হারানো সুর - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // নতুন বাংলা গল্প।
#হারানো_সুর (পর্ব - ৩)
#রূপবালা_সিংহ_রায়
Harano Sur Written by Rupbala Singha Roy // Bengali story // Romantic Bengali Story // Romantic Story // Bangla Golpo.
কোনো কিছুই যেন আর ভালো লাগেনা তার । সারাদিন ঘরেই থাকতে ইচ্ছা করে পড়াশুনোতে আর তেমন মন নেই । এমনি করে দিনের পর দিন অতিক্রান্ত হয়ে প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেল। আজকাল বড় অচেনা মনে হয় অত্রিকাকে । কথা বলা তো দূরের কথা সামনাসামনি হলে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। চোখাচোখি হলে চোখ ফিরিয়ে নেয় । মনে মনে ভাবে আরণ্যক যা হয়েছে ভালোর জন্যই হয়েছে । সে নিজেও তো এটাই চেয়েছিল । তবে আজ কেন মানতে অসুবিধা হচ্ছে তার। না না নিজের পাড়ায় মন দিতে হবে । নিজেকে দাঁড় করাতেই হবে । মা-বাবার ইচ্ছা পূরণ করতেই হবে। সেই সঙ্গে আরেকজনকে দেওয়া কথা তাকে রাখতেই হবে । তাঁকে দেখিয়ে দিতে হবে আমি পেরেছি । সেটাই হবে যোগ্য জবাব । এমনি করে এক বছর অতিক্রান্ত । অত্রিকা এখন কলেজে পড়ে । আরণ্যকও মন দিয়েছে তার পড়ায় । হঠাৎ করে মায়ের ফোন আসায় ছুটতে হলো বাড়িতে । দাদানের শরীর ভীষণ খারাপ । তাকে ভর্তি করানো হলো হাসপাতালে। পনের দিন যমে মানুষের টানাটানির পর তিনি চলে গেলেন । যেহেতু তাঁর ছেলে নেই তাই তাঁর কাজ নাতি হিসেবে করল আরণ্যক । এর মধ্যে ঠাম্মির শরীরটাও ভালো নেই । তার ওপর এত বড় ধাক্কা । মা একা আর কত সামাল দেবে । তাই মাস তিনেক থাকল সে মায়ের কাছে । এদিক ওদিক করে কিভাবে যে সময়টা পেরিয়ে গেল বুঝতেই পারলো না । এদিকে পড়াশুনোরও ক্ষতি হচ্ছে । এবার তো কলেজে না গেলেই নয় । তাই অনিচ্ছার সত্ত্বেও রওনা দিল বর্ধমানের উদ্দেশ্যে । স্টেশনে নেমে হাঁটা শুরু করল সে । মিনিট দশকের পথ তাই আর টোটোতে চাপলো না । ধীরে ধীরে সূর্যটাও ডুবে গিয়ে সন্ধ্যে নামতে শুরু করেছে । আলো-আঁধারি পথ ধরে হেঁটে চলেছে সে । এখনো রাস্তার পাশের ল্যাম্পপোস্টের আলো গুলো জ্বলেনি । বড় ক্লান্ত লাগছে তার । এমনিতে জার্নি তার ওপর মন খারাপ । দাদান খুব কাছের লোক ছিল ওর । বাবা মারা যাওয়ার পর দাদান ওকে বাবার মতো সামলেছে । আরো খারাপ লাগছে মায়ের কথা ভেবে । দাদান মায়ের মাথার উপর ছাতার মতো হয়েছিলেন । হয়তো আর্থিক সাহায্য করতে পারতেন না তবে মানসিকভাবে মাকে অনেকটা সাপোর্ট দিতেন । সময় অসময় দুটো কথা বলে মায়ের মনোবল বাড়াতেন । মায়ের জন্য ওটুকুও তো অনেক ছিল । এখন বাড়িতে মানুষ বলতে মা আর ঠাম্মি । ঠাম্মির শরীরটাও তেমন ভালো নেই । মাকে তো স্কুলে যেতে হয় । যেতে হয় নানান কাজে বাইরেও । তখন ঠাম্মিকে কে দেখবে ? ঠাম্মির আবার কিছু হবে না তো ? না না কি ভাবছি এসব আমি ! সব ঠিক হবে । আমি না একটা যা তা - এরকম হাজারটা কথা চিন্তা করতে করতে প্রায় অত্রিকাদের বাড়ির কাছে এসে পৌঁছল সে । এর মধ্যে সন্ধ্যেও নেমে পড়েছে । দূর থেকে দেখতে পাচ্ছে সে সারা বাড়িটা আলোতে ঝলমল করছে । বাড়িতে বিয়ে লাগলে বাড়ি যেমন আলোতে ঝলমল করে ঠিক তেমনি । বুকের মধ্যেটা এক ঝটকায় ছ্যাঁত করে উঠল তার । তাহলে কি অত্রিকার ....না না, তা কেমন করে হতে পারে ও তো এখন সবে ফার্স্ট ইয়ার । সোমনাথ আঙ্কেল এত তাড়াতাড়ি কি ওকে বিয়ে দেবেন ? কি সব আবোল তাবোল ভাবছি আমি । কিন্তু এত আলো কেন ? সেটাও তো বুঝতে পারছি না । আমার ভাবনা যেন মিথ্যে হয় কামনা করতে করতে প্রায় ঊর্ধ্বশ্বাসে পা চালালো সে । নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের গতিবেগটা ক্রমশ বেড়েই চলেছে । সেই সঙ্গে একরাশ উৎকণ্ঠা । শেষমেশ গিয়ে ঢুকলো বাড়ির ভেতর । তাকে ঘরে ঢুকতে থেকে সোমনাথ আঙ্কেল ফ্রেশ হয়ে ওপরে আসতে বললেন । নিচ থেকে লোকজনের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে সে । ছাদের উপর অনুষ্ঠান হচ্ছে । হচ্ছে হই হুল্লোড় হাসি আনন্দ। কিন্তু কিসের ? কোনো রকমে চোখে মুখে জল দিয়ে নিজেকে একটু ধাতস্থ করে দ্রুত গতিতে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলো ওপরে । মাঝে দেখা হলো সোমনাথ বাবুর দু-একজন পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে । যাঁরা তাকে চেনেন । তাঁরাও বিশেষ কিছু বললেন না । কেবল বাড়ির খবর জানতে চেয়ে যে যার মত চলে গেলেন । তাঁদের সঙ্গে কথা বলাটা যেন বিরক্তিকর মনে হতে লাগলো তার । তবুও যতটা সম্ভব উত্তর দিয়ে গেল ছাদে । ছাদে গিয়ে দেখল সারা ছাদ বেলুন দিয়ে সাজানো । একপাশে লোকজন খাওয়া-দাওয়া করছে । অন্য পাশে কেউ কেউ বসে গল্প করছেন । আর অত্রিকা বসে গল্প করছে তার বন্ধুদের সঙ্গে । আজ তাকে খুব সুন্দর লাগছে দেখতে । হালকা গোলাপি রঙের একটা গাউন পরেছে সে । মাথায় রুপোলি রঙের ছোট্ট একটা মুকুট । সেইসঙ্গে ছোট্ট দুটো কানের দুল আর একটা সরু চেন । এটুকুতেই তাকে যেন রাজকন্যা রাজকন্যা লাগছে । চোখ ফেরাতেই পারছে না আরণ্যক তার দিক থেকে । মনে পড়ল আজকের তারিখটা। আজ যে অত্রিকার জন্মদিন । মাথা থেকে একেবারেই বেরিয়ে গেছে । মনে পড়ে বাবাও তো মায়ের জন্মদিনের কথাটা ভুলে গিয়েছিল সেবার । তখন তার বয়স হয়তো ছয়-সাত হবে । মায়ের সেকি রাগ । বাবা অনেক কষ্টে মানিয়েছিল তাকে । এটা বোধহয় আমার জন্মগত । আপন মনেই হাসি খানা চওড়া হয়ে উঠলো তার । এমন সময় হঠাৎ করে অত্রিকার চোখ পড়লো তার দিকে । তাকে দেখে অত্রিকার মুখের হাসিটা নিমেশেই মিলিয়ে গেল । যেন মনে হল গভীর এক বেদনা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে । খুব সন্দর্পনে ঘনঘন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলছে সে পাছে কেউ বুঝে যায় । কিন্তু আরণ্যকের চোখে ফাঁকি দেওয়া বড় মুশকিল । কুড়ি বাইশ হাত দূর থেকেও সে সেটা উপলব্ধি করতে পারছে । অত্রিকার উষ্ণ নিঃশ্বাসটা যেন তার শরীর সহ মনটাকে দাউদাউ করে পুড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে । এমন সময় আন্টি এসে বললেন-" আরে আরণ্যক যে ! এসো এসো বসো । আমি তোমার জন্য কেক আনছি "। হঠাৎ আন্টির এমন পরিবর্তন ! এতটা খাতির করছেন ! কারণটা কি হতে পারে ? আমি আজকাল একটু বেশিই ভাবছি । কি আবার হবে ? এই জন্য বলে কুকুরের পেটে ঘি ভাত সহ্য হয় না । আন্টি আগে যখন ছুঁড়ে ছুঁড়ে খাবার দিত , রূঢ় ব্যবহার করত তখন কত খারাপ লাগতো । আর এখন ভালোবেসে কথা বলছেন , কেক আনতে যাচ্ছেন সেটাও আমার ভালো লাগছে না । আমি না একটা পাগল । সব সময় আবোল-তাবোল ভাবি । এর মধ্যে আন্টি একটা প্লেটে করে বড় এক টুকরো কেক নিয়ে হাজির । কেক নিয়ে মুখে দিতে যাবে এমন সময় অত্রিকা এসে বলল - " কি গো আরণ্যক দা আমার গিফটটা কই ? বার্থডে পার্টিতে এলে খালি হাতে একটু উইশ পর্যন্ত করলে না , অমনি কেক খেতে বসে গেলে" ! সত্যি বড্ড ভুল হয়ে গেছে ভেবে হ্যাপি বার্থডে উইশ করতে যাবে , অমনি অত্রিকা একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল -"আর উইশ করে লাভ নেই তুমি বরং আমার বার্থডে গিফট হিসাবে সেই গানটা গাও" । অত্রিকার কথা শুনে আন্টি পাশ থেকে বললেন - " হ্যাঁ হ্যাঁ আরণ্যক গানটা গেয়েই ফেলো । আমি চাইনা ওর কোনো ইচ্ছা অপূর্ণ থাকুক আজকের দিনে । তার ওপর এ বাড়িতে ওর শেষ জন্মদিন পালন বলে কথা" । শেষ জন্মদিন পালন মানে কি বলতে চাইছে আন্টি? কোথায় যাবে ও ?
#হারানো_সুর (পর্ব -৩)
#রূপবালা_সিংহ_রায়
গল্পটা ভালো লাগলে কমেন্ট করতে ভুলবেন না কিন্তু। সেই সাথে ফলো করে সাথে থাকবেন। ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন