জন্মদিনের পায়েস - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প।
জন্মদিনের পায়েস
রূপবালা সিংহ রায়
সবাই ব্যস্ত যে যার কাজে । কারোরই ফুরসৎ নেই । ছেলে তৈরি হচ্ছে অফিস যাবে । বৌমা ব্যস্ত নাতি নাতনি দুটোকে নিয়ে । তাদের স্কুলে পাঠাতে হবে । তার উপর ঘরের কাজ-রান্নাবান্না । সকাল সকাল প্রতিটা বাড়িতে যেমনটা হয় আর কি ! কারোরই নজর গেল না নিশিকান্ত বাবুর দিকে । যে মানুষটা কাক ভোরে বার হয়ে যান হাঁটতে , তিনি কেন আজ বাড়িতে রয়েছেন ?কেউ জানতেই চাইলো না ! নিশিকান্ত বাবু নিজেকে বোঝালেন সবাই ব্যস্ত , তাড়াহুড়ো করছে তাই হয়তো কারোর মনে নেই । ছেলে বেরিয়ে গেল অফিসে । বৌমা বাচ্চাদের নিয়ে গেল স্কুলে । নিশিকান্ত বাবু খবরের কাগজখানা নিয়ে গিয়ে বসলেন বাইরের বারান্দায় । খানিক বাদে বৌমাকে বাড়ি ফিরতে দেখে গলা খাঁকরে আওয়াজ দিতে লাগলেন নিশিকান্ত বাবু । বৌমাকে কাছে আসতে দেখে বেশ উৎসাহে আনন্দে মুখে ফুটে উঠলো একগাল হাসি । বৌমা তাঁর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল -"বাবা জল খাবার খেয়েছেন" ? উনি মাথা নেড়ে "না" উত্তর দিলেন । "এত বেলা হতে চলল , এখনো খাননি ! খাবার তো টেবিলে রেখে গিয়েছিলাম । বলে গেলাম খেতে তবুও না খেয়ে বসে আছেন ! সুগারের পেসেন্ট শরীর খারাপ করলে কে দেখবে শুনি ? শুধু তো দেখাশোনা নয় খরচাটাও তো হবে । আক্কেল মানুষের! ওনার আবার কি ....." -রাগে গজগজ করতে করতে বৌমা ঘরে চলে গেল । গোবেচারা মুখ করে খাবারটা খেতে খেতে বৌমাকে না বলা কথাগুলো ভাবতে লাগলেন নিশিকান্ত বাবু -"তোমার জন্যই তো অপেক্ষা করছিলাম বৌমা । ভেবেছিলাম তোমার হয়তো মনে থাকবে । কিন্তু মনে নেই ! নাকি সবাই আমাকে বোকা বানাচ্ছে ... তাই হবে হয়তো , যেমন ভাবে দাদু ভাইকে আমরা গত মাসে বোকা বানিয়ে ছিলাম । আর বৌমা তো কথাটা ভুল বলেনি সেবার তো সত্যিই আমার শরীর খারাপ হয়েছিল । খাওয়া শেষে উঁকি মারলেন রান্না ঘরে । দেখলেন বৌমা রান্নাঘরে , মনে হয় কিছু একটা বানাচ্ছে । মনের মধ্যে একটা সুপ্ত আনন্দ অনুভব করে উনি গেলেন নিজের ঘরে ....
ঘড়িতে সন্ধ্যে সাতটা । ছেলে বৌমা ভালো জামা কাপড় পরে তৈরি । ছেলে নাতিটাকে জামা পরাচ্ছে । নাতনিটা এসেছিল নিশিকান্ত বাবুর কাছে পাঁচ-ছটা জামা নিয়ে -" বলো না দাদু কোন জামাটা পরলে আমায় সবচেয়ে সুন্দর লাগবে " । নিশিকান্ত বাবু নিজের পছন্দমত জামাখানা তুলে দিলেন নাতনির হাতে । সে চলে গেল রেডি হতে । নিশিকান্ত বাবুর উৎসাহ যেন আর ধরে না । আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাচ্ছেন । এই বোধহয় সবাই এসে পড়বে তার সামনে । তিনিও আলমারি খুলে সেই ধুতি-পাঞ্জাবিটা পরলেন , যেটা গত বছর আজকের দিনে তার স্ত্রী কল্যাণী জমানো টাকা থেকে তাকে কিনে দিয়েছিলেন ।
নিশিকান্ত বাবু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে "হ্যাপি বার্থডে টু ইউ মি" -গাইতে গাইতে চুল আঁচড়াতে লাগলেন । এমন সময় ছেলে বৌমা , নাতি-নাতনি দুটোর হাত ধরে তাঁর ঘরে এসে উপস্থিত । নিশিকান্ত বাবুর কান দুটো "শুভ জন্মদিন" কথাটা শোনার জন্য ক্রমশ উদগ্রীব হয়ে উঠছে । তিনি ওদের দেখেও না দেখার ভান করে চিরুনিটা রেখে বিছানার উপর রাখা খবরের কাগজখানা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলেন । এমন সময় বৌমা বলল - "বাবা আমরা বিয়ে বাড়ি যাচ্ছি । এই ঠান্ডায় আপনাকে আর নিয়ে গেলাম না । খাবার রাখা আছে খেয়ে শুয়ে পড়বেন । আমাদের আসতে দেরি হতে পারে "। নিশিকান্ত বাবু ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালেন । আর কিছু না বলে ওরা চলে গেল । নিশিকান্ত বাবু কল্যাণীর ছবি খানা হাতে নিয়ে বিছানায় গিয়ে বসলেন । চোখের জলে কল্যানী ছবিখানা ভেজাতে ভেজাতে বললেন - "তুমি ঠিকই বলেছিলে কল্যাণী । তুমি ছাড়া আমার কথা মনে করার আর কেউ নেই । বৌমার কথা না হয় বাদই দিলাম , খোকা সেও তো আমার জন্মদিনটা ভুলে বসে আছে । ও তো সেই ছোটবেলা থেকে তোমার সঙ্গে আমার জন্মদিন পালন করে আসছে । এই তো গত বছরও তুমি , বৌমা , খোকা নাতি-নাতনি সবাই মিলে কত ধুমধাম করে আমার জন্মদিন পালন করলে । তোমার মনে আছে - বৌমা আমার জন্য কেক বানিয়েছিল । জীবনে প্রথমবার জন্মদিনে কেক কেটেছিলাম আমি । কেক কাটতে কাটতে তোমায় ব্যঙ্গ করে বলেছিলাম -"সারা জীবন তো শুধু পায়েসই খাইয়ে গেলে আমায় , দেখো বৌমা আমার জন্য কেক বানিয়েছে "। তুমি সেদিন তোমার বানানো পায়েস খাওয়াতে খাওয়াতে বলেছিলে - "বানিয়েছি যখন খেয়ে নাও এরপর থেকে আমি আর পায়েস বানাবো না । খেয়ো তুমি তোমার জন্মদিনে তোমার বউমার হাতের কেক" । তুমি সত্যি সত্যি আমার জন্মদিনে পায়েস বানানো ছেড়ে দিলে কল্যানী । এত রাগ তোমার । আমি তো সেদিন মন থেকে বলিনি কথাটা , আমি তো মজা করে বলেছিলাম । ফিরে এসো কল্যানী । আমি তোমার হাতের পায়েসই খেতে চাই কল্যানী । আমি ওসব কেক টেক চাই না কল্যানী। আমি পায়েসই চাই । ফিরে এসো কল্যানী , ফিরে এসো ....
#জন্মদিনের_পায়েস
#রূপবালা_সিংহ_রায়....🖋️
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন