বড়দিনের কেক - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // নতুন বাংলা গল্প।
বড়দিনের কেক
রূপবালা সিংহ রায়
Borodiner Kek written by Rupbala Singha Roy // Bangla Golpo // Bengali Story // New Bengali Story.
এ ডাক্তার সে ডাক্তার দেখিয়েও কিছুতেই কিছু হচ্ছে না । অবশেষে কলকাতার মেডিকেল কলেজ হসপিটালে নিয়ে এলেন বছর সত্তরের শ্যামচরণ বাবু তার স্ত্রী রোহিণী দেবীকে । বেশ কয়েক মাস ধরে মাথা ব্যাথা হচ্ছে তাঁর । অভাবের সংসার তাঁদের । বাড়ি সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামে । কলকাতা মানে অনেকটাই পথ । তাই চেষ্টা করছিলেন গ্রামের ডাক্তারকে দিয়ে যদি ঠিক হয় । কিন্তু না কিছুতেই যেন কিছু হচ্ছিল না । তারওপর একমাত্র ছেলে সেও থাকে আন্দামান । ওখানে সে রাজমিস্ত্রি কাজ করে। ওখান থেকে পাঠানো টাকাতে চলে সংসার । সংসারে আছে শ্যামচরণ বাবু , তাঁর স্ত্রী , তিন নাতি-নাতনী ও বৌমা । জমিজমা বলতে তেমন কিছুই নেই ভিটেবাড়িটুকু ছাড়া । তিনিও বয়সকালে এখানে ওখানে দিনমজুরের কাজ করে চালিয়েছেন সংসারটা । এখন সেই দায়িত্ব গিয়ে পড়েছে ছেলের কাঁধে। সবই ঠিক ছিল কিন্তু তার মাঝে ব্যাঘাত ঘটালো রোহিনী দেবীর শরীরটা । অবশেষে জেলা হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হলে ডাক্তাররা বুঝতে পারেন উনার মাথায় টিউমার আছে এবং সেটা খুব তাড়াতাড়ি অপারেশন করাতে হবে তা না হলে যে কোন মুহূর্তে বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে । তাই ওখানকার ডাক্তাররা ওনাকে মেডিকেলে রেফার করে । খবর শুনে ছেলেও চলে আসে ।
বাবা ছেলে মিলে রোহিণী দেবীকে নিয়ে আসে মেডিকেলে । ভর্তি করা হয় তাঁকে । তারপর এই টেস্ট , সেই টেস্ট করে ঠিক হয় একদিন বাদে অপারেশন করা হবে। বাবা ছেলে পড়ে থাকে হসপিটাল চত্বরের একোণে- সেকোণে । মাঝে মাঝে গ্রামবাসীদের কেউ কেউ ছেলের ফোনে ফোন করে খোঁজ নিচ্ছিলেন । এমনই একজন দুঃসম্পর্কের আত্মীয় কথা বলতে বলতে বলে ফেলেছিলেন এই বয়সে মাথায় অপারেশন হবে বৌদিকে ফিরবে তো ? বুকের মধ্যেটা শুকিয়ে উঠেছিল শ্যামচরণ বাবু । যেন প্রচন্ড খরা । দাউ দাউ করে জ্বলছিল বুক । ঠপ করে মাটিতে বসে পড়েছিলেন তিনি । বাকরুদ্ধ , কানে কোন আওয়াজই শুনতে পাচ্ছিলেন না । ছেলে সামলে নিয়েছিল বাবাকে। অনেক দুশ্চিন্তার মধ্যে দিয়ে হল অপারেশনটা । এযাত্রায় বেঁচে গেলেন রোহিণী দেবী স্বামী সন্তানের ভালোবাসায় । আর ডাক্তারদের হাতের ছোঁয়ায় । আর কিছুটা ওপর ওয়ালার ইচ্ছায় । ওয়ার্ডে গিয়ে মাকে দেখে আসার পরও ছেলে কেমন যেন বিষন্ন ছিল । কারণ জানতে পেরে ছেলের কাঁধে হাতে রেখে শ্যামচরণ বাবু বলেছিলেন - "খোকা, তুই চলে যা ।
ছেলে -"কিন্তু বাবা তোমাকে আর মাকে একা ফেলে কি করে যাব?"
শ্যামচরণ বাবু - "এদিকে হাত যে একদম ফাঁকা। মাকে যে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাবি সে টাকাটুকুও পর্যন্ত নেই । তারপর তার ওষুধপত্তি আছে তার ওপর সংসার । চলবে কি করে বাবা ?"
ছেলে - "কিন্তু বাবা কোনো কিছুর যদি দরকার হয় তুমি কি করবে তখন ?
শ্যামচরণ বাবু - "চিন্তা করিস না । আমি সামলে নেব। তাছাড়া এখানে তো তেমন কিছু দরকারও নেই। সব ওরাই করছে।" একটু থেমে আবারো বলতে লাগলেন - "মাকে কবে ছাড়বে তারও তো ঠিক নেই। ডাক্তাররা তো তেমন কিছু বলছেন না। তুই ওখানে পৌঁছে বৌমার একাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দিস। আর বৌমাকে বলিস সে যেন টাকাটা তুলে তোর কাকাকে দিয়ে এখানে পাঠিয়ে দেয় ।"কোন উপায় না দেখে বাবা আর মাকে কলকাতার বুকে একা ফেলে ছেলে পাড়ি দিল আন্দামানে।
শ্যামচরণ বাবু বসে আছেন নিচে। হসপিটাল চত্বর সেজে উঠেছে কত কিছু দিয়ে। গতকাল রাতে বাইরে গিয়েছিল একটা পাউরুটি কিনতে পকেটে বেঁচে থাকা দশটা টাকা নিয়ে । কলকাতা শহর ঝলমল করছিল আলোতে । আজ নাকি বড়দিন তাই হসপিটালটাকে সাজানো হচ্ছে । আর বড়দিন! দিন আনা দিন খাওয়া মানুষগুলোর কাছে সব দিনই সমান। ওদিকে আজ দুদিন হয়ে গেল অপারেশনের । ওরা রোহিনীকে কিছুই খেতে দিচ্ছে না । তিন বেলা ভাত খাওয়া মানুষ । শুধু স্যালাইন না কি দিয়ে রেখেছে ভাবতে ভাবতে বিকেলবেলার ভিজিটিং আওয়ার -এর সময় হয়ে গেল। তিনিও গেলেন তাঁর স্ত্রীর কাছে দেখা করতে । তাঁকে দেখতে পেয়ে তাঁর স্ত্রী একগাল হাসি দিয়ে বললেন - "এত দেরি করলে যে " । কোনো কথা না বলে একটু মুচকি হাসি দিয়ে পাশে থাকা বেঞ্চিতে বসলেন শ্যাম চরণ বাবু ।আসলে তার পা দুটো আর উঠছিল না । সকাল থেকে শুধু জল খেয়ে আছেন । সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে তার মাথাটা কেমন যেন টাল খাচ্ছিল । অমনি রোহিনী দেবী পাশ থেকে বলে উঠলেন - "জানো তো আজ আমায় খেতে দিয়েছে। ভাত খেয়েছি আমি। আচ্ছা তোমরা খেয়েছো তো ? খোকা কোথায় ? শ্যামচরণ বাবু ইতস্তত করে মিথ্যে বললেন রোহিনী দেবীকে - "হ্যাঁ আমরাও খেয়েছি ।আর খোকা একটু ঘুমোচ্ছে । সারারাত ঘুম হয়নি বোধ হয়। রোহিনী দেবী - "ঘুম কি হয় ?এই ঠান্ডায় ফাঁকা গাছের নিচে। খুব কষ্ট হচ্ছে না আমার জন্য তোমাদের ? ওদিকে বৌমা আবার একা একা বাড়িতে। বাচ্চাগুলোকে কি করে সামলাচ্ছে কে জানে ?" শ্যামচরণ বাবু - "এই হচ্ছে তোমার এক দোষ সারা জীবন শুধু সবার জন্য ভেবে গেলে। এখন অত ভাববে না। ব্রেনটারে একটু রেস্ট দাও এবার। ওরা ভালো আছে । খোকার কাছে ফোন করেছিল।" স্বামীকে রেগে যেতে দেখে রোহিনী দেবী অন্য প্রসঙ্গ তুলে কথা বলতে লাগলেন। দুজনে কথা বলতে বলতে শ্যামচরণ বাবু বললেন - "জানো তো আজ বড়দিন "! কত্ত সুন্দর সাজিয়েছে না হাসপাতালটাকে।" রোহিনী দেবী -" হ্যাঁ জানি তো। জানো তো সকালে সবাইকে কেকও দিয়েছিল খেতে কিন্তু আমায় দেয়নি। তখনও পর্যন্ত স্যালাইন চলছিল তাই।" শ্যামচরণ বাবু তাকিয়ে ছিলেন রোহিনী দেবীর মুখের দিকে । মনে হয় কেক খেতে ইচ্ছে করেছে ওর। মুখ ফুটে খাব কথাটা বলবে না । বিয়ের এত বছর হল নিজের জন্য কখনো কিছু চাইনি । টানাটানের সংসার কতদিন টাকা পাঠানো হয়নি । মাঠ-ঘাট থেকে শাক-পাতা তুলে এনে খেয়েছে তবুও কিছু বলেনি। কেমন যেন অসহায় মনে হচ্ছিল নিজেকে ।
