শিক্ষার ফেরিওয়ালা - রূপবালা সিংহ রায় // Teachers Day Story // Bangla Golpo // Bengali Story

 

শিক্ষার ফেরিওয়ালা

রূপবালা সিংহ রায় 


"শিক্ষা চাই শিক্ষা.... 

শিক্ষা চাই শিক্ষা.... 

নানান রকমের শিক্ষা...

ছোটদের জন্য শিক্ষা। বড়দের জন্য শিক্ষা। মানুষ হওয়ার শিক্ষা। জীবনে বড়ো হওয়ার শিক্ষা। মহান হওয়ার শিক্ষা। ধনী-গরিবের শিক্ষা। জাত-পাতের শিক্ষা। শিক্ষা নেবে গো শিক্ষা".....


কাঠফাটা রোদ্রে শিক্ষার বৃদ্ধ ফেরিওয়ালা হেঁটে চলেছে শিক্ষা বিক্রি করতে। পথে-পথে, অলিতে-গলিতে, দেশ থেকে দেশান্তরে। আজ এই শিক্ষিত অত্যাধুনিক বিশ্বে শিক্ষার বড়ই অভাব যে! চেঁচাতে চেঁচাতে গলা শুকিয়ে কাঠ। কেউ আর শিক্ষা কিনতে চায় না, সবাই শিক্ষিত যে! ঘুরতে ঘুরতে হাঁটার শক্তিটাই যেন চলে গেছে তার। পা আর উঠতেই চাইছে না। তবুও কিছুটা হেঁটে কিছুটা বসে ফেরি করে বেড়াচ্ছে সে। একটাও শিক্ষা বিক্রি হয়নি যে।


পথের পাশে গাছের নিচে বসে থাকা কয়েকজন মানুষকে দেখতে পেয়ে গেল তাদের কাছে। বলল - "শিক্ষা নেবে শিক্ষা? আমার কাছে অনেক রকম শিক্ষা আছে। কার কোনটা চাই বলো? আমি দিয়ে দেব"। 

এক বৃদ্ধ মা বললেন -"আর কত শিক্ষা নেব বল দেখি! ছেলেকে বড় করার জন্য না খেয়ে দেয়ে ওকে বড় স্কুলে ভর্তি করিয়েছি। নিজেরা ভালো জামা কাপড় পরিনি কোনোদিন ওকে পরিয়েছি। নিজেদের বিষয় আশায় বিক্রি করে বিদেশে পাঠিয়েছে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য। ভেবেছিলাম শেষ বয়সে আমাদের সম্বল হবে। কিন্তু সেখানেই থেকে গেল সে। বাবা মাকে ভুলে গেল! ভুলে গেল!


পাশে বসে থাকা লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে ফেরিওয়ালা বলল -"তোমার কি শিক্ষা চাই? 

লোকটা বলল - "আমি! আমি শিক্ষা নিয়ে কি করব? মাস্টারমশাই আমি। সবাইকে শিক্ষা দিয়ে এসেছি সারা জীবন। পড়িয়েছি হাজার-হাজার, লক্ষ-লক্ষ, কোটি-কোটি বাচ্চাকে। মানুষ করতে পারেনি একজনকেও! অমানুষ তৈরি হয়েছে সব, অমানুষ! দেখছো না চারিদিকে কেমন অরাজকতা। এ ওকে মারছে, কামড়া কামড়ি করছে! হিংসায়, লালসার পরিপূর্ণ সব! বড়লোক হওয়ার লড়াইয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে লাটা লাঠি! মানুষে মানুষে লড়াই, হাতাহাতি, খুনোখুনি, জঘন্য সব কর্মকাণ্ড। হিংস্র জন্তুরাও নিজের স্বজাতিকে আঘাত করে না কখনো, আর দেখো মানুষের মতো উন্নততর জীব হয়ে এদের আচার-আচরণ! শিক্ষার অধঃপতন হয়েছে! অধঃপতন! আর নিতে পারছি না। ফিরে যাও তুমি। ফিরে যাও... তোমার শিক্ষা কেউ কিনবে না"....


অগত্যা শিক্ষার ফেরিওয়ালা তার ঝুলি কাঁধে নিয়ে এগিয়ে চলল শিক্ষা বিক্রির আশায়। হঠাৎ করে মাঠে একজন কৃষককে দেখতে পেয়ে বলল - "শিক্ষা নেবে গো চাষী ভাই? শিক্ষা নেবে? সামাজিক শিক্ষা, রাজনৈতিক শিক্ষা, কূটনৈতিক শিক্ষা, আরো অনেক নানান রকমের শিক্ষা"। 

চাষি বলল -"আমি? আমি মুখ্যু সুখ্যু মানুষ। অত শিক্ষা নে আমি কি করব বাপু! নিজের হাতে ফসল ফলাই তবুও নিজে পেটপুরে খেতে পারিনে গো। তোমার ওই শিক্ষা তাদের কাছে বিক্রি করো গে যাও যারা আমার থেকে কম দামে শাক সব্জি কিনে কত রকমের ওষুধ মাখিয়ে বাজারে চড়া দামে বিক্রি করে। আর মানুষদের জীবন নে খেলা করে"।


হার মানার পাত্র নয় শিক্ষার ফেরিওয়ালা। ধনী-গরিব, উঁচু জাত-নিচু জাত, সৎ-অসৎ, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, নানান লোকালয়, সমস্ত জায়গা চষে বেড়ালো তবুও কেউ শিক্ষা কিলো না। 


সন্ধ্যে হয় হয় মাঠ থেকে হেঁটে চলেছে সে। হঠাৎই নজর গেল একটা বস্তার দিকে। ভাবল খুলে দেখি শিক্ষা হবে বোধহয় কেউ ভুল করে ফেলে গেছে। খুলতেই দেখতে পেল এক রক্তাক্ত ছিন্ন ভিন্ন নারী দেহ তার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে আর বলছে শিক্ষা বিক্রি করছো বুঝি, শিক্ষা! তোমার শিক্ষা সেই সব মানুষদের দাও যারা এখনো পর্যন্ত মানুষ হয়ে উঠতে পারেনি! শিখতে পারেনি প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা-স্নেহ-মমতা, একে অপরের সহায়তা, সৌহার্য বোধ। যাদের মধ্যে বাস করে হিংস্রতা-লোভ-ক্রোধ-মোহ। যাদের মধ্যে নেই কোনো দয়া-মায়া, আছে কেবল তিক্ততা-স্বার্থপরতা। যাও এখান থেকে... যাও গিয়ে শেখাও তাদের...

 


রাগে-দুঃখে-অভিমানে-কষ্টে চোখে জল ফেরিওয়ালার। 

কোনো রকমে চোখের জলটা মুছে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের মতো ধেয়ে চলল সে সেই সব মানুষদেরকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য। তাদের মধ্যে পৌঁছাতেই একে একে সমস্ত মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ল শিক্ষার উপর। আঘাত করতে লাগলো শিক্ষাকে। একজন তো শিক্ষার গলা চেপে ধরে বলল জ্ঞান দিতে এসেছিস জ্ঞান। দেওয়াচ্ছি তোকে জ্ঞান । আর একজন তো দৌড়ে এসে তার মাথায় করলো সজোরে আঘাত । মরণাপন্ন অবস্থা হল ফেরিওয়ালার। রুদ্ধ কন্ঠে বলতে লাগলো - "আজ তোদের শিক্ষার দরকার নেই। আগামীতে হবে। যখন বড় হওয়ার নেশায় একে অন্যকে মেরে ফেলবি ধ্বংস হবে সমগ্র মানবজাতি, নশ্বর কঙ্কালে পরিণত হবে সমগ্র প্রাণীজগৎ, ধ্বংস হবে এই বিশ্ব তখন ফিরব আমি আমার শিক্ষার ঝুলি নিয়ে। বাতাসকে মৃদুমন্দ গতিতে বইতে শেখাবো। নদী বয়ে চলবে শান্ত শীতল হয়ে তার দুই তীরে ফেলবে নির্ভেজাল সোনার ফসল। জলচ্ছাস থামিয়ে দূষণ হীন সাগরের মাঝখান থেকে উদিত হবে নতুন ভোরের নতুন সূর্য। অনুকূল পরিবেশে বীজ অঙ্কুরিত হয়ে পরিণত হবে বড় বৃক্ষে। সমগ্র মানব সভ্যতা হবে মায়ের কোলে হাস্যরত শিশুর মত হিংসা হীন,দ্বেশহীন, স্বার্থপরতাহীন। যার কোমল হাস্যে ধরণী মায়ের কোল আনন্দে ভরে উঠবে। তখনই সবাই বুঝবে শিক্ষার আক্ষরিক অর্থ। ফিরবো আমি কোনো একদিন, কোনো এক সময়।

অপেক্ষায় থেকো তোমরা...

অপেক্ষায় থেকো....

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।