রাখতে পারে না নিজেকে দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে তার।


ওদিকে আদি…আজ বাড়িতে একদম একা।

ঘড়ির কাঁটা চলছে, কিন্তু সময় যেন থেমে গেছে।আজ অফিস নেই। তাই সে বিছানায় পড়ে আছে এখনও। মিতালী থাকলে এতক্ষণ খুব রাগ করত আর বলতো বছরের প্রথম দিন এমন অলসের মতো শুয়ে থেকো না তো! নেই তার সেই শাসন,

নেই ঘর সাজানো, রান্নাঘরে নেই কোনো সুস্বাদু খাবারের গন্ধ, সবকিছু ফাঁকা।


এমন সময় হঠাৎ তার চোখ পড়ে একটা পুরনো ছবিতে—

পয়লা বৈশাখের দিন, মিতালী লাল-সাদা শাড়িতে, হাসছে… আর পাশে দাঁড়িয়ে আছে সে । তা দেখে তার বুকটা যেন আরো ভারী হয়ে উঠল।

আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সে উঠে দাঁড়ায়।

তারপর গাড়ির চাবিটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ।


রাস্তার দুপাশে উৎসব, কিন্তু তার চোখে শুধু একটা বাড়ি—মিতালীদের।গাড়ি থামিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকে। হাত কাঁপছে তার সেই সাথে বুক ধুকপুক করছে। তারপর নিজেকে সামলে বেল দেয় দরজায় । দরজা খোলে মিতালী। দুজনেই স্থির। কত কথা জমে আছে… তবুও কেউ কিছু বলতে পারছে না। শেষে মিতালীই বলে—

“ কেন এলে?”


আদি ধীরে বলে—

“তোমাকে নিতে… 


মিতালীর চোখ দুটো চিকচিক করে উঠলো। তারপর কাঁপা কন্ঠে বলল-

“এতদিন কোথায় ছিলে?”


আদি মাথা নিচু করে বলে—

“নিজের ভুল বুঝতে… আর তোমাকে ছাড়া বাঁচা কতটা কঠিন সেটা শিখতে।”


কোনো কথা বলে না মিতালী। তা দেখে আদি তার দিকে আরো একটু এগিয়ে এসে বলে—

“আমরা কি আবার চেষ্টা করতে পারি না? ঝগড়া থাকবে, সমস্যা থাকবে… কিন্তু আমরা থাকব একসাথে।”


মিতালী ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। সেদিন দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে তারা আবার একসাথে ফিরে আসে বাড়িতে।


বাড়িতে ঢুকে মিতালী চারপাশে তাকায়—

সবকিছু একই আছে, শুধু একটু ধুলো জমেছে।

সে আদির দিকে এক ঝলক তাকিয়ে মুচকি হেসে— লেগে পড়ে ঘর পরিষ্কার করতে আর আদিও তাকে ঠিক গত বছরের মত হাতে হাতে সাহায্য করে।


কাজ শেষে সন্ধ্যে বেলা তারা এসে বসে বারান্দায়। দুজনের হাতে এক কাপ চা। নিচে ঢাক বাজছে, মানুষ আনন্দ করছে…আর উপরে, দুটো মানুষ আবার নিজেদের খুঁজে পাচ্ছে।


#খুঁজে_পাওয়া 

#রূপবালা_সিংহ_রায়....🖋️


গল্পটা কেমন লাগলো জানাতে ভুলবেন না কিন্তু। 


সাঁঝবাতির রূপকথায় - Rupbala Singha Roy




মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।