শুভারম্ভ - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // নতুন বাংলা গল্প।
শুভারম্ভ
রূপবালা সিংহ রায়
Subhorambha written by Rupbala Singha Roy // Bengali Story // Bangla Golpo // New Bengali Story.
মোবাইল ফোনটা বেজে ওঠায় ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল ঋক। খুব রাগ হলো সৌমিলির উপর। "ফোনটা সুইচ অফ কেন করোনি। একটা কাজ যদি ঠিকঠাক করতে পারো"- বলতে যাবে এমন সময় মনে পড়ল সৌমিলি তো নেই। সে তো চলে গেছে সপ্তাহখানেক আগে। না ঝগড়া, না রাগ, না গন্ডগোল কিছুই করেনি সে। চুপচাপ সেদিন এসে বসেছিল ঋকের সামনে। তারপর শান্ত গলায় বলেছিল --"সব দোষ আমার জানতো, আমিই তোমার মনের মত হয়ে উঠতে পারিনি। আর হয়তো পারবোও না কোনো দিন। তাই চলে যাচ্ছি আমি। আমার মনে হয় তোমার আমার থেকে একটু আলাদা থাকা উচিত। আলাদা থেকে বোঝা উচিত আমি ছাড়া তুমি কেমন থাকো, যদিও ভালো থাকবে জানি। তবুও যদি না থাকতে পারো ডেকো চলে আসব। আর যদি থাকতে পারো তো পাঠিয়ে দিও ডিভোর্স পেপারটা। সাইন করে দেবো"।
বেশ আনন্দ হয়েছিল ঋকের সেদিন। আবার সেই স্বাধীনতা, যেটা হারিয়ে গিয়েছিল বছর দেড়েক আগে। "ভালো লাগে না আর সংসারের বোঝা বইতে। তারপর রোজকার খিটির মিটির। অসহ্য এক্কেবারে। একটু ড্রিংকস করলে হবে না, সিগারেট খাওয়া যাবে না, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে মাঝ রাতে বাড়ি ফেরা যাবে না। কত অসুবিধা তার! শহুরে চাকরিজীবী মেয়ে হয়েও কেমন যেন গাঁইয়া গাঁইয়া টাইপের। মা-বাবা যে কি কুক্ষণে বিয়েটা দিল কে জানে। শুধু তো মা বাবাকে দোষ দিলে চলে না দোষটা তো আমারও। সৌমিলি কে দেখেও তো বুঝতে পারিনি যে সে আমার থেকে অনেকটা আলাদা। এই জন্যই বোধ হয় সবাই আজকাল আর অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ করতে চায় না"।
উফঃ মাথাটা এখনো ঝিমঝিম করছে। এক কাপ চা হলে ভালোই হতো। চোখ দুটো খুলতেই ইচ্ছা করছে না তাই চুপচাপ শুয়ে রইল সে কিছুক্ষণ। খিদেও পেয়েছে ভীষণ রকম। গতকাল দুপুর নাগাদ অফিস ট্যুর থেকে ফিরে রেস্ট হল না ছুটতে হলো বন্ধুদের সঙ্গে পার্কস্ট্রিট। থার্টিফার্স্ট ডিসেম্বরের রাত বলে কথা, ঘড়ির কাঁটা বারোটা পেরোলেই নিউ ইয়ার। না গেলে হয়। সেখানে খাওয়া-দাওয়া কি হলো, কি হলো না ড্রিংকিং, নাচাগানা আর পার্টি হল হরদম। তারপর ভোররাতে ফেরা হলো ঘরে। ঘরে ঢুকে সোজা বিছানায়-- ভাবতে ভাবতে মোবাইলটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনে দেখলো সকাল প্রায় পৌনে এগারোটা। তারপর কল লগে গিয়ে চেক করল মায়ের মিস কল। মা ফোন করেছিল! এই অবস্থায় কথা বলা যাবে না ধরে ফেলবে। তাই কোনো রকমে উঠেই ফ্রেশ হয়ে ছুটল রান্নাঘরে চা বানাতে। সৌমিলি চলে যাওয়ার পর দিনই সে বেরিয়েছিল ট্যুরে। কোনোরকমে দুটো রান্না খাওয়া করে। খাবার যা বেচে ছিল সেভাবে সব পড়েছিল। তা থেকে পচা দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে। বেসিনে পড়ে আছে এক ঝাঁপ বাসন। কোনো রকমে সেগুলো পরিষ্কার করে চা বসিয়ে এলো বেডরুমে। আলমারিটা খোলা। টেবিল, চেয়ার, সোফা , বিছানা সব জায়গায় ছড়িয়ে জামা কাপড় সেদিন তাড়াহুড়োতে প্যাকিং করায় এসব কান্ড হয়ে আছে। জানালার কাঁচগুলো ধুলো জমে একাকার কোনো রকমে সেগুলো খুলে ঝাড়তে যাবে এমন সময় মনে পড়ল চায়ের কথা, ছুটলো রান্না ঘরে। এতক্ষণে চায়ের জল প্রায় অর্ধেক অগত্য সেটুকু কাপে ঢেলে চুমুক দিতে দিতে গিয়ে দাঁড়ালো ব্যালকনিতে। সৌমিলির শখের বাগানখানার অবস্থা শোচনীয়। জলের অভাবে ফুল গাছগুলো প্রায় শুকিয়ে মরতে বসেছে। তার প্রিয় গোলাপ গাছটাও নুইয়ে পড়েছে। মনে পড়ে গেল গত বছর রোজ ডে'র কথাখানা। 'কোনো একটা কারণে ফোন করেছিল সৌমিল সেদিন সন্ধ্যাবেলা। বিয়ের পর প্রথম ভ্যালেন্টাইনস ডে বলে কথা। সেটা সেলিব্রেট না করলে কি হয়, তাই সে দাঁড়িয়ে ছিল একটা ফুলের দোকানে গোলাপ নিতে। কথায় কথায় মুখ ফসকে কথাটা বলে ফেলেছিল সে সৌমিলিকে। তখন সৌমিলি রাগ করে বলেছিল কি দরকার মিছিমিছি ফুল কেনার দুদিন বাদে শুকিয়ে যাবে তারপর ফেলে দিতে হবে। তা শুনে রাগ হয়েছিল ঋকের। সেটা বুঝতে পেরে সে বলেছিল যদি গোলাপ দিতে হয় তাহলে তুমি আমার জন্য একটা গোলাপ গাছ নিয়ে এস। তাহলে তোমার দেওয়া উপহারটা সারা জীবন থাকবে আমার কাছে। ওর কথা মতো গাছখানা নিয়ে এসেছিল ঋক। বরাবরই ও একটু বেশি সংসারী।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে সে তাকালো রাস্তার দিকে। দূরের মাংসের দোকানটাতে তখনও পর্যন্ত ভিড় লেগে আছে। বছরের প্রথম দিন বলে কথা একটু ভালো মন্দ না হলে কি হয়। কেউ কেউ স্বামী স্ত্রী দুজনে মিলেই এসেছেন মাংস নিতে। কেউ আবার একা কানে ফোনটা ধরা। নিশ্চয়ই ফোনের ওপার থেকে একজন বলে বলে দিচ্ছেন কি কি আনতে হবে কতটা আনতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। ঠিক সৌমিলির মতো। ও যেন কেমন অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। ও ছাড়া একটা সকাল চলছে না তাহলে বাকি জীবনটা চলবে কি করে? সবসময় আমি চাইতাম ও আমার মনের মত হোক। কই একবারও তো আমি ওর মনের মত হওয়ার চেষ্টা করিনি! হাজার বার বলার সত্ত্বেও স্নানের ভিজে টাওয়েল খানা পর্যন্ত বিছানা ছাড়া কোথাও রাখিনি। ওর সিগারেটের ধোঁয়ায় অসুবিধা হয়। তা সত্ত্বেও ওর সামনে বসে সিগারেট খেয়েছি। এমনও কত শত ভুলত্রুটি রয়েছে আমার মধ্যে তবুও তো আমায় ছেড়ে যাওয়ার কথা বলেনি ও। বরঞ্চ ওর কোনো কিছু আমার পছন্দ না হলে চিৎকার করেছি আমি ওর ওপর। এমনকি নির্দ্বিধায় বাইরে যাওয়ার পথখানাও দেখিয়ে দিয়েছি। নতুন বছর মানে তো নতুন সূচনা। আমি নিজে যদি না বদলালাম তাহলে বছর খানা বদলালে কি লাভ তাতে? আর আমায় দেখো বোকার মত হাতে শুন্য নিয়ে রাজা-মহারাজাদের মত আনন্দে মাতছি' - ভেবে একরাশ প্রত্যাশা আর অনিশ্চয়তা নিয়ে ফোন করল সে সৌমিলিকে।
-- হ্যালো
--হ্যাপি নিউ ইয়ার
--.... হু... সেইম টু ইউ
-- বলছি... ভেবে দেখলাম বুঝলে
-- তা কি ভাবলে?
--.... চলে এসো তুমি। তুমি ছাড়া একা থাকতে পারছি না।
-- একা থাকলেটা কোথায়? আমি চলে আসার পর দিনই গেলে ট্যুরে। ফিরলে গতকাল দুপুর তারপর নিশ্চয়ই বেরিয়েছিলে? তো ঘরে থাকলে কখন?
-- যতটুকু থেকেছি তাই যথেষ্ট।
-- কাজগুলো করার জন্য ডাকছো তো? তার জন্য লোক রেখে দিতে পারো।
-- সে তো আর তোমার মত নিজের মনে করে সবকিছু গুছিয়ে রাখবে না। তোমার মতো যত্ন করবে না, ভুল করলে তোমার মতো বকাবকিও করবে না, অভিমান হলে মুখ ফুলিয়ে বসে থাকবে না, আর রাগ হলে কথা বলবে না...
-- অত তেল দিয়ে লাভ নেই। আজ আসতে পারবো না। কারণ মা বাবা জয়রামবাটি গেছে কল্পতর উৎসবের জন্য। আর পরে যাব কিনা ভেবে দেখবো।
--তুমি না আসতে পারো.. আমি তো আসতে পারি। মাংস নিয়ে আসছি। দুজন মিলে রান্না করে খাব। খুব খিদে পেয়েছে।
-- এক্কেবারে, আসবে না।
-- তুমি মানা করার কে? ওটা আমার শ্বশুর বাড়ি ভুলে যেও না কথাটা।
-- তুমিও ভুলে যেও না তোমার শ্বশুর আমার বাবা হয়। সেই হিসাবে বাড়িটা আমারও
--তুমি বোধহয় ভুলে যাচ্ছ আমার শ্বশুরের মেয়ে আমার বউ হয় আর বউয়ের বাড়ি মানে আমারও
বাড়ি। তুমি ফোন রাখো আমি আসছি...
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন