দোসর - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প //নতুন বাংলা গল্প।

দোসর 

রূপবালা সিংহ রায়


 -- বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে 


-- হ্যাঁ হ্যাঁ তাই যাব। ঠেকা নিয়ে বসে আছি তো আমি তোমার। চলেই যাব.... বয়েই গেছে আমার এখানে থাকতে এত অপমান সহ্য করে ! অনেক করেছি আর না।


 তারপর কি হলো জানা নেই তপন আর খুঁজে পাচ্ছে না বিশাখাকে। তন্ন তন্ন করে খোঁজা হয়ে গেছে সব জায়গা। কোথাও নেই সে। এমনকি বাপের বাড়ি পর্যন্ত যায়নি। কোথায় গেল সে? রাগের মাথায় কোনো অঘটন ঘটালো না তো ভাবতেই বুকের মধ্যেটা ছ্যাঁত করে উঠলো তার। নিজেকে নিজেই বকুনি দিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। একদম না, একদম উল্টোপাল্টা ভাবা যাবে না। আছে কোথাও আশেপাশেই । আমারই দোষ। কেন যে বলতে গেলাম কথাটা! রাগ হলে আর যেন হুশ থাকে না আমার । কি যে বলি নিজেই বুঝতে পারি না। আমারই বোঝা উচিত ছিল ওই কথাটা শুনে যে মানুষটা নিঃশব্দে ছল ছল চোখ দুটো নিয়ে সামনে থেকে সরে যায় সে কেন অমন ভাবে চলে যাওয়ার কথা বলল? কেন যে তখন বুঝতে পারলাম না আমি কথাটা? ইচ্ছা করছে নিজের দুগালে কষিয়ে দিই দুটো থাপ্পড়। কি করবো এখন? হে ঈশ্বর তুমি ওকে ফিরিয়ে দাও আমার কাছে। কোথায় তুমি বিশাখা? 


দূরে রেললাইনের কাছে কতগুলো মানুষ জড়ো হয়ে আছে। কেউ বলতে বলতে যাচ্ছে এটা সুইসাইড কেস। মেয়েটা ইচ্ছা করেই ঝাপ দিয়েছে ট্রেনের সামনে। তা শুনে দিশেহারা হয়ে চটি জুতো ফেলে তপন ঊর্ধ্বশ্বাসে দিল দৌড় । ভিড় ঠেলে দেখতে যাবে এমন সময় ধড়পড়িয়ে উঠে বসল সে বিছানায়। মাথাটা যেন ঝিমঝিম করছে তার। পৌষের কনকনে ঠান্ডাতেও তরতর করে ঘামছে সে। দিক বেদিক শূন্য হয়ে চুপচাপ বসে আছে। মাথাটা যেন কাজ করছে না তার। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর একটু ধাতস্ত হয়ে ঘড়ির দিকে তাকালো, ঘড়িতে তখন বেলা নটা। পাশে চেয়ে দেখল বিশাখা এখনো ওদিক ফিরে শুয়ে আছে। আশ্চর্য এত বেলা হয়ে গেল এখনো ওঠেনি ও! যে মানুষটা ভোর পাঁচটায় ওঠে, সে এখনো ঘুমাচ্ছে! বরাবরই অভ্যাস বিশাখার সকাল সকাল ওঠার। আগে উঠতে হতো তাকে বাধ্য হয়ে তা না হলে ছেলে মেয়ের স্কুলের টিফিন আমার অফিসের লাঞ্চ হবে কি করে? এখন তা নাকি অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। এই তো সেদিন বলেছিলাম কি দরকার বলতো অত ভোর ভোর ওঠার। ছেলে মেয়েরা বাইরে থাকে, আমরা থাকি মোটে দুই বুড়ো বুড়ি। না আছে অত তাড়া না আছে কাজের চাপ। শুধু শুধু ঠাণ্ডা লাগিয়ে তো লাভ নেই। কোনো কথা নয় বার্তা নয় বরাবরের মতোই মুচকি হেসে সে বিছানা থেকে উঠে চলে গিয়েছিল। এই হচ্ছে তার স্বভাব। কিন্তু কি হলো হঠাৎ শরীর টরীর খারাপ হলো না তো! নাকি স্বপ্নটা সত্যি হলো। আজকাল উল্টোপাল্টা চিন্তা ভাবনাগুলো বড্ড মাথায় ঘোরে ভেবে আস্তে করে হাতটা রাখলো বিশাখার গায়ে। তারপর মৃদুস্বরে ডাকল -- এই শুনছো, এই...


 কোন সাড়া নেই তার তা দেখে ডাকতে ডাকতে দুবার ঠেলল তাকে। তবুও ওঠার নাম গন্ধ নেই! ভয়ে সমস্ত শরীর অসাড় হয়ে যাচ্ছে। তবুও আস্তে করে দুটো আঙ্গুল ধীরে ধীরে নিয়ে গিয়ে ধরল তার নাকের কাছে। নিঃশ্বাস পড়ছে না। কি হবে এখন? বুকটা যেন শূন্য হয়ে গেল তার। নিজের হৃদ স্পন্দনটাই যেন বন্ধ হয়ে গেল। নিজেকে ভীষণ হালকা লাগছে, যেন বাতাসে মিশে যাচ্ছে সে। খোকন কে ফোন করবো, ডাক্তার ডাকব? কোনটা আগে করবো ? মাথায় কিছুই আসছে না তার ..


-- ধুর হাতটা সরাবে তো। কতক্ষণ থাকবো নিঃশ্বাসটা বন্ধ করে বলে এক ঝটকায়, তার হাতটা সরিয়ে দিল বিশাখা নিজের নাকের উপর থেকে। এবার যেন দেহে প্রাণ ফিরলো তপনের। কি বলবে ভেবে না পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরল বিশাখাকে।






মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।