অঞ্জলী - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // সরস্বতী পুজোর গল্প।
অঞ্জলী
রূপবালা সিংহ রায়
-- কিরে বাবু, এতো সকাল সকাল কোথায় বের হচ্ছিস?
-- একটু কাজ আছে মা...
-- বাড়িতে যে পুজো হচ্ছে সে খেয়াল আছে?
-- কিন্তু আমাকে যে বেরোতেই হবে..
-- তোর জন্য পুজো করা আর তুই থাকবি না?
-- থাকব মা। তুমি চিন্তা করো না। আমি সময় মতো চলে আসব বলে পাঞ্জাবির বোতাম গুলো লাগাতে লাগাতে শেখর বেরিয়ে পড়ল সাইকেলটা নিয়ে। বাইক থাকতেও ইচ্ছা করে নিল সে সাইকেল খানা। ঠান্ডা কমে গেলেও বাতাসে এখনো শিরশিরানি ভাবটা রয়েছে। মাঝেমধ্যে তার গায়ের লোমগুলো খাড়া হয়ে উঠছে, যতটা না ঠান্ডার জন্য তার থেকে বেশি সুপ্তির কথা ভেবে। 'ও আসবে তো? যদি আসে, কি বলবো ওকে? ও আমার প্রপোজালটা একসেপ্ট করবে তো? নিশ্চয়ই করবে। না করার কি আছে? ওর কথা মতো আমি তো আজ ডাক্তার হয়েছি। হয়ে দেখিয়েছি ওকে। কিন্তু ও কোথায় থাকে সেটা তো জানিনা! আর ওর ফোন নাম্বারটাও জানা নেই। কতদিন পেরিয়ে গেল কিন্তু যেন সেদিন মনে হয়। জ্বলজ্বল করছে সবকিছু চোখের সামনে। ক্লাস এইটে প্রথম দেখা ওর সাথে। বাবার বদলি চাকরির সূত্র ধরে সুপ্তি এসে ভর্তি হয়েছিল শেখরদের স্কুলে। ভালো লাগার কথাখানা শেখর জানাতে পারেনি তাকে তখনও। বলব বলব করে ক্লাস নাইনে উঠে যায় তারা। আর ক্লাস নাইনে ক্লাসে ফার্স্ট হয় সুপ্তি। কোথায় শেখর ভবঘুরে বাউন্ডুলের মতো ঘোরাফেরা করে লেখাপড়া নিয়ে, ক্যারিয়ার নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই তার আর সুপ্তি ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল তাকে প্রপোজ করা কি মুখের কথা! পেরিয়ে যায় আরো একটা বছর। ক্লাস টেন সামনে মাধ্যমিক এটাই ছিল এই স্কুলে সুপ্তির শেষ সরস্বতী পুজো। স্কুলটা উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত হলেও সুপ্তিরা চলে যাচ্ছে। ওর বাবার চাকরির জায়গাটা আবারও বদলি হয়েছে।
-- এই শেষ সুযোগ শেখর বলার...
-- বলে দে আর সময় পাবি না কথাটা বলার
-- আরে অত ভয় পাচ্ছিস কেন? ওকি বাঘ নাকি ভাল্লুক যে তোকে খেয়ে ফেলবে...
-- বল বলছি তা না হলে কিন্তু আমিই প্রপোজ করে দেব
--ভীতুর ডিম একটা..
এক একজন বন্ধুর এক এক রকম কথা শুনে শেখর গিয়ে বলে দেয় "ভালবাসি" কথাখানা সুপ্তিকে। সুপ্তি মিনিট দুয়েক চুপ। পেছন ঘুরে তাকায় শেখর। ততক্ষণে পেছনে থাকা বন্ধুরা হাওয়া। এবার মনের মধ্যে দোলাচল শুরু হয় শেখরের। হ্যাঁ নাকি না, নাকি জুতো, নাকি প্যারেন্টস কল মাথা কাজ করা বন্ধ হয়ে যায় তার। শেষমেষ নীরবতা ভেঙ্গে সুপ্তি বলে -- বিয়ে করতে চাস নাকি কেবল টাইম পাস? যদি টাইম পাস হয় তো তোর জন্য আমার টাইম নেই। আর যদি বিয়ে করতে চাস তবে বলি আমায় বিয়ে করতে গেলে তোকে ডাক্তার হতে হবে। আমার খুব শখ আমার বর ডাক্তার হবে আর আমি টিচার। তো আমার টিচার হতে আট নয় বছর লাগবে। তোরও আশা করি তাই। এবার তুই বল, তুই কি পারবি ডাক্তার হতে আমার জন্য নাকি অমন বাউন্ডুলেপনা করে বেড়াবি? তাড়াতাড়ি বল অঞ্জলি দিতে যাব। বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে শেখর বলেছিল -- যদি ডাক্তার হই আসবি তো তুই?
--আসবো ঠিক দশ বছর পর এমনই এক সরস্বতী পুজোর দিন।
-- সত্যি বলছিস?
-- সত্যি
-- ভুলে যাবি না তো?
-- সুপ্তি কখনো ভোলে না।
-- তাহলে ফোন নাম্বারটা দে
-- ফোন নাম্বার নিতে হবে না। কথা যখন দিয়েছি তখন আসবো। এখন মন দিয়ে পড়াশোনা কর।
ওই যে চলে গেল সুপ্তি আর সামনাসামনি দেখা বা কথা হয়নি। পরীক্ষার হলের বাইরে একবার দূর থেকে দেখেছিল সে তাকে সেই ছিল শেষ দেখা। আনমনে পুরনো কথাগুলো ভাবতে ভাবতে কখন যে স্কুলে এসে পৌঁছল তা বুঝতেই পারল না শেখর। সাইকেলটাকে স্কুলের গেটের বাইরে রেখে ঢুকলো স্কুলের ভিতর। চোখ দুটো এদিক ওদিক খুঁজে বেড়াচ্ছে তাকে। কিন্তু কোথায় সে? ওকি ভুলে গেল? হতেই পারে না! কোথাও তো দেখতেও পাচ্ছিনা.. ওই তো সেই জায়গাটা যেখানে ওকে প্রপোজ করেছিলাম। সবাই আছে শুধু সুপ্তি বাদে। মেয়েরা শাড়ি আর ছেলেরা পাঞ্জাবি পরে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউবা গল্পে মত্ত কেউবা ছবি তুলতে। তো কেউ কেউ একান্তে মনের কথা বলতে। তাহলে ও এলোনা.. একরাশ হতাশায় চোখের কোণা ভিজে উঠলো তার। কেন কথা দিয়ে কথা রাখলে না সুপ্তি? কেন? কেন? এমন সময় কানে এলো চেনা কণ্ঠস্বর পেছন ঘুরে দেখল অংকের দিদিমণি অপূর্বা ম্যাম। নিজেকে সামলে ম্যামকে প্রণাম আর কুশল বিনিময় করে বাড়ি যেতে চাইলে ম্যাম বলেন এখান থেকে ফিরে যাবি? অঞ্জলি দিবি না? এখনো তো দুরন্তপনা গেল না দেখছি। চল বেসমেন্টে চল। ম্যামের কথা অমান্য করতে পারল না সে তাই অনিচ্ছার সত্ত্বেও গেল পুজোর জায়গায়। চোখ টানা দিতে লাগলো এমাথা থেকে ওমাথা। যদি তার দেখা মেলে কিন্তু না, বৃথা আশা নিয়ে তার পথ চেয়ে এতদিন বসে থাকা ভেবে ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছে সে। ইতিমধ্যে অঞ্জলি তোড়জোড় চলছে। সবাই ফুল হাতে নিয়ে প্রস্তুত। ফুল নেই শেখরের হাতে। অঞ্জলি দিতেই ইচ্ছা করছে না তার। ওদিকে পুরোহিত মশাই মন্ত্র বলা শুরু করে দিয়েছেন। এসব কিছু যেন ভালো লাগছে না তার। এত হৈচৈ, পুজোপাট, কোলাহল, ইশারা, ইয়ার্কি, ফাজলামি অসহ্য লাগছে তার কাছে। বেরোতে চাইছে সে এখান থেকে অনেক দূরে নির্জন কোনো এক জায়গায়, যেখানে একান্তে মনের বেদনা গুলোকে অশ্রু রূপে ঝরানো যাবে। কিন্তু এখান থেকে বেরোনোর পথ যে বন্ধ। আশেপাশে স্যার ম্যামেরা দাঁড়িয়ে, পেছনে দাঁড়িয়ে আছে অনেক ছোট ছোট ছেলে মেয়ে। তাদের পেরিয়ে কিভাবে যাব বাইরে? ভাবতেই দুটো হাত এসে অর্ধেকটা ফুল ধরিয়ে দিল তার হাতে। পাশ ফিরে তাকাতেই চোখ পড়লো সুপ্তির দিকে। যে মেয়েটা সরস্বতী পূজোর দিনেও সালোয়ার পরে স্কুলে আসতো সে আজ হলুদ রঙের শাড়ি পরেছে! কোমর পর্যন্ত লম্বা এলো চুলে গুঁজেছে রংবেরঙের ফুল! যে হাতে একটা ঘড়ি পর্যন্ত থাকত না সে হাতে রয়েছে এক গোছা চুরি! যে চোখ দুটো জুড়ে থাকতো মোটা ফ্রেমের পুরনো চশমা সেই চোখ জোড়া কাজল দ্বারা অলংকৃত! কিভাবে চিনবে শেখর তাকে? দূর থেকে দেখেছিল বটে তাকে পুজোর জায়গাটা গোছাতে। কিন্তু হায়! কপাল একরকম ভাবে দেখতে অভ্যস্ত মানুষটাকে অন্যরকম দেখে পেছন থেকে বুঝতেই পারেনি সে যে ওটা সুপ্তি হতে পারে। এমন সময় কানের কাছে শুনতে পায় ফিসফিসানি -- হাঁ করে চেয়ে থাকবে, নাকি মন্ত্র পড়বে? অঞ্জলি তো প্রায় শেষ হয়ে গেল ...
মুচকি হেসে হ্যাঁ বলছি বলে মন্ত্র উচ্চারণ করা শুরু করে শেখর।
#অঞ্জলি
#রূপবালা_সিংহ_রায়...🖋️
গল্পটা কেমন লাগলো জানাতে ভুলবেন না কিন্তু। ভালো লাগলে নামসহ শেয়ার করতে পারেন। আর এমনই নতুন নতুন গল্প পড়তে ফলো করে রাখতে পারেন। ভালো থাকবেন।
#saraswati_puja_golpo #bengalistory #banglagolpo #saraswatipuja2026 #sanjhbatirrupkothay #রূপবালা_সিংহ_রায় #bengalipoetry

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন