পিঠে - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // নতুন বাংলা গল্প।
পিঠে
রূপবালা সিংহ রায়
Pithe written by Rupbala Singha Roy // Bengali Story // Bangla Golpo // New Bengali Story // Notun Bangla Golpo.
--না এটা আমার
--একদম না! ওটা আমার ছিল। তুই তো আগে একটা খেলি....
--খেয়েছি বেশ করেছি। এটাও খাব।
-- না... দে বলছি। খাবি না... খাবি না.. ওটা। ওটা কিন্তু আমার।
দুই ভাই বোন কে হাতাহাতি করতে দেখে বিছানা করা বাদ দিয়ে দৌড়ে আসে কিঙ্কিনী। এই ছেলে মেয়ে দুটোকে নিয়ে না আর পারা যায় না। আজকাল বড্ড ঝগড়ুটে হয়ে যাচ্ছে। বড় যত হচ্ছে ততই যেন ওদের ঝগড়া বেড়েই চলেছে! কই ছোটবেলাতে তো এমনটা ছিল না! যে জিনিসটা একটা থাকবে সেটা নিয়েই ওদের ঝামেলা শুরু। আজকাল আর ভালো লাগে না তার। যতক্ষণ স্কুলে থাকে আর ঘুমায় ততক্ষণ যেন শান্তি।
-- রাত দুপুর হতে চলল সারাদিনের পরিশ্রমের পর কোথায় গিয়ে একটু শোব তা নয়! কি হয়েছেটা কি বলতো তোদের? বলেছি না এত জোরে জোরে ঝগড়া করবি না, লোকে শুনে কি বলে?
-- যা বলে বলুক... মেয়ের মুখে কথাটা শুনে মাথাটা আরো গরম হয়ে যায় তার। ওদিকে ছেলেটা মাকে দেখে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদছে আর নালিশ করছে..
--দেখো না মা আমার পিঠেটা দিদি খেয়ে নিয়েছে। কথাগুলো বলছে আর এক কামড় বসানো তেলের পিঠেটা দেখাচ্ছে তাকে।
এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না সে । এ ভারী অন্যায় পুঁচকির। পিঠেটা তো পাপাইয়ের জন্য রাখাছিল। বারবার বলে রেখেছিল সে পুঁচকিকে খাস না যেন ওটা। ওটা কিন্তু ভাইয়ের, ও কিন্তু কান্না করবে। শুনলো না! সে ঠিক এক কামড় খেয়ে নিল! এত খায় এত খায় মেয়েটা তবুও যেন খেয়ে হয় না! খেতে ভালোবেসে বলে কোথায় বড় মাছের পিসটা, বড় ডিমটা, চাওমিনের বড় অংশটা ওকেই দেওয়া হয়। তারপরও প্রত্যেকবার এটা করে! এই যে গতকাল পিঠে করা হলো সেই.. তো বেশি খেল। তারপর যা বেঁচে ছিল আজ চলতে ফিরতে কখন যে খেয়ে নিয়েছে টেরই পায়নি কিঙ্কিনী। অবশেষে যখন দেখল তখন তিনটে বেঁচে। একটা পুঁচকিকে দিল আর একটা তার বাবা অরুনাভকে আর একটা রেখেছিল ছেলেটার জন্য। সে আবার আর একজন! সন্ধ্যেতে ওরা যখন খাচ্ছিল তখন খেলো না বলল -- খাওয়ার পরে খাবে। নে খা পরে... মাথার মধ্যেটা যেন দাউ দাউ করে জ্বলছে তার। এদিকে ছেলের হাউমাউ করে শোকের কান্না ও দিকে মেয়ের ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা আর তাদের বাবার কানের তুলো গুঁজে স্কুলের খাতা দেখা। সব জ্বালা যেন তার! কেউ নেই তো এ বাড়িতে, কেন তিনি পারেন না এখানে আসতে? দু মিনিট পারেন না বাচ্চা দুটোকে বোঝাতে? তা কেন পারবেন, উনার সব জ্ঞান তো তুলে রাখেন স্কুলের বাচ্চাদের জন্য। বাড়ির দুটোকে দিলে তো ফুরিয়ে যাবে! এবার যেন সে চন্ডী মূর্তি ধারণ করল। হাজার বুঝেও যখন ছেলের কান্না থামলো না ওর পিঠের টুক করে দিয়ে -- খা এবার পিঠে বলে মেয়েটাকে ধরতে যাবে অমনি অরুনাভ হাজির ।
--কিগো এখানে দাঁড়িয়ে কি করছ? পিঠে বানাবে না?
হঠাৎ করে অরুনাভর গলার আওয়াজ পেয়ে স্মৃতির পাতাগুলো বন্ধ করে বাস্তব জগতে ফিরে এলো কিঙ্কিনী। সেই দিনগুলো যে কিভাবে হুশ করে কেটে গেল কে জানে! তখন শুধু চাই তো কখন বড় হবে দুটো আর যখন সত্যি সত্যি বড় হয়ে তারা দূরে চলে গেল এখন শুধু মনে হয় ওরা বড় না হলেই বোধহয় ভালো হতো। ঝগড়া করুক মারপিট করুক থাকত তো চোখের সামনে। আর তাছাড়া দুজন যতটা না দুজনের শত্রু ছিল বন্ধু ছিল তার দশ গুণ। মেয়েটা চোখে হারাতে তার ভাইকে। আর ভাই দিদি বলতে অঞ্জান। আজ তারা এতটাই ব্যস্ত যে দুজন দুজনের সাথে দেখা তেমন হয় না বললেই চলে। ছেলে চাকরি সূত্রে অন্য জায়গায় থাকে আর মেয়ে শ্বশুর বাড়ি। একজন যখন ফাঁকা পেয়ে আসে অন্যজন তখন আসতে পারে না তাই আর তেমন দেখা সাক্ষাৎ হয় না তাদের।
ক'দিন ধরে অরুনাভর বড্ড পিঠে খেতে ইচ্ছা করছিল। বলা ভালো এই অছিলায় ছেলেমেয়ে দুটোকে বাড়িতে একসাথে দেখতে চাইছিল। পৌষ সংক্রান্তির যদিও অনেক বাকি তবুও মন তো তাই শনি রবিবার দুটো দিন বলেছিল ওদের আসতে। ওরা আসবেও বলেছিল। ছেলে বৌমা এসেও পড়েছে কিন্তু মেয়ে শেষ মুহূর্তে জানিয়ে দিয়েছে যে সে আসতে পারবে না। মনটা বড় ভেঙে গেছে দুজনের। যে এসব খেতে বেশি ভালবাসে সেই কিনা আসতে পারবে না! আর তাকে জোরও তো দেওয়া যায় না। স্বামী সংসার বাচ্চা সামলে নিজের অফিস সময় কোথায় তার!
দেখতে দেখতে সন্ধ্যে নেমে এসেছে। গরম তেলে পিঠের ব্যাটা ঢালছে কিঙ্কিনী। আর বরাবরের মতো অরুণাভ তা ভেজে তুলছে। ওদিকে বৌমা দাঁড়িয়ে পরখ করছে আর ছেলে একটা নিয়ে এক কামড় বসিয়ে বলছে -- নাহ ভালো হয়নি, দিদি আসেনি বলে ভালো করে বানাওনি তুমি মা.. এটা কিন্তু ঠিক না মা... তুমি কিন্তু এখনো দিদিকে বেশি ভালোবাসো..
-- বাসে ঠিক করে। আরো বেশি করে বাসবে। তোকে কি কম ভালোবাসে...সবসময় স্কুল থেকে ফেরার পথে তুই মায়ের হাত ধরে হাঁটবি। কেন রে আমি কি পড়ে যেতে পারি না! তারপর তোর স্কুল ব্যাগ সবসময় আমি বইতাম আর মা আমারটা আর তুই নাচতে নাচতে আসতিস! এবার বল মা কাকে বেশি ভালোবাসে?
মেয়ের কণ্ঠস্বর শুনে খুশিতে চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো অরুনাভর। আর কিঙ্কিনী সেই পুরোনো দিনের মতো ছুটে এলো তাদের ঝগড়া থামাতে...
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন