হারানো বসন্ত - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // বাংলা রোমান্টিক গল্প।

হারানো বসন্ত 

রূপবালা সিংহ রায় 

Harano Basanti written by Rupbala Singha Roy// Bangla Golpo// Bengali Story // Romantic Story ।



 বিকেলের শেষ আলোটা তখন ধীরে ধীরে নেমে আসছে। শীতের রেশ কেটে গিয়ে হালকা বসন্তের হাওয়া শহরের গায়ে নরম একটা ছোঁয়া দিয়ে যাচ্ছে। কলেজ স্ট্রিটের পুরোনো বইয়ের দোকানগুলোর সামনে ভিড় কমে এসেছে। অর্ক একটা বই হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু পড়ছিল না—চোখ ছিল অন্য কোথাও, বহু বছর আগের এক সময়ে। পুরনো স্মৃতি এক এক করে ভেসে উঠছে মনের কোঠর থেকে। আজ ভীষণ ইচ্ছা করছে একজনের সঙ্গে দেখা করতে। বহু বছর পর তার খোঁজ নিতে। সেই জন্যই বোধহয় সে এসে হাজির কলেজ স্ট্রিটের পুরনো বইয়ের গলিতে। যদি দেখা হয়! যদি সে আসে!


 গত এক মাস ধরে চলছে তার এই কলেজ স্ট্রিটে আনাগোনা। মনে কেবল একটাই আশা, একবার দেখা হোক ওর সাথে। বেশি কিছু নয় একটু চোখের দেখা। কিন্তু সেই আশারা তার আসার কথাটা বোধ হয় মসৃণ করতে পারেনি তাই হয়তো তারা দেখা পাচ্ছে না সে। এই ভেবে বইয়ের দোকান থেকে বেরিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।


হঠাৎ পিছন থেকে ভেসে এলো একটা পরিচিত কণ্ঠ—“অর্ক?”


শব্দটা যেন বুকের ভেতর কোথাও আঘাত করল। ধীরে ধীরে সে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখল সামনে অনু।


বছর দশেক কেটে গেছে। কিন্তু অনুর চোখদুটো একটুও বদলায়নি—সেই গভীরতা, সেই নরম আলো। শুধু মুখে একটু পরিণত শান্তি, আর কোথাও একটা চাপা ক্লান্তি।


দুজনেই কয়েক মুহূর্ত নিচুপু। এত বছর পর দেখা, কত কথা জমে আছে , কথার ঝাঁপিরা বাইরে আসার জন্য ছটফট করছে অথচ তারা যেন গলায় এসে আটকে রয়েছে ‌। দুজনের গলা থেকে বেরোচ্ছে না একটাও আওয়াজ।


অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর অনু বলল “কেমন আছ?” 


অর্ক হালকা হাসে বলল “ভালো… মানে, চলে যাচ্ছে। তুমি?”


“আমিও,” অনু উত্তর দিল, কিন্তু তার গলায় যেন একটা অদ্ভুত কাঁপন ছিল।


একসময় তারা ছিল অবিচ্ছেদ্য। কলেজের প্রথম বর্ষে পরিচয়। লাইব্রেরির নীরবতা ভেঙে প্রথম আলাপ। অর্ক কবিতা লিখত, অনু শুনত। বসন্তের দুপুরে কৃষ্ণচূড়ার নীচে দাঁড়িয়ে অনু যখন হেসে বলত, “তুমি ছাড়া আর কাউকে ভালোবাসতে পারব না,” তখন অর্ক সত্যিই বিশ্বাস করত, পৃথিবীতে এমন ভালোবাসা আর নেই।


কিন্তু জীবন কখনো গল্পের মতো সরল থাকে না।


অর্ক তখন চাকরি খুঁজছে। বাড়িতে আর্থিক চাপ। অনুর পরিবার ছিল কড়া—ওরা চেয়েছিল মেয়ের বিয়ে হোক প্রতিষ্ঠিত কারও সঙ্গে। অর্কের স্বপ্ন ছিল বড় কিছু করার, কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে ছিল অনিশ্চয়তা। আর অনুর পরিবার সেই অনিশ্চয়তাকে মেনে নিতে পারেনি।


সেই দিনটা আজও অর্কের মনে আছে। অনু কাঁদতে কাঁদতে বলছিল—“আমি তোমায় ছাড়া বাঁচতে পারব না। তাই ঠিক করেছি বাবা মাকে ছেড়ে তোমার কাছে চলে আসব। দুজন থাকবো একসাথে। আমি টিউশনি করব। আর তুমি চাকরির পরীক্ষায় বসবে। দেখবে একদিন ঠিক তুমি চাকরিটা পেয়ে যাবে। তখন আর বাবা-মা আমাদের অস্বীকার করতে পারবে না”


কিন্তু পারেনি অর্ক, পারেনি আনুর সাথে সাধ মেলাতে। তাই চোখের জলটা চোখেই আটকেসে বলেছিল—

“আমি চাই না তুমি আমার জন্য তোমার পরিবারের বিরুদ্ধে যাও। আমি তোমাকে ভালোবাসি অনু, কিন্তু তাই বলে এই কাজটা আমি করতে পারবো না।”


অনু চিৎকার করে বলেছিল, “এটা ভালোবাসা না, এটা পালিয়ে যাওয়া!”


তারপর… নীরবতা।ফোন বন্ধ। মেসেজের উত্তর নেই।

কয়েক মাস পর খবর এসেছিল—অনুর বিয়ে ঠিক হয়েছে।


আজ এত বছর পর, সেই দুই মানুষ আবার মুখোমুখি।


--“তুমি এখন কোথায় থাকো?” অর্ক জিজ্ঞেস করল।


--“দিল্লিতে ছিলাম অনেক বছর। এখন আবার কলকাতায় ফিরেছি। একটা স্কুলে পড়াই,” অনু বলল।


--“বাহ, তুমি তো সবসময় শিক্ষক হতে চাইতে।”


“সব স্বপ্ন পূরণ হয় না, অর্ক যাক সে কথা শুনেছি তুমি এখন নাকি নিজের স্টার্টআপ চালাও?”


অর্ক একটু লজ্জা পেল। “হ্যাঁ, অনেক লড়াইয়ের পর দাঁড় করাতে পেরেছি। তখন যদি…”


সে থেমে গেল। বাকিটা বলা হলো না।


অনু তাকিয়ে রইল। “তখন যদি কী?”


“তখন যদি একটু আর সাহসী হতাম,” অর্ক ধীরে বলল। “হয়তো গল্পটা অন্যরকম হতো।”


ছল ছল চোখ দুটো নিয়ে অনু বলল

--“জানো অর্ক অনেক ঘৃণা করেছি। ভেবেছিলাম তুমি আমাকে ছেড়ে দিলে কারণ তুমি আমাকে যথেষ্ট ভালোবাসোনি।”


অর্ক অবাক হয়ে তাকাল। “আমি তো ভেবেছিলাম তুমি আমাকে ভুলে গেছ।”


“ভুলে যাওয়া কি এতোই সহজ?”অনু হালকা হেসে বলল। 


--তবুও তো ভুলতে হয়!


--হয়তো


 -- আচ্ছা ছাড়ো ওসব কথা। তোমার পরিবারে কে কে আছে বলো 


--“আমার বিয়ে… টেকেনি অর্ক।”


অর্ক যেন শব্দ হারিয়ে ফেলল। “মানে?”


“দু’বছর পর ডিভোর্স। আমরা একে অপরকে বুঝতেই পারিনি। আমি চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু কোথাও মনে হতো, আমি যেন নিজেকে মিথ্যে বলছি।”


চারপাশে বসন্তের হাওয়া বইছে। কাছের গাছে কচি পাতা দুলছে, কোথাও দূরে শিমুল আর পলাশ লাল হয়ে ফুটে আছে। মানুষের ভিড় বাড়ছে, কিন্তু তাদের দুজনের চারপাশে যেন একটা আলাদা নীরবতা তৈরি হয়েছে।


“আমি তোমাকে খুঁজেছিলাম,” অনু বলল। “তোমার নম্বর বদলে গিয়েছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও ছিলে না।”


অর্ক মাথা নিচু করল। “আমি পালিয়েছিলাম, অনু। তোমার বিয়ের খবর শোনার পর সব বন্ধ করে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম এটাই ভালো।”


অনু ধীরে বলল, “তুমি কি এখনো আমাকে দোষ দাও?”


অর্ক মাথা নাড়ল। “না। আমি শুধু নিজেকে দোষ দিই। আমি যদি তোমার হাতটা শক্ত করে ধরতাম, যদি বলতাম—‘চলো, একসাথে লড়ি’…”


অনু হঠাৎ তার হাত ছুঁয়ে দিল। স্পর্শটা নরম, পরিচিত, তবু কাঁপা।

“আমরা দুজনেই ভয় পেয়েছিলাম,” সে বলল। “তুমি ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তাকে, আমি পরিবারের চাপকে। ভালোবাসা ছিল, কিন্তু সাহস ছিল না।”


দুজনেই হাসল—একটা তিক্ত হাসি, তবু মুক্তির হাসি।


“এখন?” অর্ক আস্তে জিজ্ঞেস করল।


অনু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “এখন আমরা বড় হয়েছি। অনেক কিছু হারিয়েছি, অনেক কিছু শিখেছি। প্রশ্ন হলো—আমরা কি আবার শুরু করতে পারব?”


অর্কের বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়ছে। এত বছর পর, এত কষ্টের পর—আবার?


“আমি জানি না ভবিষ্যৎ কী,” অর্ক বলল। “কিন্তু একটা জিনিস জানি—আমি আর পালাতে চাই না।”


অনুর চোখ ভিজে উঠল। “আমিও না।”


হঠাৎ হালকা বসন্তের বাতাসে পলাশের পাপড়ি উড়ে এসে অনুর চুলে আটকে গেল। অর্ক আস্তে হাত বাড়িয়ে পাপড়িটা সরিয়ে দিল।

অনু মৃদু হেসে বলল, “মনে আছে? তুমি বলেছিলে, আমাদের ভালোবাসা বসন্তের মতো—কঠিন শীতের পর হঠাৎ ফিরে আসে, সবকিছু নতুন করে রাঙিয়ে দেয়।”


অর্ক নরম গলায় বলল, “আর পুরোনো শুকনো ডালেও নতুন কুঁড়ি ফোটায়।”


অনু ধীরে বলল, “আমাদের ভালোবাসা হয়তো থেমে গিয়েছিল। কিন্তু তার বীজটা… মাটির গভীরে রয়ে গিয়েছিল।”


বসন্তের গন্ধে ভরা হাওয়ার মধ্যে তারা পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। কোনো বড় প্রতিশ্রুতি নয়, কোনো নাটকীয় ঘোষণা নয়। শুধু একসাথে হাঁটা।


অর্ক মনে মনে ভাবল—ভালোবাসা কখনো কখনো সময়ের কাছে হেরে যায়, কিন্তু যদি দুজন মানুষ আবার সাহস খুঁজে পায়, তাহলে সেই ভালোবাসা নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে।


অনু হঠাৎ বলল, “অর্ক, এবার যদি আবার কোনো ঝড় আসে?”


অর্ক তার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল,

“তাহলে এবার আমরা দুজনেই হাত ধরে থাকব। বসন্তকে হারাতে দেব না।”


পলাশে রাঙা আকাশের নীচে, পুরোনো প্রেমিক-প্রেমিকা আবার নতুন করে পথ চলা শুরু করল।

হয়তো তারা জানে না শেষটা কী হবে।

কিন্তু এবার তারা জানে—ভালোবাসা শুধু অনুভূতি নয়, সাহসের নামও।


আর বহু বছর পর সেই সাহসটাই তারা আবার খুঁজে পেল—একটা নতুন বসন্তের শুরুতে। 


#হারানো_বসন্ত 

#রূপবালা_সিংহ_রায়....🖋️





গল্পটা কেমন লাগলো জানাতে ভুলবেন না কিন্তু। ভালো লাগলে শেয়ার করতে পারেন। ভালো থাকবেন 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।