চলো পাল্টাই - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // নতুন বাংলা গল্প // পুজোর গল্প।


চলো পাল্টাই 

রূপবালা সিংহ রায় 

 --কিরে চল তৈরি হয়ে নে তাড়াতাড়ি। বের হব, দেরি হয়ে যাচ্ছে তো! কি হলো কি? ওঠ! বন্ধ কর এবার টিভিটা। আমি কিন্তু রেডি, পাপাও প্রায় তৈরি। আর তুই এখনো বসে বসে টিভি দেখছিস! ওঠ হল টা কি বলতো তোর? যাবি না ঠাকুর দেখতে? 


এতক্ষণে বেশ ঝাঁঝালো স্বরে উত্তর দিল জিষ্ণু তার মাকে -- না, যাব না তোমরা যাও...


-- আশ্চর্য! কি হলো টা কি তোর? ওঠ বলছি বলে টিভির রিমোটা নিয়ে তার মা কামিনী টিভি টা বন্ধ করতে গেলে রীতিমতো চিলের মতো দৌড়ে গিয়ে টিভি রিমোটটা ছিনিয়ে নেয় সে মায়ের হাত থেকে। তা দেখে তার বাবা এসে বলে -- কি হলো রে বাবু, যাবি না ঠাকুর দেখতে?


 এবার একটু নরম হলো জিষ্ণু। ছল ছল চোখ নিয়ে নরম স্বরে সে বলল -- না যাব না আমি ঠাকুর দেখতে। আমি তো বলেছিলাম এবার পূজোতে আমার স্মার্ট ওয়াচ চাই। তুমিও চেয়েছিলে দিতে কিন্তু মাম্মাম দিতে দিল না! বলল -- বার্থ ডেতে যে ঘড়িটা পেয়েছিস সেটা পরিস। আচ্ছা পাপা তুমি বলো না মা জানে স্মার্টওয়াচের কত ফিচারস আছে? তুমি জানো আমার ফ্রেন্ড রাতুলের আছে স্মার্টওয়াচ। ওখান থেকে কল রিসিভ করা যায় ভিডিও গেম খেলা যায় আরো অনেক কিছু করা যায়। দেবায়ন আর আরিয়ানও কিনবে বলেছে। আমি তো ওদের বললাম আমিও পুজোতে কিনব। কিন্তু মা কিনে দিল না। এবার ছুটির পর যখন স্কুল খুলবে ওরা আমার ঘড়ি দেখতে চাইবে তখন কি হবে? আমার প্রেস্টিজ থাকবে?


 তা শুনে তার বাবা আচ্ছা কিনে দেবো কথাটা বলতে গিয়েও বলতে পারলো না তার মায়ের দিকে তাকিয়ে। তারপর কামিনীর কাছে গিয়ে মৃদুস্বরে বললো -- কি হবে বলতো একটা ঘড়ি কিনে দিলে? বাচ্চাটা খুশি হবে। আমরা এত কিছু কার জন্য করছি বলতো? সব তো ওরই জন্য। তাই না!


 ঠিক আছে তাই হবে আমি দেখছি বলে কামিনী জিষ্ণু কে বলে ঠিক আছে দেবো ঘড়িটা কিনে তার আগে চল ঠাকুর দেখে আসি তারপর ফেরার পথে ঘড়ি কিনে ফিরব।


-- মা ....


-- অত ভাবিস না আজ পঞ্চমী ঘড়ির দোকান খোলাই থাকবে। তাছাড়া ওগুলো পুজোতেও খোলা থাকে বলে আমার মনে হয়। চল তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে 


ঘড়িতে সময় সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা। ইতিমধ্যে তাদের তিনটে ঠাকুর দেখা হয়ে গেছে। আর ঠাকুর দেখতে ইচ্ছা করছে না জিষ্ণুর। শুধু মনে হচ্ছে কখন যাব আর কখন কিনবো ঘড়িটা। এদিকে মাকেও বলা যাচ্ছে না তা। মা একটার পর একটা ঠাকুর দেখতে চাইছে আর বাবাও তার নির্দেশ মত চলছে।


 অবশেষে তারা গিয়ে দাঁড়ালো রাস্তার পাশে থাকা একটা আইসক্রিমওয়ালার কাছে। আইসক্রিমও খেতে ইচ্ছা করছে না তার। তারপরও নিতে হলো আইসক্রিম। আইসক্রিমটা খুলে খেতে যাবে এমন সময় দেখল তারই বয়সী দুটো ছেলেমেয়ে এসে মায়ের কাছে আইসক্রিম চাইছে। তারা পরে আছে নোংরা পুরনো জামাকাপড়। ছেলেটার পরনের গেঞ্জিটা শুধু পুরনোই নয় ছেঁড়াও। মা তাদেরকে আইসক্রিম কিনে দিয়েছে ,আইসক্রিম পেয়ে তারা খুশি হয়ে চলে গেল। 


জিষ্ণুরা উঠে পড়ল গাড়িতে ঘড়ির দোকানে যাওয়ার জন্য। গাড়িতে যেতে যেতে বছর এগারোর জিষ্ণু তার মাকে জিজ্ঞাসা করল -- মাম্মাম ওরা পুজোতে নতুন জামা পরেনি কেন? আর সবার কাছ থেকে খাবার আর টাকা চেয়ে বেড়াচ্ছে কেন?


 একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কামিনী বলল -- ওরা যে গরীব। ওদের খাবারটুকুই জোটে না তো নতুন জামা কাপড় ! আর যাদের আছে তাদের বাচ্চাদের চাহিদার কোনো শেষ থাকেনা। তার মা যে তাকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলল তা বোঝার মত বয়স না হলেও মা যে কথাটা তাকেই বলেছে এটুকু বুঝতে পেরেছে সে। তবুও মায়ের কথাটা শুনে খারাপ লাগছে না তার, খারাপ লাগছে ছেলেটার ছেঁড়া ফাটা গেঞ্জিটার কথা মনে করে। তাই সে তার মাকে বলল -- আচ্ছা মামা যাদের আছে তারা কি তাদের থেকে একটা করে জামা ওদেরকে দিতে পারেনা?


 ছেলের কথা শুনে তার বাবা বলল -- কতজনকে দিবি তুই? আর কতজনেরই বা দেওয়ার মন আছে?


-- কার আছে কার নেই সেসব না ভেবে এক দুজনকে তো আমরা দিতে পারি। হয়তো সবাইকে আমরা দিতে পারব না কিন্তু যে একজনকে দেবো সে তো খুশি হবে। আর বঞ্চিতদের লিস্ট থেকে একজনের নাম তো বাদ যাবে। -- মায়ের কথা শুনে বিষ্ণু বলল ঠিক বলেছ মাম্মাম। এবার থেকে আমি পাঁচটাই জামাপ্যান্ট কিনবো আর তার থেকে একটা ওদের মতো কাউকে দিয়ে দেব ।


-- আর যে পাঁচটা কেনা হয়ে গেছে তার কি হবে?


-- তাই তো, ঠিক আছে চলো তাহলে বাড়ি থেকে একটা নিয়ে এসে ছেলেটাকে দিই। 


-- তাহলে ঘড়ি কেনার কি হবে?


-- ও আমি পরে কিনে নেব। পাপা তুমি এখন বাড়ি চলো। 


জিষ্ণুর কথামতো তারা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।