মায়ের আঁচল - রূপবালা সিংহ রায় // Mayer Anchol by Rupbala Singha Roy // Pujor golpo // Durga Puja special story

 মায়ের আঁচল 

রূপবালা সিংহ রায় 


পুজো মানে আনন্দ, একরাশ ভালোলাগা আর মন উৎফুল্লে ভরে ওঠা। কিন্তু সেটা এখন আর হয়না দে বাড়িতে। আজ থেকে প্রায় বারো বছর আগে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা আজও তাদের মনকে বিষন্ন করে দিয়ে যায়। যদিও এত বছরে বাড়ির সবাই প্রায় ঘটনাটা ভুলে গেছে কিন্তু ভুলতে পারেনি একমাত্র বিমলা। আর ভুলবেই বা কি করে সে যে মা। আগে তার সংসারে ছিল স্বামী, দুই ছেলে মেয়ে আর শাশুড়ি। সময়ের হাতছানিতে শাশুড়ি মা এখন না ফেরার দেশে। আর মেয়ে, তার যে কি অবস্থা তা সে নিজেও জানে না। ছেলের বিয়ে দিয়েছে। এখন সংসারের প্রায় পুরো হাল বৌমার হাতে। দুই নাতি নাতনি আছে। তাদের নিয়েই বেশ সময় কেটে যায় তার। তবুও পুজো এলে কেন যে তার মনটা বিষাদে ভরে ওঠে সে তা নিজেও বুঝে উঠতে পারে না। তখন আর কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করে না তার। খাবার গলা দিয়ে নামতে চায় না। শুধু ঘরের কোণে বসে থাকে সে অবিরাম অশ্রু ধারা নিয়ে। প্রথম প্রথম সবাই সান্তনা দিলেও এখন আর কেউ সেসবের ধার ধারে না।স্বামীটা আসে মাঝেসাঝে আর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে চলে যায় নিজের কাজে। এই জন্য বোধহয় সবাই বলে সুখের সাথী সবাই হয় কিন্তু দুঃখের সাথী সবাই হতে পারে না, এর থেকে বলা ভালো হতে চায় না।


 আজ সেই অভিশপ্ত সপ্তমী। আজকের দিনেই হারিয়ে গিয়েছিল মেয়েটা। কি করে যে হারালো তা সে নিজেই জানে না। মেয়ে বলেছিল মা ঠাকুর দেখতে যাব বন্ধুদের সঙ্গে। দাওনা যেতে... মেয়ে তখন ইলেভেনে পড়ে। একা একা স্কুলে যায় টিউশনি যায় কি আর হবে? তাছাড়া বন্ধুরা সবাই মিলে তো যাচ্ছে। আর বলল এই বিকেলে বের হব চারটে নাগাদ আটটা নটার মধ্যে ফিরে আসবো। বেশি দূরে যাব না কাছাকাছি ঠাকুর গুলো দেখবো। তারপর খাওয়া দাওয়া করব আর চলে আসব। তুমি আমায় পাঁচশোটা টাকা দাও ব্যাস, তাতেই হয়ে যাবে। টাকাটা দিয়েওছিল সে তার স্বামীকে লুকিয়ে। কারণ সে যেতে দিতে চাইছিল না মেয়েকে। কিন্তু মেয়ের করুন আবদারে গলে গিয়ে স্বামীর থেকে যেতে দেওয়ার পারমিশনটা আদায় করে নেয় সে। তারপর মেয়ে বেরিয়ে পড়ে আর ফিরে আসেনি। পরে তার এক বন্ধুর সাথে যোগাযোগ করে তারা জানতে পারে যে সে একটা ছেলের সাথে গিয়েছিল ঠাকুর দেখতে। ছেলেটা কোথায় থাকে তা সে জানে না। একবার তাকে দেখেছিল স্কুল গেটের সামনে। পরে মেঘনাকে জিজ্ঞাসা করলে সে নাকি জানায় যে ছেলেটা তার বয়ফ্রেন্ড। এর বেশি কিছু সে আর বলতে পারেনি। এখন বিমলা মেঘনার ছবিটা নিয়ে ভাবতে থাকে হাজারো কথা। সেদিন যদি না যেতে দিতাম তাহলে তুই থাকতিস আমার কাছে। ভুলটা আমারই। আমিই দোষী। জানি না তুই আদৌ বেঁচে আছিস কিনা! যেখানে থাকিস ভালো থাকিস মা, ভালো থাকিস। 


মেঘনা এখন মোহিনী এখন সে মিনি মাসির ডান হাত। নতুন নতুন মেয়েরা যখন আসে তাদের ধান্দায় নামানোর প্রশিক্ষণ সে-ই দেয়। কিন্তু তাদের মধ্যে যে খুব কান্নাকাটি করে, বাড়ি যেতে চায় তাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। তাকে যখন খুঁজে না পেয়ে সবাই হতাশায় ভোগে তখন মোহিনী গিয়ে দাঁড়ায় আয়নার সামনে -- যেন সে দেখতে পায় এই অন্ধকার গলি দিয়ে ছোট্ট মেঘনা ছুটে পালাচ্ছে আলোর জগতে। তার পুরনো জীবনে, মায়ের কাছে, বাবার কাছে, দাদার কাছে। কিন্তু বাস্তবে তা আর যাওয়া হয়ে ওঠে না। শুধু এইটুকু ভেবে ভালো লাগে যে তার বদলে একজন তো পালিয়ে বাঁচলো। কিন্তু এখান থেকে পালানো যতটা কঠিন ঠিক ততটাই কঠিন আলোর জগতে প্রবেশ করা। তাইতো, সেবার যখন একটা মেয়েকে সে হাত ধরে আলোর জগতে দিয়ে এসে দাঁড়িয়ে ছিল আয়নার সামনে ঠিক তখনই তার মাঝে সে দেখতে পায় তাকে। 'ফিরলি কেন আবার'-- জিজ্ঞাসা করায় সে জানায়, তার পরিবার নাকি আর তাকে ঘরে রাখতে পারবে না। তাহলে নাকি তারা আর সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না। এমনকি তার মাও নাকি ছল ছল চোখ নিয়ে তাকে চলে যেতে বলেছে। কোথায় যাবে সে তা ভেবে না পেয়ে আবার এখানে এসেছে। মোহনীও যে চায় দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরতে কিন্তু ভয় হয় পাছে মা যদি দূরে ঠেলে দেয়! সে যন্ত্রণা সে কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না। কিছু না শুধু একটু দেখা করেই চলে আসবে, সে সাহসটুকুও হয় না তার। ভয় হয় মা যদি দেখা করতে না চায়! মাকে জড়িয়ে ধরতে গেলে সে যদি দূরে সরে যায়! তখন! তখন কি হবে? এর থেকে ভালো, দূর থেকে তার স্পর্শ অনুভব করা।


আজ সেই সপ্তমী। আজকের দিনটাতে কোনো কাজ করতে ইচ্ছা করে না তার। নিজের ঘরেই পড়ে থাকে সে। আর একটার পর একটা চিঠি লিখে যায় সে তার মাকে। কিন্তু মাকে আর তা পাঠানো হয় না। কোনোটা অর্ধেক লেখার পর চোখটা এতটাই ঝাপসা হয়ে যায় যে শেষে রেগে মেগে ছিঁড়ে ফেলে। কোনো খানাও বা যদি বহু কষ্টে ভেবেচিন্তে লেখা হয় কিন্তু তা আর ডাকবাক্সে পাঠানো হয় না। যত্ন করে তুলে রাখতে রাখতে ভাবতে থাকে -- মাগো এ জন্মে বোধহয় আর আমাদের দেখা হবে না তবে তুমি চিন্তা করো না পরজন্মে দেখো আমি ঠিক আবার তোমার মেয়ে হয়ে জন্মাবো। আর ছাড়বো না তোমার আঁচল.....


মন ভালো করা নতুন বাংলা গল্প // মন ভালো করা গল্প // বাংলা গল্প // mon valo kora bangla golpo // romantic bangla golpo // new bengali story // মন ভালো করা সেরা বাংলা গল্প // new bengali stories// সেরা গল্প // popular bengali story // bengali story and poetry 



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।