আনন্দ অশ্রু - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // নতুন বাংলা গল্প।
আনন্দ অশ্রু
রূপবালা সিংহ রায়
সারা জীবন কি করলে বলো তো মা? নিজেই জীবনে কিছু করতে পারলে না, আবার আমায় বলতে এসেছ! বছর সতেরোর মেয়ের মুখে কথাটা শুনে নিশ্চুপ হয়ে যায় তমসা। সত্যি তো কি করলাম আমি জীবনে? -- ভাবতে ভাবতে গিয়ে দাঁড়ায় ব্যালকনিতে। সবে সবে সন্ধ্যে নেমেছে। যদিও ঘড়িতে সময় এখন সাড়ে পাঁচটা তবুও বেশ অন্ধকার চারপাশটা। অন্ধকার বললে ভুল বলা হবে। চাকচিক্যময় শহরে বাইরেটা দেখে তা বোঝার উপায় নেই, কেবলমাত্র ঘরের মধ্যে ঢুকলেই বোঝা যায় সেখানে আলো নাকি অন্ধকার! ঠিক সেখানে বসবাস করা মানুষগুলোর মত। বাইরেটা দেখে যে বিশ্বাস করবে সেই ঠকবে। যদিও কিছু কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছে। সেই জন্যই বোধ হয় আজো পৃথিবীটা পৃথিবী রয়েছে। নিজের অজান্তেই দু'চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল তমসার। খারাপ তো কিছু বলেনি মামন। ঠিক কথাই তো বলেছে সে। কি করেছি আমি জীবনে? আজ সত্যিই বড় কষ্ট হচ্ছে তার। মামনের বাবা যখন প্রথমবার কথাটা বলেছিল যতটা না কষ্ট হয়েছিল তার থেকে শতগুণ কষ্ট হচ্ছে তার। হয়তো নিজের সন্তান কথাটা বলল বলে। যাকে হাতে করে মানুষ করলাম, জন্ম দিলাম সেই কথাটা বলল! কি এমন খারাপ কথা বলেছিলাম তাকে? বলেছিলাম এই অবেলায় ঘুমাস না মামন। এমন রোজ রোজ ঘুমাচ্ছিস অভ্যাস খারাপ হয়ে যাচ্ছে তো। আর একবার ঘুমালে আটটার আগে উঠতেই চাস না। তারপর পড়বি কখন? বড় হচ্ছিস নিজের টা নিজে বুঝতে শেখ। তার ওপর রাতে আবার ঘুম আসতে চায় না তখন ফোন নিয়ে ঘাটাঘাটি করিস। এমন করলে জীবনে দাঁড়াবি কি করে? তারপরে কথাটা বলে সে তমসাকে।
কেন যে বলি সেকি সে বুঝবে? অন্যের বোঝা হয়ে থাকাটা কতটা যে কষ্টের, অন্যের কাছে বেশি কথা শোনা কতটা যে যন্ত্রণার তা তাকে বোঝাবো কি করে! সংসারে হাজারটা কাজ করলেও নাম হয় না কারণ সে কাজে মাইনে নেই যে! যে কাজে টাকা নেই সেই কাজের কোনো মূল্যও নেই। তাই উঠতে বসতে খেতে শুতে মামনকে বলা জীবনে কিছু একটা করতে। তাতে অন্তত নিজের স্বতন্ত্রতাটুকু বজায় থাকে। নিজের প্রয়োজনগুলোকে একটু হলেও প্রাধান্য দেওয়া যায়। অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হয় না। সেও তো চেয়েছিল জীবনে কিছু হতে, কিছু করতে। কিন্তু পারলো কই! পড়াশোনাতেও তো বেশ ভালই ছিল। তার পরেও পড়াশোনা করার সুযোগ পেল না । বসতে হলো বিয়ের পিঁড়িতে । বাবা মা'রা তো টাকা খরচ করে মেয়েকে পড়াতে চায় না চায় কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করে বিয়ে দিতে! জমি জমা বিক্রি করে বিয়ের পণ জোগাড় করতে! সারা জীবনের ইনকাম থেকে একটু একটু করে সঞ্চয় করে মেয়ের জন্য ভারী ভারী গয়না বানাতে আর দামি দামি জিনিসপত্র যৌতুকে দিতে! অথচ তারা চায় না মেয়ে সাবলম্বী হোক!-- ভাবতেই একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস পড়ে তার। তারপর সংসার। আর সব শেষ। এরা অবশ্য বলেছিল পড়াবে। কিন্তু তা তো ছিল শুধু কথার কথা ঘরের বউ চাকরি করবে সে যে কত বড় অন্যায় আবদার। যদিও এখন সময় পাল্টেছে । মানুষ শিখেছে সময়ের সাথে তাল মেলাতে। তাই তো মেয়েকে বলা। সে যতই বলুক তা সহ্য করতে হবে তাকে। কারণ সেজে মা। অভিমান করে থাকলে তো চলবে না। তাতে তো আখিরে তারই ক্ষতি। মা হয়ে কিভাবে পারবে মেয়ের হাহাকার, কষ্ট সহ্য করতে। --ভাবতেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুকের মধ্যে থেকে।
এমন সময় হঠাৎ মামন এসে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল -- চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি মা। আমি চাকরিটা পেয়ে গেছি। তার কথাগুলো শুনে অতীতের স্মৃতি থেকে বর্তমানে ফিরে এলো তমসা। এটা যে শুধু তার মেয়ের জিত নয় জিত যে তারও। কারণ মেয়েটাও যে তারই অংশ। দু চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো তার। না দুঃখে নয়, এ যে আনন্দ অশ্রু।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন