হারানো সুর - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // নতুন বাংলা গল্প।
#হারানো_সুর পর্ব -৪
#রূপবালা_সিংহ_রায়
Harano Sur Written by Rupbala Singha Roy // Bengali story // Romantic Bengali Story // Romantic Story // Bangla Golpo.
নাকি ওর বার্থডে আর সেলিব্রেট করা হবে না । বড় করে সেলিব্রেশন নাইবা হল ঘরোয়া ভাবে তো হবে ।তাই বলে আন্টি এমন কথা বলবেন ! -ভাবতে থাকে আরণ্যক । তাকে চুপ করে থাকতে দেখে অত্রিকার এক বান্ধবী বলে উঠলো - " হ্যাঁ হ্যাঁ আরণ্যকদা গানটা গেয়েই ফেলো । তা না হলে কিন্তু আর কোনোদিন ওর বার্থডে উইশ করার সুযোগ আসবে না । তাও আবার গান গেয়ে । পাশ থেকে অন্য একজন বান্ধবী বলল - "কেন আসবে না শুনি? ও যদি চায় তবে..." কথাটা শেষ না হতে হতেই অন্য আরেকজন বান্ধবী অত্রিকাকে হালক ঠেলা মেরে ঠাট্টা করে বলে উঠলো - "সেই চান্স কিন্তু নেই । বিয়ের পর প্রথম বার্থডে কিন্তু ভীষণ স্পেশাল হয় । তখন কি আর আমরা থাকবো । থাকবে স্পেশাল মানুষ "। কথাখানা শুনে চমকে উঠলো আরণ্যক । মনের আশঙ্কাটা যে এমন ভাবে সত্যি হয়ে যাবে ভাবতে পারিনি সে । তার মুখ খানা মুহূর্তেই ফ্যাকাসে হয়ে গেল । দূর থেকে অত্রিকার মা সেটা লক্ষ্য করে নিশ্চিন্ত মনে চলে গেলেন খাওয়া-দাওয়ার জায়গায়। সবাই মিলে চেপে ধরে আরণ্যককে গান গাইবার জন্য । এদিকে তার গলা শুকিয়ে কাঠ । নিঃশ্বাস যেন রোধ হয়ে যাচ্ছে । যেখান থেকে একটা শব্দ পর্যন্ত বের হচ্ছে না সেখানে গান তো অনেক দূরের কথা। অত্রিকা একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে এক গ্লাস জল এনে ধরলো আরণ্যকের সামনে । চোখ দুটো ছলছল করছে তার । কাজল কালো চোখের কোনায় জল একটু একটু করে দানা বাঁধছে । সমগ্র মুখমন্ডলে কালো মেঘের ঘনঘটা। মনের ভিতরটাতে চলছে তুমুল ঝড় । যার রেশ চোখে মুখে স্পষ্ট । তবু যতটা পারছে সামলে নিচ্ছে নিজেকে বাবার কথা ভেবে । বাবাকে আজ বড় নিশ্চিন্ত দেখাচ্ছে । একমাস আগে পর্যন্ত তার চোখে মুখে যে চিন্তার ভাঁজ দেখতে পাওয়া যেত আজ তা লুপ্ত। সেদিন তো বলেই বসলো -"এবার আমার মরন হলেও ক্ষতি নেই । নিশ্চিন্তে মরতে পারবো । তোকে নিয়ে আমার বড় চিন্তা ছিল মা । আমার যদি কিছু একটা হয়ে যায় তোর কি হবে ? আর তোর মা তাকে কি তুই একা সামলাতে পারবি ? যা হয় ভালোর জন্য হয় বুঝলি । তোর বিয়েও দেওয়া হল আবার অপরদিকে একটা ছেলেও পেলাম । যে আমাদের খেয়াল রাখবে , বিপদে-আপদে পাশে এসে দাঁড়াবে । আর তাছাড়া ওরা মানুষ বড় ভালো । তা নাহলে তোকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার কথাটা কি আর বলতো ? এই কথাগুলো শোনার পর আর কিছু বলতে পারিনি সে । একমাস ধরে বলব বলব করে মনের কথাটা আর বলাই হলো না বাবাকে । তাই বহু কষ্টে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে সে। তাছাড়া ছেলেটা তো সত্যি বেশ ভালো । নিজে একজন ডাক্তার। সেদিন তো এসেই বাবার প্রেসক্রিপশন গুলো নিয়ে বসে পড়ল । বলছিল -" হার্টের পেশেন্ট একবার হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেছে তাই বেশি মানসিক চাপ নেওয়া চলবে না " । আমাকে আর মাকে বলল সেদিকে খেয়াল রাখতে -ভাবতে ভাবতে অত্রিকা গিয়ে বসল সোমনাথ বাবুর কাছে । সোমনাথ বাবু তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন -"জামাইবাবা আসবে না ? কথা হয়েছে তার সঙ্গে ? অত্রিকা মৃদু স্বরে বলল -"না সে এখন আসতে পারবে না । তার নাকি একটা অপারেশন আছে । তাই সকালে এসেছিল । কথাগুলো শুনে সোমনাথ বাবু মুচকি হেসে আবারও মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন । ওদিকে আরন্যক যতটা সম্ভব নিজেকে সামলে নিয়ে ধরল সেই গানটা যেটা মাঝেমধ্যে শোনাতে হতো অত্রিকাকে । গানটা তার বেশ পছন্দের । হবে নাই বা কেন? নিজের লেখা গান বলে কথা । সে ভাবতেই পারেনি তার লেখা কথাগুলো সুর তাল লেগে গান হতে পারে । সেদিন মাঝরাতে আরণ্যককে গান গাইতে শুনে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়েছিল সে । পূর্ণিমার চাঁদটা যেভাবে শান্ত নিঃস্তব্ধ রাতের মনকে আলোড়িত করছিল , ঠিক তেমনভাবেই আরণ্যক তার সুর দিয়ে আলোকিত করছিল অত্রিকার সবুজ মনটাকে ।
তারপর প্রায় হাজারবার শোনা হয়ে গেছে গানটা । তবুও যেন ঠিক সেই রকমই নতুন লাগে অত্রিকার । মনটা ভেসে যায় দিক থেকে দিগন্তে সীমাহীন উদ্মাদনায় । গান গাইছে আরণ্যক । তা ভেসে আসছে অত্রিকার কানে । তবুও সেই উদ্মাদনা যেন নেই আজ তার মধ্যে । গানের কথাগুলো , সুরগুলো তাকে ক্রমাগত ক্ষতবিক্ষত করে দিয়ে যাচ্ছে । আজ যে আরণ্যকের গলায়ও তো সেই মাতাল করা বাঁধনছাড়া সুর নেই । যেটা শুনলে সে হারিয়ে যেত প্রেমের অতল সমুদ্রে । আজ গানের কথাগুলো বিরহের সুরে বাজছে । যাতে আছে কেবল বেদনা , কেবল দুঃখ ,কেবল অশ্রু -
নিশিথের চাঁদখানি
বড় বেশি প্রিয় ,
তাই বলে ফিরে এসে
দেখাটুকু দিও ।
তুমি ছাড়া আঁধারের
খনি যেন বুক ,
এলে পরে ধরা দেয়
সবটুকু সুখ ।
চাঁদ বলে সাথে আছি
মন মাঝে খুঁজো ,
দেখিবার তরে মোরে
চোখ দুটো বুঝো।
ভালোবাসা কমে বুঝি
দূরে গেলে পরে ?
মরে না সে কোনো কালে
দিনে দিনে বাড়ে ....
রাত ছাড়া চাঁদের
মিছে বেঁচে থাকা,
তাই চাঁদ আঁধারের
সাথে দেয় দেখা ।
ফিরে আসি বারে বারে
তব কাছে প্রিয় ,
এইভাবে চিরদিন
কাছে টেনে নিও।
আজ বিয়ে অত্রিকার সারা বাড়ি জুড়ে পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনের ভিড় । সবাই আনন্দে আত্মহারা । সবার ঠোঁটের কোনায় এক ফালি করে হাসি । হাসি নেই অত্রিকার মুখে । যন্ত্র মানবীর মতো সব আচার অনুষ্ঠান নিষ্ঠাভরে করে যাচ্ছে সে। একলা ঘরে গিয়ে গোপনে যে চোখের জল ফেলবে তারও তো উপায় নেই । মামাতো ও পিসতুতো বোনেরা তাকে একা ছাড়লে হয় । সেই সঙ্গে রয়েছে কয়েকজন বান্ধবীও । সবাইকে তো আর মনের কথা খুলে বলা যায় না । অত্রিকা আবার তেমনটা নয় । খুব সহজে সে সবার সঙ্গে মিশতে পারে না । খুব চাপা স্বভাবের । তাই গুমড়ে গুমড়ে মরছে । মনে ভাসছে আরণ্যকের কথা । চোখ দুটো কেবল খুঁজে বেড়াচ্ছে তাকে । তার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল জন্মদিনের দিন । তারপর দুদিন কেটে গেছে । এর মাঝে আর দেখা মেলেনি তার । দু একবার বাহানা করে নিচেও নেমেছে সে কিন্তু তাতে লাভের লাভ কিছু হয়নি । আরণ্যকের ঘরের দরজাটা কেবল বন্ধই দেখতে পেয়েছে । তার কলেজে যাওয়ার সময় হলে দৌড়ে গিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েছে যদি একটু চোখের দেখা দেখা যায় । কিন্তু না তাকে কলেজে যেতেও দেখা যায়নি । বারণ থাকার সত্ত্বেও গতকাল বিকালে বোনেদের নিয়ে মাঠে গিয়েও দেখেছে সে । ঢিপিটার ওপর বসে থেকেছে সন্ধ্যে পর্যন্ত । তবুও তার দেখা মেলেনি । শেষমেষ মায়ের ডাকে বাড়ি ফিরেছিল সে এক বুক অভিমান নিয়ে -'এতটা পর করে দিলে তুমি আমায় । একবার দেখা পর্যন্ত দিচ্ছ না । এতটুকু মূল্য নেই আমার তোমার কাছে ! করতে হবে না দেখা । স্বার্থপর একটা । কেবল নিজের কথাই ভাবছে । আমি বুঝি কষ্ট পাচ্ছি না ? আমার বুঝি কান্না পাচ্ছে না ? আমার ভীষণ কান্না করতে ইচ্ছা করছে আরণ্যক তোমার বুকে মাথা রেখে । একটিবারের জন্য এসো সামনে প্লিজ । আমি যে আর পারছি না সহ্য করতে । বড় একলা লাগছে আমার । নাকি তুমি প্রতিশোধ নিচ্ছ ? তাই হবে ! আমি তোমায় এড়িয়ে চলছিলাম বলে তুমিও এড়িয়ে যাচ্ছো না । বেশ তাই হোক । আর কক্ষনো ফিরে তাকাবো না তোমার দিখে । হাজার কষ্ট হলেও না । থাকো তুমি তোমাকে নিয়ে । আমি ভালই থাকবো । সুখে থাকব । দেখে নিও তুমি , আমি আর কান্না করবো না তোমার জন্য । তুমি একটা পাষণ্ড হৃদয়হীন মানুষ । ভালোই হয়েছে তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে না হয়ে । তুমি তবে থেকে আমায় শুধু কষ্ট দিয়ে যাচ্ছো । এখন যদি এত কষ্ট দাও না জানি বিয়ের পর কত কষ্ট দিতে ! কথায় বলে না , যা হয় ভালোর জন্যই হয় । আমারও ভালো হবে দেখে নিও তুমি......
#হারানো_সুর পর্ব -৪
#রূপবালা_সিংহ_রায়
গল্পটা কেমন লাগছে জানাতে ভুলবেন না কিন্তু।
ভালো থাকবেন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন