বছর শেষের হিসাব - রূপবালা সিংহ রায় // Bangla Golpo // Bengali Story .
বছর শেষের হিসাব
রূপবালা সিংহ রায়
Bochor Seser Hishab written by Rupbala Singha Roy // Bangla Golpo // Bengali Story // New Bengali Story // Notun Bangla Golpo
জানিস তো বাবু আজকের দিনে হিসাবের খাতাটা নিয়ে একটু বসতে হয়। গোটা বছরটা জুড়ে কি করলি, কি না করলি তার হিসাব করতে হয় -- বলতে বলতে কমলালেবু ছড়াচ্ছে অনসূয়া। ক্লাস এইটের টুবাই মায়ের কথাটা শোনার পর বলেছিল-- মা তুমি হিসাব করেছ কোনো দিন? এই যে বিয়ে হয়ে এবাড়িতে এসেছ এত বছর হয়ে গেল কখনো কোনো বছরের শেষ থার্টি ফার্স্টে কি উঁকি মেরে দেখেছ তোমার বছরখানা কেমন কাটল? তুমি কি করলে আর তার প্রতিদানে কি পেলে? সবাই তোমার থেকে কেবল নিয়েই গেল ! এর টিফিন, ওর ভালোলাগার পদ, তার জামা কাপড় আয়রন হল কিনা সব হিসাব তোমায় রাখতে হয়! সংসারে কার কখন কি প্রয়োজন সব হিসাব রাখো তুমি, নিজের প্রয়োজনের হিসাব রেখেছ কোনোদিন? সারাজীবন শুধু নিজেকে বিলিয়ে গেলে! এবার তো অন্তত নিজের হিসাবের খাতাটা নিয়ে বসো....
ছেলের কথা শুনে সত্যি সত্যি সেদিন অনসূয়া বসেছিল হিসাবের খাতাটা নিয়ে। কত স্বপ্ন ছিল তার দুচোখে। একজন শিক্ষিকা হবার, ঠিক ওদের স্কুলের ভূগোলের দিদিমনি সুদেষ্ণা ম্যামের মতো। পড়াশোনাতে খারাপ যে ছিল তাও নয়। তারপরও একটা বছরের জন্য গ্রাজুয়েশনটা দেওয়া হল না তার। বাবা বিয়ে দিয়ে দিল। এরা যদিও বলেছিল পড়াবে কিন্তু সেটা যে কথার কথা ছিল। বাড়ির বউকে আর কেইবা পড়ায়? তারপর পুরোপুরি সংসারী হয়ে উঠল সে। তাতে কোন আফসোস নেই তার। কিন্তু যখন তার নিজের স্বামী সমর নিজের ছোট ভাইয়ের বউয়ের সঙ্গে তার তুলনা করে খুব খারাপ লাগে অনসূয়ার। বলতে চায় সে- তোমার ছোট ভাইয়ের বউ কি পারবে আমার মত সংসার সামলে সবার খেয়াল রাখতে, এক একজনের পছন্দ অনুযায়ী হাজারটা পথ রান্না করতে? পারবে না। তবুও বলতে পারেনা। এ সংসারে মানুষ কেবল টাকার কদর করে। যে কাজে টাকা আছে তার কদর আছে। আর যে কাজে টাকা নেই তার কদরও নেই। অনেক হিসাব করার পর যখন হাতের শূন্য এসে থামলো তখন থেকে শুরু হয়েছিল তার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। স্বামী শাশুড়ি সবার বিরুদ্ধে গিয়ে ভর্তি হয়েছিল একটা কলেজে প্রাইভেটে গ্রাজুয়েশন করার জন্য। মুখ টিপে হেসেছিল ছোট জা ও দেওর। সেইসঙ্গে কিছু পাড়া-প্রতিবেশীও। শুধুমাত্র সাপোর্ট করেছিল শ্বশুরমশাই আর তার ছেলে।
না সে কোনো চাকরি পায়নি। এই বাজারে চাকরি পাওয়া মুখের কথা নয় তবুও নিজের মধ্যে যে কনফিডেন্সটা তৈরি হয়েছিল যে আমি পারি টাকা ইনকাম করতে সেটাও বা কম কিসে? তাই সে বাড়িতেই খুলে ফেলে একটা কোচিং সেন্টার। সেই সঙ্গে চলতে থাকে তার উচ্চশিক্ষা।
আজ সে বাড়িতে বসেই তার ছোট জায়ের সমান অর্থ উপার্জন করে। আজ আর তাকে বছর শেষের দিনটাতে হিসাবের খাতা নিয়ে বসতে হয় না যে জীবনে কি পেলাম আর কি পেলাম না...
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন