হারানো সুর - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // নতুন বাংলা গল্প।
হারানো সুর পর্ব -২
রূপবালা সিংহ রায়
Harano Sur Written by Rupbala Singha Roy // Bengali story // Romantic Bengali Story // Romantic Story // Bangla Golpo.
না না মেনে নিতেই হবে ওকে। এতেই ওর মঙ্গল । দিন দিন পড়াশোনাটা তার উচ্ছন্নে যাচ্ছে । পড়াতে একটুও মন বসে না তার । পড়ানোর সময় আমার দিকে এক মনে তাকিয়ে থাকে ঠিকই কিন্তু পড়া শোনে বলে তো মনে হয় না । আর তাছাড়া আমাকেও তো পড়তে হবে মায়ের পাশে দাঁড়াতে হবে । মা আর কত কষ্ট করবে আমার জন্য । বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে মা দিনরাত এক করে পরিশ্রম করে চলেছে । সকালে একটা প্রাইভেট স্কুল , বিকালে টিউশনি , রাতে সেলাইয়ের কাজ । মাঝে মাঝে মাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে সে বাবার মালা ঝোলানো ছবিটার সামনে । মা তো কাউকে কোনোদিন কিছু খুলে বলে না । না আমায় না ঠাম্মি দাদানকে । আর বলেই বা কি লাভ হবে ? আমি ছোটো , দাদান অসুস্থ , ঠাম্মি বৃদ্ধ । সংসার খরচ , ডাক্তার , ওষুধ , তার ওপর আমার মেডিকেলের খরচ । মা আর কত সামলাবে তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পড়াশোনা শেষ করে মাকে এবার বিশ্রাম দিতেই হবে - ভাবতে ভাবতে ঢুকলো কলেজে । কলেজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে মনে পড়ছে অত্রিকার সাথে কাটানো সময় গুলোর কথা । আজ নিজেকে বড্ড নিঃসঙ্গ লাগছে তার । তবুও পড়াশোনার কথা ভেবে নিজেকে শক্ত করল সে । তবুও অজানা কষ্ট কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে তাকে । আজ যে বড় কষ্ট দিয়ে ফেলেছে সে অত্রিকাকে । নিজেকে বড় অপরাধী মনে হচ্ছে তার । বুকের পাঁজর গুলো দুমড়ে মুচড়ে এক হয়ে যাচ্ছে । চলার শক্তি যেন ক্রমশ ক্ষীন হয়ে পড়ছে । চোখের জল যেন আর তার বাধা মানতে চাইছে না মাঝেমধ্যে ঝরে পড়ছে পথের উপর পড়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া ও রাধাচূড়া ফুল গুলোর উপর । হয়তো আরণ্যকের এই কষ্টটা অত্রিকা কোনোদিনই জানতে পারবে না কেন সে তার সঙ্গে এমন ব্যবহার করলো তা চিরকালই চাপা থাকবে তার মনের কোঠরে । কোনোরকমে নিজেকে সামলে সন্ধ্যে নাগাদ গেল অত্রিকার ঘরে তাকে পড়ানোর জন্য । কিন্তু সে শরীর খারাপের বাহানা দিয়ে এড়িয়ে গেল তাকে । বেরিয়ে আসার সময় দেখা অত্রিকার বাবা সোমনাথ আঙ্কেলের সাথে । আরণ্যকের বাবা আর সোমনাথ বাবু ছোটবেলাকার বন্ধু । দুজনেই বর্ধমানের ছেলে । ওইখানেই বড় হওয়া । তারপর কাজের সূত্রে আরণ্যকের বাবা ওখানকার সবকিছু বিক্রি করে সপরিবারে চলে আসেন কলকাতায় । কেনেন ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট ।বেশ চলছিল তাদের সচ্ছল পরিবারটি হাসি-খুশি-আনন্দে । কিন্তু হঠাৎ করে বাবার মৃত্যুটা সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে । মাধ্যমিক দেওয়ার পর ও চেয়েছিল কোনো একটা কাজ করতে যাতে মায়ের কষ্টটা একটু কম হয় । সেই সঙ্গে প্রাইভেটে গ্রাজুয়েশনটা করে নেবে । কিন্তু মায়ের সেই এক কথা বাবার স্বপ্ন তোমায় পূরণ করতেই হবে । তোমায় ডাক্তার হতেই হবে । শেষমেষ মায়ের জেদের কাছে হার মেনে জয়েন্ট এন্ট্রাসে বসে সে । রেজাল্ট মোটামুটি ভালো করলেও টাকার অভাবে কলকাতায় চান্স না পেয়ে বর্ধমান মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়া । সোমনাথ আঙ্কেলের এখানে বেশ নাম ডাক রয়েছে । ডোনেশনের টাকাটা আর দিতে হয়নি তাকে । বর্ধমানে পরিচিত বলতে সোমনাথ আঙ্কেল । তাই তাদের বাড়িতেই থাকে সে । তার বদলে অত্রিকাকে পড়াতে হয় তাকে । সোমনাথবাবু সদয় প্রকৃতির মানুষ হলেও তার স্ত্রী আবার বিপরীত ধর্মী । আরণ্যককে দুচোখে দেখতে না পারলেও বাড়ির কর্তার বিরুদ্ধে যাওয়ার শক্তি তার নেই । তাই বাধ্য হয়ে আরণ্যক নামক উদ্বাস্তুটাকে সহ্য করতে হয় তাঁকে । কিন্তু হাবে ভাবে সেটা আরন্যকে বোঝাতে কার্পণ্য করেন না তিনি । মাঝে মাঝে সোমনাথ বাবু ও অত্রিকা এর প্রতিবাদ করলে তা তাঁর কাছে ধোপে টেকে না । আজকাল তিনি আরো চোটে আছেন আরণ্যকের উপর । অত্রিকা আর তার সম্পর্কের গভীরতাটা তার কাছে ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে । মা বলে কথা , মেয়ের চোখ মুখ দেখেই পড়ে নিতে পারেন তার মনের কথা । সোমনাথবাবু তো তার কথা শুনবেন না তাই তার যত রাগ আরণ্যকের উপর । সোমনাথ বাবু আর আরণ্যকে কথা বলতে দেখে রাগে গা জ্বালা করলেও এই ভেবে তিনি খুশি যে অত্রিকা আরণ্যকে এড়িয়ে চলছে ।
পরপর তিন দিন কেটে গেল অত্রিকায় সঙ্গে দেখা নেই আরণ্যকের । না সে পড়ে তার কাছে , না সে আসে খাবার টেবিলে , না বিকালে বের হয়ে মাঠে । অত্রিকা থাকে তিন তলাতে আর আরণ্যক নিচের ঘরে । তাই দেখা হওয়ার সম্ভাবনাটাও ভীষণ রকম কম । তার ওপর আন্টির চোখ এড়িয়ে উপরে যাওয়াটা দারুণ দুঃসাধ্য কাজ । কম তো চেষ্টা করছে না সে কিন্তু অত্রিকা তা মানতে নারাজ । বেশি কিছু তো চায় না সে শুধু একটু চোখের দেখা দেখতে চায় । তার সঙ্গে কোনো রকম সম্পর্কে জড়াতে চায়না সে এখন মনকে যথাসাধ্য শক্ত করে বেঁধে রেখেছে তবুও অবুঝ এই মনটা কিছুতেই বাধা মানতে চায় না । কোনোরকম সম্পর্ক না হয় নাই হল , একটু আধটু দেখা-সাক্ষাৎ হলে ক্ষতি কি ? আর তাছাড়া ওর পরীক্ষার তো বেশি দেরি নেই সিলেবাসটা এখনো শেষ হয়নি, পড়াশুনাটাও তো করতে হবে ! সোমনাথ আঙ্কেলকে কি বলবো? - ভাবতে ভাবতে ওপরে যেতে চোখে পড়ল অত্রিকা পড়ছে অন্য একজন গৃহ শিক্ষকের কাছে । আরণ্যক লক্ষ্য করল অত্রিকাকে সে একবারের জন্য তাকাচ্ছে না তার দিকে । তাহলে সে কি অভিমানে করছে এগুলো । মনে মনে এরকমটা চাইলেও তা মেনে নিতে ভীষণ রকম কষ্ট হচ্ছে তার । বড্ড কান্না পাচ্ছে । এমন সময় আন্টি এসে আরণ্যককে বললেন - তোমায় আর পড়াতে হবে না । বেকার বেকার সময় নষ্ট করছো তুমি অত্রিকার জন্য । নিজের পড়ায় মন দাও । ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে নিচে চলে এল আরণ্যক । দমটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তার । দ্রুত ছুটলো মাঠের দিকে । গিয়ে বসল ঢিপিটার ওপর । খোলা আকাশ , উন্মুক্ত বাতাস তবুও যেন নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার । আজ বড় একা লাগছে । পুরনো স্মৃতিগুলো উঁকি মারছে মনের আনাচে কানাচে । এমনি করে পাশাপাশি বসে প্রথ আড় চোখে দেখা দুজন দুজনকে । হাওয়ার তালে উড়ে ফিরত অত্রিকার এক গোছা খোলা চুল । যখন সে মাঠে আসতো চুলগুলোকে খোলাই ছেড়ে দিত । যা তাকে আরো মোহময়ী করে তুলত । এক্কেবারে রূপকথার রাজকুমারীদের মত । ফর্সা লাল টুকটুকে গায়ের রং , সুশীল মুখমণ্ডল , কাজল মাখা টানা টানা চোখ দুটোকে দেখে মনে হতো যেন এক গভীর সমুদ্র যেখানে তাকালেই আরণ্যক তলিয়ে যেত অজানা এক জগতে । তার মুখে সবসময় লেগে থাকতো একফালি হাসি যা পূর্ণিমার চাঁদকেও হার মানাত । তাকে দেখে মনে হতো যেন কোনো এক ভিনদেশী পরী । যখন সে সরষে ফুলের বাগানের মাঝখান থেকে এমাথা দৌড়ে বেড়াতো নিজেকে ধরে রাখার দায় হয়ে পড়তো আরণ্যকের । যেন মনে হতো এক পাগল করা মাতাল হাওয়া সারা শরীর মন জুড়ে খেলা করছে তার । মনে মনে তাকে জীবনসঙ্গিনী করার ইচ্ছাটা প্রবল হয়ে উঠতো । মাঝে মাঝে তা ভ্রম মনে হতো মাঝে মাঝে আবার সত্যি । জেগে ঘুমিয়ে নিজের অজান্তে তার সঙ্গে সংসার করতে শুরু করত সে । লাল বেনারসি পরে কনে সেজে বিয়ের পিঁড়িতে বসে আছে অত্রিকা । নানা অলংকারে পরিপূর্ণ তার দেহ । গলায় রজনীগন্ধার মালা । কপালে বড় একটা লাল টিপ । তাকে ঘিরে রয়েছে চন্দনের কলকা । যা তাকে আরো সুন্দরী করে তুলেছে । কাজল কালো চোখে মোটা করে কাজল লাগানো । মাথায় সোলার মুকুট । সারা বাড়ি জুড়ে লোকে লোকারণ্য । আরণ্যকও হাজির ধুতি পাঞ্জাবি পরে বর বেশে । যে আন্টি তাকে দুচোখে দেখতে পারেন না তিনি তাকে আদর করে বরণ করছেন । কল্পনায় ভেসে যেতে থাকে আরণ্যক । ভাবের ঘোরেই হঠাৎ চোখ পড়ল ওর অত্রিকার দিকে। ভালো করে খেয়াল করল সে ।হ্যাঁ তো অত্রিকাই তো । মাঠে যাওয়ার পথটা ধরে হেঁটে চলেছে সে । আজ তাকে ভীষণ অন্য রকম লাগছে । সেই প্রাণখোলা উল্লাসতা নেই আর তার মধ্যে । সবুজে ভরা খেলা মাঠে এলে সে যেন নিজেকে আর ধরে রাখতে পারত না । ফড়িং এর মত এমাথা ওমাথা তিড়িং-বিড়িং করে লাফিয়ে বেড়াতো সে। কিন্তু আজ বড়ো চুপচাপ ধীরগতিতে হেঁটে চলেছে । মনে হয় নিভৃতে চোখের জল ফেলে নিজেকে হালকা করতে এসেছে । নাকি আমার সঙ্গে দেখা করতে - ভাবতেই এক অজানা আনন্দে চোখ দুটো চিকচিক করে উঠল তার। নিমেষেই ঢিপি থেকে নেমে এক ছুট্টে এল অত্রিকার কাছে । কিছু বলতে যাবে এমন সময় অত্রিকা মেঠো পথটা ধরে দ্রুত পা বাড়ালো বাড়ির দিকে । আরণ্যক ঠায় দাঁড়িয়ে সেখানে । মেঠো পথ পেরিয়ে অত্রিকা উঠলো বড় রাস্তায় কিছুটা যাওয়ার পর অদৃশ্য হয়ে গেল বাড়িগুলোর আড়ালে । আবারো বিষাদের সাগরে ডুব দিল আরণ্যক ।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন