এলোকেশী - রূপবালা সিংহ রায় // Elokeshi by Rupbala Singha Roy


এলোকেশী

রূপবালা সিংহ রায় 

 বিয়ের মোটে মাস তিনেক হয়েছে সুলগ্নার, বেশ অভিজাত পরিবারে।  গ্রামের সাদামাটা পরিবারের মেয়ে মেরে সে। তাই কিছু থাকুক আর থাকুক লক্ষ্মীমন্ত বৌ হওয়ার সব গুণই বিদ্যমান তার মধ্যে। সেইজন্য শ্বশুর বাড়ির লোকজন সহ আশেপাশের পাড়া প্রতিবেশীরাও তার প্রসংশায় পঞ্চমুখ। বাড়িতে মানুষ বলতে সে, তার স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি, জা-ভাসুর আর তাদের তিন বছরের মেয়ে। বেশ সুখেই আছে সুলগ্না। শ্বাশুড়ি আর জা তাকে বেশ আগলেই রাখে। কিন্তু মাঝেমধ্যে তার ভাসুরের চাহনি  ভীষণ খারাপ লাগে তার। কেন জানা নেই তার সামনে যেতেই ইচ্ছা করে না। এক বাড়িতে থেকে তো আর সেটা সম্ভব নয় তাই যতটা পারা যায় তাকে এড়িয়েই চলে সে। কিন্তু লক্ষ্মীপুজোর দিন যে ঘটনাটা ঘটল সেটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। পুজো শেষে সবাইকে যখন সে প্রসাদ দিচ্ছিল তখন তার ভাসুর প্রসাদের প্লেটটা নেওয়ার অছিলায় তার হাতের আঙুলগুলো চেপে ধরে। গা ঘিনঘিন করছিল তার। কাকে বলবে কথাটা ভেবে দিদিকে জানায় সে। দিদি বিষয়টা পাত্তা না দিয়েই বলে তোর মনের ভুল হতে পারে । আর তাও যদি না হয় এই বিষয়টা নিয়ে তুই কার সাথেই বা কথা বলবি? আর তাছাড়া তোর জা'য়ের কথাটা ভেবে দেখ একবার, সে কতটা আঘাত পাবে। সত্যিতো দিদিভাইয়ের কথাটা তখন মাথায় আসেনি তার। তাই দিদির সাথে কথা বলে ঠিক হয় যে সে তেমন আর যাবে না তার সামনে। আর বিষয়টা মাথা থেকে দূর করে দেবে। কিন্তু দুষ্টু লোকের দুষ্টুমি কি আর থেমে থাকে? থাকে না। সে সুযোগ খুঁজতে থাকে আর পেয়েও যায়। লক্ষ্মী পুজো পেরিয়ে কালীপুজো। ওর শ্বশুর বাড়িতে বড়ো করে পুজো হয়। বেশ অনেকদিন থেকেই হয়ে আসছে। সারা বাড়ি সমেত ঠাকুর দালানটা সাজানো শেষ। পরদিন পুজো। সকাল থেকেই কত কাজ, তার ওপর রাত জাগতে হবে বলে সবাই তাড়াতাড়ি খাওয়া দাওয়া করে শুয়ে পড়ে। একঘুম দেওয়ার পর আচমকা ঘুমটা ভেঙে যায় সুগ্নার। পাশ ফিরে আবার ঘুমোতে গেলে মনে পড়ে ঠাকুর দালানে জ্বালানো প্রদীপটার কথা। শাশুড়ি মা বলেছিল যার যখন ঘুম ভাঙবে সে প্রদীপটাতে গিয়ে যেন একটু করে তেল দিয়ে আসে আর দেখে আসে সেটা জ্বলছে কিনা। লক্ষ্মী পুজোর দিন থেকে ওই যে প্রদীপ জ্বলা শুরু করে সে প্রদীপ আর নেভানো হয় না। জ্বলে কালীপুজোর পরদিন পর্যন্ত। এটাই নাকি এবাড়ির নিয়ম। প্রদীপে তেল দিয়ে ঠাকুরদালান থেকে নেমে বসার ঘর, রান্নাঘর,খাবার ঘর পেরিয়ে নিজের ঘরে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে যাবে এমন সময় তার আঁচলে পড়ল টান। চমকে পিছন ফিরে দেখে তার ভাসুর। কি করবে সে? নিজেকে বাঁচাবে নাকি জায়ের কথা ভাববে? মাথা কাজ করছে না তার। অনেক অনুনয় বিনয়ও করল সে। কিন্তু কোনো কাজ হলো না। অবশেষে চিৎকার করতে শুরু করল কিন্তু সবাই যে নিজের নিজের ঘরে দরজা লাগিয়ে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। তাছাড়া সবার ঘরগুলো তো দোতলাতে। তাকে চিৎকার করতে দেখে মুখ চেপে ধরল সেই নরপশু। সুলগ্না সজোরে তার হাতে কামড় লাগিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে যাবে তখন সিঁড়ি আগলে দাঁড়ালো সে। কোনো উপায় না দেখে সুলগ্না ছুট লাগালো অন্যদিকে খাবার ঘর, রান্নাঘর, বসার ঘর পেরিয়ে গিয়ে উঠল ঠাকুর দালানে। প্রদীপের আলোয় মায়ের মুখ খানা চকচক করছে। যেন মা বলছে আর দাঁড়িয়ে থাকিস না সুলগ্না। নে আমার খড়্গ টা। আর লক্ষী মেয়ে বউ হয়ে থাকিস না, প্রতিবাদ কর নিজেকে রক্ষা কর। তা না হলে যে সারা জীবন এই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হবে। সুলগ্না হাতে তুলে নিল খড়্গখানা। তার চোখ থেকে যেন ঠিকরে পড়ছে আলোর জ্যোতি। সমগ্র মুখমণ্ডলে ভয়ংকরীর ছাপ। এলো চুলে তাকে একেবারে এলোকেশীই লাগছে। পেছনে নয়, সামনে এগোতে লাগল সে আর তার ভাসুর পেছনে, দেয়ালে পিট থেকে গেল তার। অবশেষে মা মা বলে পা জড়িয়ে ধরল সে সুলগ্নার। আর বলতে থাকলো ক্ষমা কর মা.... ক্ষমা কর মা.... আর কখনো হবে না... কখনো না....



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।