হ্যাপি রাখি - রূপবালা সিংহ রায় // রাখির গল্প // রাখির ইতিহাস।
হ্যাপি রাখি
রূপবালা সিংহ রায়
আজ বাদে কাল রাখি। নিপা আর গুড্ডু স্কুল থেকে ফিরেই তৃণার সাথে গেল রাখি কিনতে। নিপা গুড্ডুর জন্য সুন্দর দেখে একটা রাখি কিনলো। বাড়ি ফিরে নিপা তৃনাকে বলল -- মা তুমি কিন্তু কাল বলছিলে রাখী নিয়ে গল্প বলবে। আগে গল্প বলো তা না হলে কিন্তু ঘুমাবো না। মুচকি হেসে তৃণা রাখির গল্প শুরু করে -- আচ্ছা বলতো এটা কোন যুগ? গুড্ডু স্কুলে পড়া বলার মতো হাত উঁচু করে বলল -- কলি যুগ। একদম ঠিক বলেছ। এই কলি যুগের আগে ছিল দ্বাপর যুগ। সেই সময় একদিন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের হাত কেটে গিয়েছিল তখন দ্রৌপদী এসে শ্রীকৃষ্ণের হাতে নিজের শাড়ির আঁচল কেটে বেঁধে দিয়েছিলেন। তারপর যখন গৌরবরা দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করছিল তখন শ্রীকৃষ্ণ দ্রৌপদীর সম্মান রক্ষা করেছিলেন। তাহলে বুঝেছিস রাখি উৎসব কতদিন আগের থেকে পালন করা হচ্ছে। নিপা আর গুড্ডু ঘাড় নেড়ে সায় দিল। তৃণা বলে চলল
-- শুধু এটা নয় আরো একটা গল্প শুনবি?
শুনবো শুনবো বলে চেঁচিয়ে ওঠে গুড্ডু আর নিপা।
-- আচ্ছা বলছি বলছি আগে তো থাম।
চুপ হয়ে যায় দুজন। তা দেখে আবারও বলতে শুরু করে তৃণা --
অনেক যুগ আগে একজন রাজা ছিল তার নাম বলি। সে স্বর্গরাজ্য দখল করার জন্য যঞ্জ শুরু করে। তখন ভগবান বিষ্ণু বামন অবতার হয়ে তিন পদ জমি চেয়ে বসেন।
-- মা পদ মানে কি জিজ্ঞাসা করে গুড্ডু
-- পদ মানে হল পা । তো রাজা বলি দিতে রাজি হলেন । তখন ভগবান বিষ্ণু এক পায়ে স্বর্গরাজ্য আর এক পায়ে সমগ্র পৃথিবী দখল করে নেন। তারপর আরেক পদ জমির দাবী করেন। তখন নিরুপায় বলিরাজ তার মাথায় পা রাখতে বলেন তাঁকে। বিষ্ণু বলির মাথায় পা রাখলে বলি পাতাল বাসী হয়। ভগবান বিষ্ণু বলির প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে বর দিতে চাইলে বলি বিষ্ণুকে সবসময় তার কাছে থেকে যেতে বলেন। তখন বিষ্ণু বলি কক্ষের দ্বার রক্ষী হয়ে থেকে যান। এদিকে মা লক্ষ্মী বিষ্ণু কে বাঁচানোর জন্য নারদ মুনির পরামর্শ মত রাজা বলি কে রাখি পরিয়ে ভাই বানিয়ে ভগবান বিষ্ণুকে উদ্ধার করেন। আর জানো তো সেইদিন শ্রাবণ মাসের এক পূর্ণিমা তিথি ছিল আর সেই থেকেই শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে রাখি বন্ধন উৎসব চালু হয়।
গুড্ডু দিদিকে জড়িয়ে ধরে বলল -- মা আরো গল্প বলো না
-- আজ আর মনে হয় ঘুমানো হবে না বলে তৃণা বলতে শুরু করল, একবার ভগবান শ্রী গণেশের দুই পুত্র শুভ এবং লাভ বোনের কাছ থেকে রাখি পরার জন্য ভীষণ জেদ ধরেন। তাই দেখে গণেশ ঠাকুর তার দুই স্ত্রী রিদ্ধি এবং সিদ্ধির গর্ভ থেকে এক কন্যা সৃষ্টি করেন যিনি আমাদের কাছে সন্তোষী মাতার রূপে পরিচিত। তারপর সন্তোষী মাতা দুই দাদা শুভ আর লাভের হাতে রাখি বেঁধে দেন। এছাড়াও কথিত আছে যে একবার মা লক্ষ্মী বানর রাজা বালির পরীক্ষা নেওয়ার জন্য দরিদ্র নারীর রূপ ধারণ করে রাজার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। বানর রাজ বালি তাকে আশ্রয় দিলে মা লক্ষ্মী খুশি হয়ে বালির হাতে কাপড়ের টুকরো বেঁধে দেন। এ তো গেল অন্য যুগের গল্প। এবার ফিরে আসি ইতিহাসে। তখন আমাদের দেশ ভারতবর্ষ শাসন করছে ইংরেজরা। আর সমগ্র দেশবাসী স্বাধীনতার জন্য জাতীয়তাবাদী আন্দোলন করছে। তখন লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেন। তখন বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হিন্দু মুসলিমদের মধ্যে ভাতৃত্ববোধ জাগিয়ে তোলার জন্য একে অপরের হাতে রাখি পরিয়ে রাখি বন্ধন উৎসব পালন করেন।
ছোট্ট পুঁচকে দুটো মায়ের মুখে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ল। ছোট্ট বাচ্চা দুটোকে জড়িয়ে ধরে তৃণা ভেসে গেল তার ছোটবেলার স্মৃতিতে। তখন নিপারই মতো ছিল সে কিংবা তার থেকে একটু বড়ই হবে। রাখিতে কত না মজা করত! গুনে গুনে বারোটা রাখি কিন্তু সে। তার নিজের দাদা একটা হলেও পিসতুতো, মাসতুতো, খুড়তুতো দাদা মিলে মোট বারোটা ভাই ছিল তার। রাখিতে যেন বাড়িটা গমগম করত। আজ দেখো একজনও নেই! বাবার অমতে পাশের পাড়ার এক ছেলেকে বিয়ে করেছে সে। সেই থেকে আর ও বাড়ীর সঙ্গে সম্পর্ক নেই তার। দাদারও মত ছিল না তাই আর দাদাকে রাখি বাঁধা হয় না এই সাত বছর হল।
পরের দিন সকাল নিপা ভাইয়ের হাতে রাখি পরিয়ে দিল। তৃণা তার রাখিটা গণেশ ঠাকুরের হাতে পরাতে যাবে এমন সময় সে শুনতে পেল -- কিরে আমার রাখিটা তুই গণেশ ঠাকুরকে পরাচ্ছিস কেন? আমাকে পরাবি না ?
-- দাদা তু..তু..মি বলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে দৌড়ে গিয়ে দাদাকে জড়িয়ে ধরল তৃণা।
-- হ্যাঁ আমি। আর কি করবো বল কেউ যে আমায় কাল বিকেলবেলায় রাখি বন্ধনের গল্প শোনালো আর যেটা শুনে আমি না এসে থাকতে পারলাম না।
-- কে শুনিয়েছে তোমায় গল্প?
নিপা এসে বলল -- কেন তুমি? তুমি যখন গল্প করছিলে তখন আমি মামুকে তোমার ফোন থেকে ফোন করে বালিশের পাশে রেখে দিয়েছিলাম। বকবে না কিন্তু। বাবা বলেছিল রাখতে। তুমি প্রত্যেক বছর গণেশ ঠাকুরকে রাখি পরাও বাবার সেটা ভালো লাগে না তাই। মামু তুমি বাবাকে বকবে না তো ?
ধাড় নাড়িয়ে না বলে মুচকি হেসে নিপাকে কোলে তুলে নেয় তার মামা।
#হ্যাপি_রাখি
#রূপবালা_সিংহ_রায়...✍🏻
সকলকে জানাই শুভ রাখীর অনেক অনেক শুভেচ্ছা, শুভকামনা ও অভিনন্দন। ভালো থাকুন সবাই, সুস্থ থাকুন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন