বড়দিনের কেক - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // নতুন বাংলা গল্প।
বড়দিনের কেক
রূপবালা সিংহ রায়
Borodiner Kek written by Rupbala Singha Roy // Bangla Golpo // Bengali Story // New Bengali Story.
"বাবু , আমারে একটা কেক দেন না ! বাবু , আমারে একটা কেক দেন না" - বলে ক্রমাগত চেঁচিয়ে যাচ্ছে ছয় বছরের ফেলি । তার কোলে আবার রয়েছে পাঁচ মাসের ছোট্ট ভাই । তার সামনে এতটাই ভিড় যে তাদের পেরিয়ে সে আগে যেতেই পারছে না । আবার তার কাছ পর্যন্ত আসার আগেই কেক-ট্রফিগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে । এই নিয়ে দু-দুবার সে কিছুই পেল না। অগত্যা আবার গিয়ে বসল নিজের জায়গায় । কলকাতার রাজপথের এক কোণে বাস ওদের । ওদের মতো অনেক মানুষ থাকে পথের পাশে অলিতে গলিতে । বড়দিনের উৎসবে যখন মগ্ন আমজনতা তখন ওরা রওনা দিয়েছে পার্ক স্ট্রিটের উদ্দেশ্যে ...। পথের পাশে দাঁড়িয়ে আসা-যাওয়া মানুষগুলোর সামনে হাত পাতার জন্য । কিছু যদি মেলে তা দিয়ে দিন কয়েক চলে যাবে । পার্কস্ট্রিট থেকে একটু দূরে ঠনঠনিয়া কালী বাড়ির সামনে একটা জায়গায় ছোট্ট মেয়ে ফেলির ভরসায় তার থেকে ছোট দুই ভাই-বোনকে রেখে মা-বাবা গেছে পার্ক স্ট্রিটের কাছে একটা বড় গির্জায় ।
মন্দিরে যাঁরা পুজো দিতে আসছেন তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ কেক-ট্রফি নিয়ে আসছেন পথের শিশুদের মধ্যে বিলি করার জন্য । ফেলির তিন বছরের বোন একটা ছোট্ট কেক হাতে পেলেও ফেলিকে না দিয়ে তা খেয়ে নেয়। অনেক বার চওয়ার পরেও না দিলে একটু জোর করে নিতে গেলে কেকের পরিবর্তে হাতে বসে যায় বোনের সবগুলো দাঁতের দাগ । ছোট্ট ভাইটাকে নিয়ে সে বসে আছে । ব্যস্ত শহর কলকাতা ! কত আলো ঝলমল করছে চারিদিক ! রাস্তা দিয়ে চলছে কত বড় বড় গাড়ি ! কত মানুষ ! সবার মুখে হাসি ! শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সে । দেখছে লোকের আনাগোনা । সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে তার বয়সী আর তার ভাই-বোনের বয়সী ছেলে-মেয়েরা। কত্ত ভালো আছে তারা । মা-বাবার কাছে যা চায় তাই পায় । এই ঠান্ডায় যেখানে তার গায়ে একটা ছেঁড়া জামা সেখানে ওইসব বাচ্চাদের ঘরে থাকে কত শত দামি দামি জামা-সোয়েটার । যেখানে ফেলি দুবেলা পেট ভরে দুটো ভাত খেতে পারেনা সেখানে মনের মত খাবার না পেলে বড়ো বাড়ির বাচ্চারা খেতে চায় না । খাওয়া নিয়ে কত বায়না তাদের। চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে তার । বাবা-মা সেই কোন সকালে বেরিয়েছে ফেরার নামটি নেই । একটা বাটিতে রাতের দুটো ভাত ছিল । সেগুলো সেই সকালে খাওয়া হয়ে গেছে। খিদেতে পেট চোঁ চোঁ করছে । ছোট ভাইটাও খিদেতে মাঝে মাঝে কান্না করছে। এটা ওটা দেখিয়ে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করছে ফেলি ...
ওই তো আরও একটা গাড়ি পার্কিং এর কাছে যাচ্ছে! ওরা মনে হয় কিছু দিতে এসেছে! সত্যি তো ওরা অনেকগুলো প্যাকেট বের করছে গাড়ি থেকে! ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্ষুধার্ত পথের ছোট-বড়ো মানুষগুলো আবারও জড়ো হচ্ছে মন্দির চত্বরে । এক টুকরো খাবার দেখে কাক গুলো যেমন কা কা করে ছুটে আসে খাওয়ার জন্য তেমনি ভাবে ছুটছে তারা । ফেলি আর গেলো না ওই ভিড়ের মধ্যে । ভাইকে নিয়ে দূর থেকে কেবল দেখছে। যারা খাবার নিয়ে এসেছে তাদের মধ্যে তার বয়সী একটা মেয়েও আছে । ফেলি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে তাকে। কি সুন্দর লাল টুকটুকে একটা জামা পরে আছে সে ! সঙ্গে একটা সোয়েটারও ! কি সুন্দর দেখতে তাকে ! মাথার চুল গুলো সুন্দর করে বাঁধা ! পায়ে দামি জুতো ! তার হাতে আবার রয়েছে এক গোছা বেলুন ! ওকে ভালো করে দেখছে আর নিজের দিকে তাকাচ্ছে ফেলি । কতদিন ঠিক করে সাবান দিয়ে স্নান করা হয়নি তার । চামড়াগুলো খসখসে । চুলগুলো জট পাকানো । পায়ে জুতো নেই । জামাটা আবার ছেঁড়া । হঠাৎ করে মেয়েটার নজর ওর দিকে পড়ায় ও নিজের জামার মধ্যে পা দুটোকে লুকিয়ে জামার ফাঁটা গুলো লুকানোর চেষ্টা করছে।
কিছুক্ষণ পর খাবার দেওয়ার জায়গাটা খালি হয়ে গেল। মেয়েটা ওর মা-বাবার সঙ্গে গাড়ির দিকে যাচ্ছে । ফেলি একটা হতাশা ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। মেয়েটা গাড়ির মধ্যে ঢুকলো । ফেলি আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ল ক্ষুধার্ত ভাইকে সামলাতে । এমন সময় সেই মেয়েটা পেছন থেকে বলল - "এই নাও। এগুলো তোমার জন্য" । ফেলি পেছন ফিরে দেখল - সেখানে আছে একটা নতুন জামা আর একটা সোয়েটার । অনেকগুলো ট্রফি , একটা খাবারের প্যাকেট আর সেইসঙ্গে মস্ত বড় একটা কেকের বাক্স । সেগুলো দেখে ফেলির চোখগুলো আনন্দে বিষ্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল । মেয়েটা জিনিসগুলো ফিলির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল - "কি হলো নাও" । ফেলিও এক বুক উচ্ছ্বাস নিয়ে হাত দুটোকে বাড়িয়ে দিল...
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন