ভালো মানুষের মেয়ে - রূপবালা সিংহ রায় // Valo Manuser Meye Written by Rupbala Singha Roy// New Bengali Story.
ভালো মানুষের মেয়ে
রূপবালা সিংহ রায়
পরপর তিনদিন দীপঙ্কর বাবুকে চায়ের দোকানে আসতে না দেখে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন সুনির্মল বাবু।শরীর টরীর খারাপ হলো না তো! ফোন করেও কোনো সুরাহা হলো না। একে তাকে জিজ্ঞাসা করেও কিছু জানতে না পেরে একটা রিক্সা করে গিয়ে উঠলেন দীপঙ্কর বাবুর বাড়িতে। ঝকঝকে পরিপাটি বাড়ি খানা। এই শহরতলীর বুকে নিজের একটা বাড়ি থাকা যে কতটা শান্তির তা ভেবে মনে মনে আজও হিংসা হয় দীপঙ্কর বাবুর কপালের ওপর। কোনোমতে একটা চাকরি জোটায় গ্রাম থেকে এসে একটা ফ্লাট কিনতে পেরেছিলেন তিনি। তারপর ছেলে মেয়ের পড়াশুনো, তাদের নিজের পায়ে দাঁড় করানো, তাদের বিয়ে দেওয়া পর্যন্ত করে আজ তিনি ক্ষান্ত দিয়েছেন। বরাবর ইচ্ছা ছিল নিজের একটা বাড়ি বানানোর ।ফ্ল্যাটে থেকে ঠিক পোষায় না। পাঁচজনের পাঁচ রকম মতিগতি। আহা! কি সুন্দর ফুলের বাগান। নানান রকমের ফুলের গন্ধে মনটা একেবারে জুড়িয়ে যায়! কি আর করা যাবে সবই কপাল -- ভাবতে ভাবতে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ঢুকলেন বাড়ির মধ্যে। ঢুকে দীপঙ্করের কথা জিজ্ঞাসা করতে তাঁর বৌমা একটা ঘর দেখিয়ে ওখানে আছে বলেই সোজা চলে গেল অন্য একটা ঘরে। বৌমাটি বেশ খাসা পেয়েছে দীপঙ্কর। বড়লোক বাবার একমাত্র মেয়ে। যেমন দেখতে শুনতে তেমনি নিশ্চয়ই তার গুণ হবে। আর আমার ছেলেটাকে দেখো কি একটা ঘরে এনেছে? না আছে বাবার টাকা পয়সা, না আছে তার গায়ের রং! কি দেখে যে ছেলের পছন্দ হল কে জানে! যাকগে আমার আর কি? মানা যে করিনি তা তো নয়, বসেছিলাম বেঁকে কিন্তু ওই যে আমার গিন্নি তিনি বললেন ধনী গরীবের মেয়ে কিনা দেখো না বুঝলে ভালো মানুষের মেয়ে কিনা দেখো। তার কথার মানে এখনো পর্যন্ত আমার মাথায় ঢোকেনি। দীপঙ্কর বলেছিল - না রাজি হতে কিন্তু গিন্নিটা খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিল তাই বাধ্য হয়ে রাজি হওয়া। উফ! পেটে ছুঁচো যেন ডন মারছে। চা টাও খাওয়া হলো না দীপঙ্করের বৌমা বোধহয় গেল রান্নাঘরে -- ভাবতে ভাবতে তিনি গিয়ে ঢুকলেন দীপঙ্করবাবুর ঘরে। ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। পা রাখতেই নাকে ভেসে আসছে দুর্গন্ধ। বাবা! বমি উঠে আসার মত অবস্থা। তাই তিনি কোনোরকমে পকেট থেকে রুমালটা বের করে নাকে চেপে ধরে জানালার পর্দা সরাতেই দেখল ঘরটা নোংরায় নোংরা। তার মাঝে অর্ধ সচেতন অবস্থায় শুয়ে আছে দীপঙ্কর। চোখে আলো পড়তে সুনির্মল বাবুকে দেখতে পেয়ে উঠতে গেলে সুনির্মাল বাবু মানা করলেন তাঁকে। ডাক্তার দেখানো হয়েছে কিনা জিজ্ঞাসা করায় বললেন -- হয়েছে। কিন্তু তাতেও জ্বরটা নামছে না। আরও জানালেন গতকাল রাতে জ্বরের ঘোরে বমি করে ফেলেছেন আর বাথরুম পর্যন্ত যেতে পারেননি। কাজের মেয়েটা এসে পড়লো বলে, সে এসে সব পরিষ্কার করে দেবে। সুনির্মল বাবু জিজ্ঞাসা করলেন -- তোর ছেলে বৌমা দেখেনি এসব?
-- হ্যাঁ ছেলে এসেছিল সেও বা কি করবে তার নিজেরই বমি দেখলে বমি পায়। আর তাছাড়া এটা ভাইরাল ছোঁয়াচে জ্বর বলে বৌমা আর এদিকে আসছে না। তারই বা দোষ দিই কি করে বল? পুরো সংসারটা সামলাচ্ছে। কিছু যদি হয় তাহলে সংসারটা কে দেখবে! বলতে বলতে চোখ দুটো ছল ছল করে উঠল দীপঙ্কর বাবুর
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বন্ধুর হাতে হাতটা রাখেন সুনির্মল বাবু। কিইবা বলবেন তিনি? এখন শুধু অপেক্ষা কাজের মেয়েটার। সে যদি না আসে তাহলে সারাদিন এভাবেই পড়ে থাকবে ও? ভেবেই আশঙ্কায় বুক কেঁপে ওঠে তাঁর। এমন সময় তাঁর ফোনটা বেজে ওঠে। বৌমা ফোন করেছে
--হ্যালো
--বাবা কোথায় তুমি
--এই তো দীপঙ্করের বাড়িতে। ওর শরীরটা খারাপ তাই দেখতে এলাম।
--যাবে যাও কিন্তু একবার ফোনটা তো করে দিতে পারতে চিন্তা হয় না বুঝি? বেলা তো কম হলো না, খাওয়া হয়েছে কিছু?
--হ্যাঁ খেয়েছি। তুমি অতো চিন্তা করো না। তাড়াতাড়িই আসছি আমি।
--ঠিক আছে রাখছি তাহলে, সাবধানে এসো।
ইতিমধ্যে কাজের মেয়েটা এসে হাজির। তাই একটুও নিশ্চয়তা পেয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন সুনির্মল বাবু। বেরোনোর সময় দীপঙ্করের বৌমাকে দূরে দেখে একটু গলা খাঁকারি দিলেন তিনি কিন্তু সে শুনেও না শোনার ভান করে থাকলো। তাই অগত্যা কাজের মেয়েটাকে যা বলার বলে বেরিয়ে পড়লেন তিনি।
পথে হাঁটতে হাঁটতে তাঁর চোখের সামনে ভাসছিল তার স্ত্রীর কথা। টানা দুমাস বিছানায় পড়েছিল সে। স্ট্রোক করেছিল। আর হবে না বলে হাসপাতাল থেকে ফেরত দিয়েছিল। নাকে নল লাগানো ছিল, মুখ দিয়ে খেতে পর্যন্ত পারত না। স্নান, খাওয়া থেকে শুরু করে পায়খানা পরিষ্কার পর্যন্ত সব করতো বৌমা। ছেলে বলেছিল লোক রাখতে সে রাখেনি বলেছিল -- আমার মা হলে কি আমি তাকে লোকের হাতে তুলে দিতে পারতাম? লোকে হয়তো করে দেবে কিন্তু আমার মনটা কেমন যেন খুঁতখুঁত করবে। তার থেকে ভালো আমি করি। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো সুনির্মল বাবুর। সত্যি সত্যিই গিন্নির কথাখানা আজ বুঝতে পারলেন তিনি। ধনী গরিব নয় ভালো মানুষের মেয়ে কিনা দেখো?
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন