এসো হে বৈশাখ এসো এসো - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // পহেলা বৈশাখ।

 -- বাবান, এই বাবান। উঠবি তো, তানাহলে গায়ে জল ঢেলে দেবো কিন্তু ছোটবেলাকার মতো। 


-- মা, তুমি না বড্ড জ্বালাও! কি হয়েছে বলবে একটু দয়া করে। আর ভাল লাগে না, ধূর! কেন দিনকে দিন আমার ঘুমের শত্রু হয়ে উঠছো বলতে পারো? আর তাছাড়া এত সকাল সকাল উঠে কি রাজ কার্য করব আমি শুনি এই ছুটির দিনে?


-- চল ওঠ। আর উঠে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে।


-- কেন, সেটা তো বলবে?


-- আমি অতশত বলতে পারবো না। যা বলছি তাই কর দেখি, দেরি হয়ে যাচ্ছে।


-- আমি কি করব তাতে? তোমরা দেখছি একটু শান্তি দেবে না আমায়! বিয়ে বিয়ে করে মাথাটা গেছে দেখছি তোমাদের! কোথায় ভাবলাম রবি,সোম, মঙ্গল পর পর তিনদিন ছুটি একটু মনের সুখে বেলা পর্যন্ত ঘুমাবো তা নয় রবি সোমটা মেয়ে দেখতে যাওয়ার চক্করে ঘুমটা নষ্ট করলে আমার। আজ মঙ্গলবার তার ওপর পয়লা বৈশাখ এই দিনটাতেও নিস্তার দেবে না।


-- না দেবো না। ওঠ তো এবার ঝটপট করে।


-- না উঠবো না। তোমরা যাও। কানা খোঁড়া যাকে পছন্দ করবে তাকেই বিয়ে করবো। যাও তো আর জ্বালিও না আমায় বলে মায়ের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে আর্য সময় দেখার জন্য চোখ রাখল মোবাইল স্ক্রিনে। সর্বনাশ এখন ভোর সাড়ে চারটে! আর শুয়ে থাকতে পারলো না সে। উঠে বসে এক ঝটকায়। তারপর মাকে টেনে নিয়ে তার পাশে বসিয়ে বলে -- কি হয়েছে বলো তো তোমার মা? এত সকাল সকাল কেউ ডাকে? তোমার মাথাটা কি খারাপ হয়ে গেল?


-- হ্যাঁ খারাপ হয়ই বটে। ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বছরের একটা বুড়ো দামড়া ছেলে বিয়ে না করে টো টো করে ঘুরে বেড়ালে মা জেঠিমাদের মাথা খারাপই হয় বটে। 


-- আমি তো বলেছি তোমাদের, তোমরা সব ঠিকঠাক করো আমি ঠিক হাজির হয়ে যাব বিয়ের দিন।


-- হ্যাঁ আমরাই তো থাকবো তার সাথে তাই না!


-- তা তোমরা থাকবে না তো কে থাকবে শুনি? আমি কি তাকে বগলদাবা করে বাড়ি আর অফিস করব?


-- বেশি ফাজলামি করবি না বাবান উঠে পড় বলছি তা না হলে ওদিকে তোর জ্যাঠাইমা আবার চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তুলবে।


 মায়ের কথা শেষ না হতে হতেই কানে এলো জ্যাঠাইমার কণ্ঠস্বর -- কইরে ছোট তোদের হলো? বানানটা কি উঠলো? জ্যাঠাইমার আওয়াজ পেয়ে আর্য দৌড়ে চলে গেল তৈরি হতে। সারা বাড়িতে এই একজনকেই আর্য বেশি ভয় পায়। সেই ছোটবেলা থেকেই। ভয়ের থেকে বলা ভালো তাঁর কথা সে অমান্য করতে পারে না। মায়ের পছন্দ করে বের করে দেওয়া পাঞ্জাবি পাজামাটা পরে মা আর জ্যাঠাইমার সঙ্গে সে রওনা দিল পাটুলি। সেখানে তার পিসতুতো দিদির বাড়ি। পহেলা বৈশাখ সেখানে খুব ধুমধুম করে পালন করা হয়। পাড়ার সবাই মিলে বের হয় প্রভাত ফেরিতে নতুন বছরকে সমারোহে স্বাগত জানানোর জন্য। মেয়েরা পরে শাড়ি আর ছেলেরা পাঞ্জাবি পাজামা। কেউ কেউ তো আবার ধুতিও পরে ফেলে নিজেকে আদ্যোপান্ত বাঙালি বোঝানোর জন্য। একবার আর্য অবশ্য গিয়েছিল সেখানে। খুব আনন্দে কাটিয়েছিল সে দিনটা । মনটা বেশ ভালো হয়ে যায় এই ভেবে যে কিছু হোক আর না হোক বছরের প্রথম দিনের শুরুটা তো ভালো কাটবে।


অবশেষে তারা পৌনে ছটা নাগাদ এসে পৌঁছায় দিদির বাড়িতে। প্রভাত ফেরিতে যাওয়ার জন্য তৈরি দিদি ও জামাইবাবু। সঙ্গে একরত্তি ভাগ্নিটাও। মা জ্যাঠাইমা আর গেল না অত হাঁটতে পারবে না বলে। কিন্তু বারবার করে বলে দিল নটার মধ্যে যেন সে ফিরে আসে মেয়ের বাড়িতে যেতে হবে। তারপর আবার বাড়িতেও ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি পয়লা বৈশাখ বলে কথা। ঠিক আছে বলে সে রওনা দিল দিদি জামাইবাবুর সঙ্গে। 


হাঁটতে বেশ ভালই লাগছে তার। মিষ্টি একটা সকাল ফুরফুরে হাওয়া বইছে। সূর্যটা তার তীক্ষ্ণ কিরণ ছড়াতে শুরু করলেও এত সবুজ গাছপালা পেরিয়ে তা আর গা পর্যন্ত এসে পৌঁছাচ্ছে না। সবাই গলায় গলা মিলিয়ে গাইছে রবি ঠাকুরের গান - "এসো হে বৈশাখ এসো এসো.."। এতগুলো গলার মধ্যে সবচেয়ে সুরেলা কণ্ঠস্বরের মেয়েটার দিকে নজর পড়ল আর্যর। বেশ সুন্দরী। যেমনি দেখতে তেমনি মিষ্টি তার গলা। চাইলেও সে চোখ ফেরাতে পারছে না তার দিক থেকে। ইতিমধ্যে দিদি জামাইবাবু একটু পিছিয়ে পড়েছে যেহেতু ভাগ্নিটা ছোট হাঁটতে পারছে না। গানটা শেষ। সবাই ধরেছে অন্য একটা গান - "জাগো নতুন প্রভাত জাগো.. " হাঁটতে হাঁটতে আর্য পাশ থেকে শুনতে পায় -- আপনি কি চোখ দিয়ে গান শোনেন? সে চমকে তাকিয়ে দেখে সেই মেয়েটা! কি বলবে ভেবে না পেয়ে আমতা আমতা করতে থাকে সে। তাকে অমন করতে দেখে মেয়েটা বলল -- আপনি যে এমন স্বভাবের কই আপনার দিদি মানে অপর্ণা দি তো আগে বলেনি আমায় ? আদ্যোপান্ত কিছু মাথায় ঢোকার আগেই মেয়েটা এগিয়ে গেছে। অচেনা অজানা একটা মেয়ে হঠাৎ করে এসে এতগুলো কথা শুনিয়ে যাওয়ায় খুব রাগ হলো তার। এই মেয়েগুলোর হচ্ছে এই এক দোষ! চোখ কি চলে যেতে পারে না? সুন্দর জিনিসকে কে না দেখতে চায়? আমি কি সেই অর্থে তাকিয়ে ছিলাম! দূর আর হাঁটবোনা ভেবে, দিদি জামাইবাবুকে বাড়ি যাচ্ছি বলে সে ফিরে গেল বাড়িতে। দিদি জামাইবাবুর মুখে ওর বাড়ি যাওয়ার কথা শুনে মা আর জ্যাঠাই মা একা একাই মেয়ে দেখে বাড়ি ফিরে এলেন।


দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ। পয়লা বৈশাখ বলে কথা এত ভালো-মন্দ খেয়ে একটা ঘুম না দিলে হয় তাই ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে আর্য নিজের ঘরে যেতে যাবে এমন সময় জ্যাঠাই মা তার হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিয়ে বললেন -- দয়া করে খুলে দেখো বাবা। তা না হলে পরে সত্যি সত্যি কানা খোঁড়া হলে কিছু কিন্তু বলতে পারবেনা আমাদের। আমরা প্রায় পাকা কথা দিয়েই এসেছি। ওদের তোমাকে পছন্দ। মেয়েরও তোমাকে পছন্দ হয়েছে। আমাদেরও মেয়েকে পছন্দ। এবার একটা ভালো দিন পেলেই হবে। জ্যাঠাই মা যে এখনো রেগে আছেন তা ভালই বুঝতে পারছে আর্য। তাই কোনো কথা না বলে খামটা হাতে নিয়ে চলে আসে নিজের ঘরে। সব যখন প্রায় ঠিকঠাক হয়েই গেছে, দেখে নি একবার কানা খোঁড়া কিনা তা না হলে কপালে দুর্ভোগের শেষ থাকবে না ভেবে মুচকি হেসে খামটা খুলে ছবিটা বের করল সে। তারপর একটা পলক পড়তেই দেখতে পেল সেই মেয়েটাকে। আরে এ তো সকালে সেই মেয়েটা। আমি নিশ্চিত এটাই সেই মেয়েটার ছবি। একটা অজানা ভালো লাগা কাজ করতে থাকে তার মধ্যে। এর মাঝেই হঠাৎই মনে পড়ে জ্যাঠাইমার কথাটা। জ্যাঠাইমা বলছিল - তারও নাকি আমাকে পছন্দ হয়েছে। ও দিদির কথা বলছিল না তখন তার মানে ও জেনে বুঝেই বলেছে কথাগুলো। ও চিনত আমাকে! ছবিটা দেখতে দেখতে চোখ পড়ে খামের ওপর। সেখানে একটা ফোন নাম্বার লেখা আছে। ওটা ওরই হবে ভেবে ফোন লাগায় সে তাকে...


ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসে সেই সুরেলা কণ্ঠস্বর।

-- হ্যাঁ বলুন আর্য বাবু।


-- কি করে জানলেন আমি?


-- আপনার নাম্বারটা আমার কাছে সেভ করা আছে তাই। এবার দেখছি আপনার মাথায় বুদ্ধিটাও একটু কম আছে। 


-- তা একটু আছে বইকি। একটা মেয়ে কেন এতগুলো কথা বলতে গেল হঠাৎ করে সেটা বুঝতে না পেরে শুধু শুধু রাগ করে চলে এলাম... দিদির কথা বললেন তাও বুঝতে পারলাম না...


-- স্বীকার করছেন তাহলে..


-- তা করছি। আপনার কাছে স্বীকার করতে কোনো লজ্জা নেই


-- বুঝলাম। তো শুধু কি এইটুকু বলার জন্য ফোন করেছেন নাকি অন্য কিছু বলবেন?


-- না মানে..


-- আচ্ছা ঠিক আছে রাখি তাহলে, 


-- আরে রাখছেন কেন? আমি কি তাই বললাম 


-- কিছুই তো বলছেন না। না মানে বলে ফুল স্টপ।

আমি কিন্তু যা বলার আপনার মা আর জ্যাঠাই মাকে বলে দিয়েছি। এখন আপনার পালা 


-- বলছি আমি না প্রত্যেক বছর পয়লা বৈশাখের দিন আপনার গলায় "এসো হে বৈশাখ এসো এসো" গানটা শুনতে চাই 


-- তা বেশ তো, প্রত্যেক বছর চলে আসুন এখানে


-- না মানে আমি চাই আপনি এখানে আসুন আমার বাড়িতে। তাহলে কষ্ট করে আর আমায় ওখানে যেতে হবে না


-- আপনার দিদি না ঠিকই বলে আপনি সোজা কথা সোজা ভাবে বলতে পারেন না


--আপনি আসুন না শিখিয়ে দেবেন


-- তাই করতে হবে দেখছি


#এসো_হে_বৈশাখ_এসো_এসো 

#রূপবালা_সিংহ_রায়...🖋️©️


গল্পটা কেমন লাগলো জানাতে ভুলবেন না কিন্তু। আপনাদের লাইক কমেন্ট ও শেয়ার নতুন নতুন গল্প লিখতে অনুপ্রেরণা দেয়। ভালো থাকবেন সেই সাথে পেজে নতুন হলে পেজটিকে ফলো করে রাখুন যাতে করে লেখাগুলো আপনার কাছে পৌঁছাতে পারে। শুভ নববর্ষের আগাম শুভেচ্ছা রইল।





মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।