হারানো সুর - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // নতুন বাংলা গল্প।

 হারানো সুর প্রথম পর্ব 

রূপবালা সিংহ রায়

Harano Sur Written by Rupbala Singha Roy // Bengali story // Romantic Bengali Story // Romantic Story // Bangla Golpo.


বসন্ত শেষে গ্রীষ্মের আগমন হতে না হতেই আবহাওয়া যেমন ভাবে হঠাৎ করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে আজ তেমনি উত্তপ্ত অত্রিকা । গ্রীষ্মের প্রখর তাপদাহ যেমন ভাবে পশু-পাখি , গাছপালা সহ সমস্ত মনুষ্য জগতকে একটু একটু করে নিঃতেজ করে দিচ্ছে ঠিক তেমন ভাবে অত্রিকার মনের মধ্যে সেই ভালোলাগা ও ভালোবাসার স্মৃতিগুলোও নিঃতেজ হতে হতে এখন প্রায় নিঃশ্চিহ্নের পথে । প্রখর রোদের মধ্যেও ছাতাটা না মেলেই হেঁটে চলেছে সে । মনের মধ্যে যে লু বইছে তার কাছে এ যেন কিছুই নয় । রাস্তার ওপর ঝরে পড়া লাল হলুদ কৃষ্ণচূড়া ও রাধা চূড়া গুলোকে দেখে গতকাল পর্যন্ত মনে হতো তারা যেন তাকে স্বাগত জানাচ্ছে । সেই সঙ্গে পায়ের কাছে গিয়ে প্রিয় সখীর মতো ফাসফিসিয়ে বলছে দ্রুত পা চালাতে অন্যথায় দেরি হয়ে যেতে পারে । দেরি হলে মা বকবে । কিন্তু তারা যেন আজ তাকে দেখেও না দেখার ভান করছে । পাছে সে তাদেরকে দেখে ভেঙে পড়ে । তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার মনে মনে হাসছে এই ভেবে যে আমরাও যেমন শাখা থেকে খসে মাটিতে পড়েছি এখন তোর অবস্থাও তেমন । ঠিক অন্যের দুঃখে আনন্দ পাওয়া মানুষগুলোর মত । কত পুরনো স্মৃতি আজ মনে ভাসছে তার - সেই ঝরা কৃষ্ণচূড়া ও রাধাচূড়া দিয়ে সাজানো পথ একই , গন্তব্য একই , সময় একই কিন্তু পাশে থাকা মানুষটা আজ পাশে নেই । হয়তো তাকে মনের কথা খুলে বলা হয়নি তবুও হাবে-ভাবে ভালবাসি কথাটা কম তো বোঝায়নি সে। আরণ্যকও যে সেটা বুঝতো না সেটা তো মনে হতো না । সেও তো মাঝে মাঝে হারিয়ে যেত অত্রিকার চোখে । পায়ের সাথে পা মিলিয়ে হেঁটে ফিরত বাড়ি । চলার পথে বকাটে ছেলেরা খারাপ নজরে যখন তাকাত অত্রিকার দিকে তখন আরণ্যক ঝামেলায় না গেলেও তাদের দিকে এমন ভাবে তাকাতো যেন মনে হতো তাদের বাগে পেলে শেষ করে দেবে । তার আচার ব্যবহার হাবভাব সবকিছুই তো অত্রিকার মনোভাবের সঙ্গে মিলে যেত । তবে কেন আজ এমনটা করল সে ? তাহলে সবকিছু কি ভ্রম ছিল । না না ভ্রম কেমন করে হতে পারে ? সেই বই আদান-প্রদানের সময় হাতে হাত লাগলে লজ্জাবতী লতার মত দুজনের কুঁকড়ে যাওয়া । তারপর দৃষ্টি বিনিময় , সেখানে কম তো কথা ছিল না । তাহলে ! হিসাবটা যেন কিছুতেই মিলাতে পারছে না সে । বেশ কয়েকদিন ধরে তার মধ্যে যে পরিবর্তন আসেনি সেটাও তো অস্বীকার করতে পারে না অত্রিকা । কথায় কথায় রাগ দেখানো । পড়া ঠিকঠাক বলতে না পারলে গর্জে ওঠা । কটু কথা বলা । সেগুলো তো মিথ্যে নয় ! তবে আগেও তো এমন অনেকদিন হয়েছে অত্রিকা পড়া পারেনি , কই তখন তো বকেনি । রাগ করা তো দূরের কথা ....