আদুরে আলাপন - রূপবালা সিংহ রায় // AdureAlapon by Rupbala Singha Roy


আদুরে আলাপন

রূপবালা সিংহ রায় 


 "খাওয়া হয়ে গেলে আমার ঘর থেকে একবার ঘুরে যাস ছোট" -- গম্ভীর গলায় কথাখানা বলে খাবারের থালাটা ঠেলে উঠে পড়ল নন্দিনীর বড় জা সুচরিতা। নন্দিনী তাকিয়ে দেখল তার থালায় এখনো পড়ে রয়েছে আস্ত একখানা রুটি আর আধবাটি তরকারি। প্রথম রুটি খানা থেকে এক টুকরো ছিঁড়ে তরকারিটাতে ডুবিয়ে মুখে নেওয়ার পর থেকেই দিদি ভাইয়ের মুখখানা কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেছে। গম্ভীর হওয়ার কারণটা যদিও সে ভালোভাবেই জানে। একটু আগে যখন তার স্বামী আর দাদাভাই খেতে বসলো তখন থেকে। দাদাভাই যদিও কিছু বলেনি, বলেছিল তার স্বামী অরিন। খেতে খেতে মুখ বেঁকিয়ে বলেছিল -- "এটা রান্না হয়েছে? সব লবণটাই ঢেলে দিলে তো পারতে!" আরো কিছু বলার আগে ভাগ্যিস দাদাভাই তাকে থামিয়ে দেয় তা নাহলে তা যে কতক্ষণ চলতো কেউ জানে না। দিদিভাই তখন খেতে আসেনি, স্কুলের বাচ্চাদের পরীক্ষার খাতা দিচ্ছিল। তাই নন্দিনীও আগে খেয়ে নিতে পারেনি অপেক্ষা করছিল তার জন্য যেহেতু বরাবরই রাতের খাবারটা তারা একসাথে খায়। 


দিদিভাই খায়নি বলে যতটা না খারাপ লাগছিল ঠিক ততটাই ভয় করছিল না জানি কি বলবে সে। এদিক ওদিক হলে একটুও সহ্য করতে পারেনা দিদিভাই। তার ওপর স্কুলের হেড দিদি মনি বলে কথা। তার সবকিছু পারফেক্ট চাই‌। মনে পড়ে বছর কয়েক আগের কথা-- তখন নতুন বিয়ে হয়ে এসেছিল সে এ বাড়িতে। দিদিভাই তখনো পড়াতো স্কুলে। যেটা শাশুড়ি মায়ের একেবারে অপছন্দ ছিল। তিনি চাইতেন তাঁর বউমারা তার মত সংসার চালাবে। ঘরের বউ কেন যাবে বাইরে কাজ করতে? আর তাছাড়া তাদের অবস্থা এত খারাপ নয় যে বৌমার রোজগারের টাকায় তাদের খেতে হবে! কম চেষ্টা করেননি তিনি দিদিভাইয়ের চাকরিটা ছাড়ানোর কিন্তু পারেননি। এই নিয়ে দাদাভাইকে অনেক কথা শুনতে হয়েছিল তার মায়ের কাছে যেহেতু তাদের লাভ ম্যারেজ ছিল। বড় বউ মনের মতো না হওয়ায় শাশুড়িমা নিজে দেখে শুনে গ্রাম থেকে ঘরোয়া মেয়ের সাথে বিয়ে দেন তার ছোট ছেলে অরিনের। সেই শর্ত অনুযায়ী সংসারের বেশিরভাগ কাজের দায়িত্ব গিয়ে পড়ে নন্দিনীর উপর। আস্তে আস্তে সে হয়ে ওঠে শাশুড়িমার মনের মতো বৌমা। তা নিয়ে সুচরিতার কোনো মাথাব্যথা হতো কিনা ঠিক বুঝে উঠতে পারত না সে। সুচরিতা কেমন যেন নিজের জগতে বিচরণ করে। অবসরে যেটুকু করার সেটুকু করে নিজের ঘরে চলে যায়। তেমন কথা হয় না তার নন্দিনীর সঙ্গে। কিন্তু নন্দিনী ভীষণভাবে চাইত তার সান্নিধ্য। খুব ইচ্ছা করত তাকে নিজের দিদির জায়গাটা দিতে। তাই চুপি চুপি তার ভাগের কাজগুলো করে দিত সে। যেটা নিয়ে তাকে কথা শুনতে হতো শাশুড়ি মায়ের কাছে। এমনকি সুচরিতার কাছেও। খুব অভিমান হতো নন্দিনীর। তবুও সে নাছোড়বান্দার মত লেগেছিল। একদিন তো ভীষণ রকম রেগে গিয়েছিল দিদিভাই। সেদিন ছিল রবিবার। দিদি ভাইয়ের ঘরবাড়ি ঝাড় পোছ করার দিন। কিন্তু ফুরসত নেই তার। ব্যস্ত পরীক্ষার খাতা দেখতে। শাশুড়ি মা একটু বাইরে গেছেন দেখে নন্দিনী শুরু করে সুচরিতার ভাগের কাজটা করা। কিন্তু ভুলবশত শাশুড়িমা'র প্রিয় ফুলদানিটা হাত ফসকে মেঝেতে পড়ে ভেঙে যায়। শব্দ শুনে ছুটে আসে সুচরিতা। এমন সময় ফিরে আসেন শ্বাশুড়ি মাও। যা না তা বলেন সুচরিতাকে। ভাবেন সেই বোধহয় তার কাজগুলো নন্দিনীকে দিয়ে করাচ্ছে। বেজায় রেগে যায় সুচরিতা‌ সবার সামনে কিছু না বললেও পরে নন্দিনীকে তার ঘরে ডেকে শোনায় বেশ কিছু কড়া কড়া কথা। দিদি ভাইয়ের এই এক গুণ কি দোষ জানেনা নন্দিনী কারো সাথে কিছু হলে সবার মাঝে তা না বলে একান্তে বলে। এটা খুব ভালো লাগে তার।


 কিন্তু আজ তো খাবার টেবিলে আমরা দুজন ছিলাম কিছু বলার হলে সেখানেই বলতে পারত দিদিভাই! ঘরে কেন ডাকল? উঁকি দিয়ে দেখলো নন্দিনী, দাদাভাই ড্রয়িং রুমে বসে টিভি দেখছে দিদিভাই সেখানে নেই। তাহলে সে তার ঘরেই আছে। তাই এদিক-ওদিক কিছু না ভেবে সে গেল তার ঘরে। ঘরে ঢোকার আগেই শুনতে পেল সুচরিতার কণ্ঠস্বর।


-- ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দে 


দরজা কেন বন্ধ করতে বলছে দিদিভাই? তরকারিতে সামান্য একটু লবণ হয়ে গেছে বলে এত রাগ! কই এর আগেও তো কতবার অমন হয়েছে তখন তো কিছু বলেনি। আজ হঠাৎ কি হল দিদি ভাইয়ের? হেড দিদিমণি হওয়ার পর থেকে কেমন যেন আজকাল একটু কড়া হয়ে যাচ্ছে। শাশুড়ি মা যদি বেঁচে থাকতেন খুব ভালো হতো। মনে পড়ে সেদিনের কথা-- সেদিনও তরকারিতে লবণ বেশি হয়ে গিয়েছিল। তবুও সবাই চুপচাপ খাচ্ছিল কিন্তু অরিন মুখে দিয়েই শুরু করে দেয় খোঁটা দেওয়া। শাশুড়ি মা তাকে থামিয়ে বলে খেতে যদি খুব অসুবিধা হয় তবে এবার থেকে নিজে রান্না করে খাবে। রোজ রোজ একই রান্না, মাঝেমধ্যে একটু কম বেশি তো হবেই। তাতে এত রাগের কারণ তো আমি দেখি না!-- ভাবতে ভাবতে দুচোখ ভরে এলো নন্দিনীর।


-- কিরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি ভাবছিস ভেতরে আয়।


 কথাটা শুনে কোনোরকমে দরজাটা বন্ধ করে নন্দিনী এলো ঘরের মধ্যে। সুচরিতা তখনো খাতা দেখছে। তাকে কিছু বলতে না দেখে নন্দিনী আমতা আমতা করে বলল --"কিছু কি বলবে, দিদিভাই" ?


সুচরিতা এক নজর তার দিকে তাকিয়ে আবারো খাতা দেখতে শুরু করলো। এবার খুব রাগ হলো নন্দিনীর। কিছু বলার থাকলে বলছে না কেন? শুধু শুধু দাঁড় করিয়ে রেখেছে। কোনো মানে হয় এর! তবুও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল সে। অবশেষে নিজেকে শান্ত করে আবারো বললো -- "কিছু কি বলবে দিদিভাই?"


 এবার খাতাটা বন্ধ করতে করতে তার দিকে চোখ তুলল সুচরিতা। তার চোখ দুটো জবা ফুলের মত লাল টকটক করছে। দেখে মনে হচ্ছে ভীষণ রকম রেগে আছে। তা দেখে আরো রাগ হলো নন্দিনীর। মনে মনে ভাবলো -- বলুক না কিছু, আমিও ছাড়বো না। নিজে তো সংসারে কিছু করেনা তার ওপর বড় বড় কথা! সারাদিন হেসেল ঠেলছি, কই একবার এসে তো খবর নেয় না।


-- কিরে কোথায় পড়লি আবার? বাথরুমে বুঝি? 


আচমকা দিদিভাইয়ের মুখে অমন কথা শুনে আঁচল দিয়ে হাতের নিচের কালশিটে দাগটা ঢাকলো নন্দিনী। 


-- গালের পাশেও একটা দাগ আছে ঢাক কি করে ঢাকবি!


-- সত্যি বলছি দিদিভাই পড়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ মাথাটা ঘুরে গিয়েছিল...


-- এবার এক মেরে মাথাটা সত্যি সত্যি ঘুরিয়ে দেব ছোট। কি ভাবছিস আমি কিছুই বুঝিনা? অন্তত আমার কাছে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করিস না। কেন এত সহ্য করছিস বলতে পারিস?


--তো, কি করব দিদিভাই?


-- প্রতিবাদ করবি। 


-- কি বলল বলো? এমনিতেই কিছু হলে সবসময় বলে চলে যা, কোথায় যাবো বলো তো? মেয়েটা ছোট। ওর পড়াশুনো আছে। ওকে মানুষ করা আছে। কোথায় পাবো আমি অত টাকা? কিভাবে পড়াবো আমি ওকে ভালো স্কুলে? আর তাছাড়া তুমি তো জানো আমার বাপের বাড়ির অবস্থা।


-- আমি চলে যেতে বলিনি। বলছি প্রতিবাদ করতে। সে যদি দুটো কথা বলে, মুখ বুজে না শুনে অন্তত ফোঁসটুকু তো করা যায়। সে দশবার গায়ে হাত তুললে একবার তোলাই যায়। তা না হোক সেটা তো ঠেকানো যায়। তোর গায়ে তো জোর কম আছে বলে মনে হয় না। আর তা না পারলে পুলিশের কাছে যাওয়া যায়।


-- কি বলছো তুমি দিদিভাই! তুমি তো জানো ও একটু মাথা গরম গোছের মানুষ। মাথাটা গরম হয়ে গেলে হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। তা না হলে ও খুব ভালো। 


-- আমি অত শত বুঝি না, আর বুঝতেও চাই না। শুধু এইটুকু বুঝি যেমন কুকুর তেমন মুগুর নাহলে চলে না। এই দুনিয়ায় কেউ তোকে এমনি এমনি সব কিছু দেবে না। সে খাবার বল, থাকার জায়গা বল, সম্মান বল আর ভালোভাবে বাঁচা বল। সেটা তোকে অর্জন করে নিতে হবে। এই যে তুই সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত খাটছিস বলেই না তুই এখানে থাকতে পারছিস, খেতে পাচ্ছিস। তোকে যেমন কেউ বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবে না তেমনি তোর প্রাপ্যটুকুও তোকে এমনি এমনি দেবে না। সে সময় আর নেই। সেই সঙ্গে নেই তেমন ভালো মানুষও। আর থাকলেও সবার কপালে তা জোটে না। তাই তোকে সেটা বুঝে নিতে হবে। আর চুপ থাকিস নারে এবার তো অন্তত শক্ত হতে শেখ। আর কত নরম থাকবি!


কথাগুলো শুনে নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে নন্দিনী দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল সুচরিতার কোলে। তারপর তার কাঁধে মুখ গুঁজে ভিজে কন্ঠে বলল-- তাই হবে দিদিভাই, তাই হবে। তুমি সঙ্গে থেকো।


-- সঙ্গে আছি রে পাগলি - বলে সুচরিতা হাত বোলাতে থাকে তার পিঠে আর মাথায়।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।