স্যারের কথা - রূপবালা সিংহ রায় // Teachers Day Story // Happy Teachers Day ।

 

স্যারের কথা 

রূপবালা সিংহ রায় 

আজ বারবার একজনের কথাই মনে পড়ছে অনির্বাণের। আর তার কথা ভাবতেই অজানা এক প্রশান্তি দোল দিয়ে যাচ্ছে তার সমগ্র হৃদয় জুড়ে। হয়তো মানুষটা আজ আর তাঁর সাথে নেই কিন্তু তাঁর অস্তিত্ব তাঁর সেদিনের সেই কথাগুলো আজও যেন ঠিক তেমনভাবেই কানে বাজে। ইচ্ছা করছে চেঁচিয়ে বলতে যে -- স্যার, আপনি সেদিন ঠিকই বলেছিলেন। -- ভাবতে ভাবতে চোখ দুটো জলে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো তার। জলে ভেজা চোখ দুটো তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল আজ থেকে প্রায় সতেরো বছর আগে জীবনে। জলে থৈথৈ কলকাতার অলিগলি । ঝমঝম করে মুষলধারায় বৃষ্টি পড়ছে। সবাই যে যার মত নিজের মাথা বাঁচাতে ব্যস্ত। কেউ দৌড়ে রিক্সা ধরছে তো কেউ স্কুল জুতো দুটো হাতে নিয়ে প্যান্টটা হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে অতি সন্তর্পণে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছে। স্কুল গেট থেকে বেরিয়ে মেইন রাস্তায় যাওয়ার একটা মাঝারি রাস্তা আর একটা সরু গলি। গলিটা অপেক্ষাকৃত নিচু হয় জল বেশি জমেছে। তাই সবাই রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। আর এটাই সুযোগ স্কুল ফেরত সদ্য কিশোর প্রেমী যুগলের হাতে হাত ধরে হাঁটার আর দুচোখ ভরে স্বপ্ন দেখার। তাদের মধ্যে একজন ছিল অনির্বাণ। হঠাৎ করে স্যার যে এইগুলিতে ঢুকে পড়বেন বুঝতে পারেনি কেউ। স্যারকে আসতে দেখে সবাই সাবধান হয়ে গেলেও অনির্বাণের সেদিকে কোনো খেয়ালই ছিল না। মনের অব্যক্ত কথাগুলো গড়গড়িয়ে বলতে থাকে তৃপ্তিকে। যা গিয়ে পৌঁছায় স্যারের কানে। স্যার সেদিন কিছু না বললেও পরদিন বলেছিলেন ক্লাসে। সে কথাগুলো আজও স্পষ্ট মনে আছে তার।


 সেদিন বেশ ভয়ে ভয়ে ক্লাসে বসে ছিল সে। না জানি স্যার কি বলবেন? মা-বাবাকে না ডাকিয়ে পাঠান! গোটা স্কুলটাতে এই একজন স্যার যিনি সবার থেকে রাগী আর অংকের মতই কঠিন। যার মধ্যে দয়া মায়া তো কিছুই নেই, ভীষণ কড়া আর গম্ভীর। দশ হাত দূর থেকে স্যারকে আসতে দেখলেই ছেলেমেয়েরা সব ভয়ে পাথর হয়ে যায়। আজ কপালে খুব দুঃখ! হয় হেডমাস্টার মশাইয়ের ঘরে যেতে হবে নয়তো খেতে হবে ভীষণ বকুনি, কপালে মারও জুটতে পারে। চোখ বন্ধ করে যত রকমের ঠাকুরের নাম জানা আছে সবাইকে একে একে স্মরণ করতে থাকে সে ।নিজেকে পারলে ভষ্ম করে দেয় এমন অবস্থা তার। হঠাৎ স্যারের সঙ্গে চোখাচোখি হল। চোখ নামিয়ে আরো কুঁকড়ে গেল সে। কান দুটো তালা ধরে গেল তার। চোখে ঝাপসা দেখতে শুরু করল আর সারা শরীর থরথর করে ঘামতে শুরু করল। স্যার অংক করা বাদ দিয়ে এগিয়ে আছেন তার দিকে। ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ ।এখন কি হবে? মেরে ছেড়ে দিলে ঠিক আছে কিন্তু মা-বাবাকে যদি বলে দেন তখন কি হবে? আড় চোখে দেখতে পাচ্ছে সে স্যার তার বেঞ্চের কাছে দাঁড়িয়ে। বাধ্য হয়ে অনির্বাণ উঠে দাঁড়াতে গেলে স্যার তাকে ইশারায় বসতে বলে বোর্ডের কাছে গিয়ে চকটা টেবিলে রেখে বলেন -- আজ তোমাদের আমি একটা অন্য অংক শেখাবো। কি জানো?

 সবাই মাথা নেড়ে না জানালো। তা দেখে স্যার মুচকি হেসে বললেন -- জীবনের অংক। জানো তো আমাদের জীবনের অংকটা না ঠিক সরল অংকের মত। ধাপে ধাপে করতে হয়। তুমি যদি কোনো একটা ধাপ ভুল করো বা আগের ধাপ পরে আর পরের ধাপ আগে করো তাহলে তোমার জীবনের অংকে তোমায় শূন্য হাতে করে নিয়ে ফিরতে হবে। তার থেকে ভালো নয় কি ঠিক সময়ে ঠিকভাবে মত ঠিক কাজগুলো করে জীবনটা অতিবাহিত করা। কেউ কি বুঝল জানা নেই কিন্তু অনির্বাণের মাথায় ওই যে কথাটা চেপে বসল তা সে এখনো মাঝেমধ্যে বলে তার ছাত্রছাত্রীদের। তাদের মধ্যে হয়তো বেশিরভাগই শোনে না কিন্তু যে কয়জন শোনে আর তার মত জীবনটা সরল অংক মনে করে চলে এর থেকে বড় প্রাপ্তি আর কি হতে পারে!


 আজ ভীষণভাবে ইচ্ছা করছে একটিবারের জন্য স্যারের সঙ্গে দেখা করতে। স্কুল ছাড়ার পর আর যোগাযোগ করা হয়নি তাঁর সাথে। তাই স্কুলের কাছের এক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারে স্যার বেশ কয়েক বছর আগেই রিটায়ার্ড হয়ে গিয়েছিলেন। আর গত বছর তিনি ইহলোক ত্যাগ করেছেন। কথাখানা শুনতেই মনটা কেমন বিষন্নতায় ভরে উঠেছে তার। স্যার আর নেই। একটিবারের জন্য তাকে ভীষণ দরকার ছিল তার। পা দুটো ছুঁয়ে ধন্যবাদ কথাটা যে বলার ছিল ......

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।