বরং তাকে বুঝিয়েছে । বারবার বলেছে তাকে পড়াতে মন বসাতে । পড়ার কথা না হয় বাদই দিলাম ওই যে মিথ্যে কথাগুলো সেগুলোর কি হবে ? রোজ বিকেলে ওদের গন্তব্য ছিল বাড়ির পাশে খোলা মাঠ । তাতে নানান রকমের সবজি চাষ করা আছে । মাঠের পর মাঠ সর্ষের গাছ দেখলে যেন চোখ জুড়িয়ে যায় । মাঠের একপাশে থাকা উঁচু ঢিপিটার উপর গিয়ে বসে প্রকৃতির আনন্দ অনুভব করত তারা দুজন । সেদিন আরণ্যককে ডাকতে গেলে সে জানিয়ে দেয় যে সে যাবে না । তার পড়া আছে । অত্রিকা মুখ ভার করে একাই চলে যায় । কিন্তু পনের-কুড়ি মিনিট পর চোখে পড়ে আরণ্যককে । মোবাইলে কথা বলতে বলতে মাঠে যাওয়ার সরু রাস্তাটা দিয়ে পায়চারি করছে সে । পাশেই ঢিপি সেখানে বসে ছিল অত্রিকা । আরণ্যক তাকে দেখতে পায়নি সেটা হতেই পারে না । তাহলে সে কি তাকে এড়িয়ে চলছে ! ভাবতেই পারে না অত্রিকা । কিন্তু কেন ? কেন-র উত্তর খোঁজার জন্য আজ স্কুল বেরোনোর নাম করে আরণ্যকে অনুসরণ করতে করতে পৌঁছায় বর্ধমান মেডিকেল কলেজে । আরণ্যক সেখানকার দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র । দূর থেকে অত্রিকা লক্ষ্য করল আরণ্যক কলেজের কাছে গিয়ে ফোনে কারও সঙ্গে একটা কথা বলছে । কিন্তু কলেজের মধ্যে ঢুকছে না । বেশ কিছুক্ষণ পরে একটা মেয়ে এলো আরণ্যক তার হাত ধরে এগিয়ে চলল । অবশেষে তারা গিয়ে বসলো পথের পাশে ছোট্ট একটা কফি শপে । আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি অত্রিকা । এক ছুট্টে বেরিয়ে এসেছিল সেখান থেকে । ভীষণ রকম কান্না পাচ্ছে তার । কিন্তু জনসমক্ষে তা সম্ভব নয় ভেবে কান্না গুলো গলা পর্যন্ত আসার আগেই গিলে ফেলছিল সে । বাড়িতে যে ফিরবে, তারও উপায় নেই । মা হাজারটা প্রশ্ন করবে । শরীর খারাপের অজুহাতও দেওয়া যাবে না । মায়ের জেরার কাছে কোনো কিছুই ধোপে টিকবে না । তারপর শুরু হবে মায়ের বাক্যবান -"সামনেই উচ্চমাধ্যমিক । সে খেয়াল আছে কারোর ? ফিরুক তোর বাবা আগে বাড়ি তারপর দেখিস তোর অবস্থা কি হয় ইত্যাদি ইত্যাদি... স্কুল তো কখন আরম্ভ হয়ে গেছে সেখানেও তো ফেরার উপায় নেই । অগত্যা চেনা পরিচিতদের চোখ এড়িয়ে এদিক ওদিক করে নিজেকে বাঁচিয়ে এখন বাড়ি ফেরা ।



অত্রিকা চলে যাওয়ার পর আরণ্যক কফি আর স্ন্যাকসের দাম মিটিয়ে টেবিল ছেড়ে উঠে পড়লে পরিচিত মেয়ে বন্ধুটি বলল -"কফিটা শেষ না করেই উঠলি যে" ? "ক্লাস আছে তুই ফিনিশ করে আয়" -বলে পা চালালো কলেজের দিকে আরণ্যক । কিন্তু মাথার মধ্যে ঘুরছে অত্রিকার কথা । ও যে তাকে অনুসরণ করতে করতে কলেজ পর্যন্ত চলে আসবে ভাবতেই পারেনি সে ! তাই বাধ্য হয়ে তাকে দেখানোর জন্য এসব করা । খুব খারাপ লাগছে তার অত্রিকার জন্য । ও নিশ্চয়ই খুব কষ্ট পেয়েছে ।আর পাবেই না বা কেন ? কদিন ধরে যে ব্যবহারটা করছি ওর সাথে । এমনিতেই মন খারাপ ছিল তার ওপর আজকের ঘটনাটা কিভাবে মানবে ও ?



পরের পর্ব ক্রমশ 









মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।