ভিজিটিং আওয়ার শেষে হসপিটাল থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন তিনি । রাস্তার লোকে লোকারণ্য ।প্রায় সবার মাথায় লাল-সাদা টুপি । চারিদিকে আলো আর আলো। রঙ-বেরঙের আলোতে সেজে উঠেছে শহরটা । রাস্তায় গাড়ি আর গাড়ি । গান বাজছে হোটেল আর রেস্তোরাঁ গুলোতে । নাকে ভেসে আসছে নানান নাম না জানা খাবারের গন্ধ। অথচ পকেটে একটা ফটো পয়সা পর্যন্ত নেই। এত ব্যস্ত মুখরিত লোকের মাঝে কার কাছে চাইবে কাজ ? আর এই বয়সে কেইবা তাকে কাজ দেবে ? কিছুটা দূর হাঁটতে হাঁটতে তিনি দেখলেন একটা চার্চ। কত লোকের আনাগোনা সেখানে । বাচ্চা থেকে বড় সবাই আনন্দে আত্মহারা । অথচ তার ভিতরে ঢোকার গেটে বসে আছে অনেক অসহায় মুখ । তাদের দলে মিশে গেলেন তিনি । প্রথমটা একটু অস্বস্তি লাগছিল । সারা জীবন খেটে খেয়েছেন তবুও হাত পাতেনি কারোর কাছে । হাত পাতা তো দূরের কথা কারোর কাছ থেকে একটা টাকা পর্যন্ত ঋণ নেননি । তাকে কিনা আজ ভিক্ষা করতে হচ্ছে । এক মনে ভাবছেন এটা কি ঠিক করছেন? আবার আরেক মনে ভাবছেন হলই বা ভিক্ষা। স্বামী হিসেবে স্ত্রীর ইচ্ছা পূরণ করা তাঁর কর্তব্য । যে মানুষটা না খেয়ে দেয়ে নিজের স্বাদ-আহ্লাদ জলাঞ্জলি দিয়ে আমার সংসারটা আগলে রেখেছে , তার জন্য এটুকু তো করাই যায়। ভাবতে ভাবতে তার হাতে এসে পড়ল কড় কড়ে পাঁচশ টাকার একটা নোট। লোকটা বোধহয় অনেক বড়লোক হবে ! সবাইকে দিচ্ছেন অনেক কিছু । ঠাকুর ওনার ভালো করুক বলে হসপিটালে দিকে ছুটলেন তিনি । যাওয়ার সময় একটা দোকান থেকে কিনলেন একটা কেক তখন প্রায় রাত আটটা । মহিলা ওয়ার্ডে পুরুষ প্রবেশ নিষেধ। শত অনুরোধ করার পরও ওয়াচম্যান যেতে দিল না উপরে । চলে যাবেন এমন সময় এক নার্স দিদি বলল -" দিন আমায়। আমি গিয়ে দিয়ে আসছি। আর আপনি ওদিকটায় গিয়ে দাঁড়ান , ওনাকে দেখতে পাবেন । দাঁড়িয়ে আছেন তো দাঁড়িয়েই আছেন। মিনিট দশেক হয়ে গেল কারো দেখা নেই ।এমন সময় সেই নার্স দিদিটা বললেন এই নিন এটা মাসিমা আপনার জন্য পাঠিয়েছেন। প্যাকেটটা হাতে নিয়ে দেখলেন তাতে হাফ কেক একটা রুটি আর একটা কৌটোতে একটু মাংসের তরকারি । ওপর থেকে কানে আওয়াজ এল খোকা আর তুমি খেয়ে নিও । আমি খেয়েছি । আর কেকটা খুব ভালো খেতে। আর হ্যাঁ, ঠান্ডায় বেশি দাঁড়িয়ে থেকো না। শরীর খারাপ করবে। যাও, খোকার কাছে যাও । আমি ভালো আছি । চিন্তা করো না। রোহিনী দেবীর দিকে তাকিয়ে কেকটাতে একটা কামড় বসালেন শ্যাম চরণ বাবু। আর তাঁর চোখ দুটো বয়ে গড়িয়ে পড়ছে এক অন্য রকমের আনন্দ অশ্রু ধারা।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন