সঠিক পথ - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // নতুন বাংলা গল্প।
সঠিক পথ
রূপবালা সিংহ রায়
ঘড়িতে রাত দুটো। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে ব্যাগটাতে কিছু টাকা পয়সা আর প্রয়োজনীয় কিছু জামা কাপড় গুছিয়ে নিয়ে ঘরের সদর দরজাটা খুলতেই তমসার মনে পড়ে গেল সেই দিনটার কথা। এমনই ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত ছিল সেদিন। খুব সন্তর্পনে আলমারিটা খুলে নিজের কিছু জামা কাপড় আর টিফিন খরচ থেকে বাঁচিয়ে রাখা জমানো কিছু টাকা নিয়ে চুপি চুপি দরজা খুলে পালাচ্ছিল সে। কিন্তু পারেনি। ব্যাগটা ঘাড়ে নিয়ে দরজাটা খুলে বাইরে পা বাড়ানোর আগেই একটা হাত এসে একটানে ঘরে ঢুকিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অন্য আরেকটা হাত তার গালে এসে মারে সটান এক চড়। খুব রাগ হয়েছিল তখন সেই মানুষটার উপর। খুব কান্নাও পাচ্ছিল এই ভেবে - ঋতম তো কথামতো এসে দাঁড়িয়ে থাকবে স্টেশনে। কাল যে আমাদের কালীঘাটে যাওয়ার কথা। সেখানে গিয়ে বিয়ে করবো আমরা। মা যে এইভাবে ধরে ফেলবে ভাবতেও পারেনি সে। অবশেষে কাঁদতে কাঁদতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে তা নিজেই জানতে পারেনি। ঘুম ভেঙেছিল পরদিন সকাল এগারোটা নাগাদ, তাও আবার সেই মায়ের ডাকে। খুব রাগ হয়েছিল তার। চেঁচিয়ে উঠেছিল সে তার মায়ের উপর - "কেন ডাকলে আমায়? কে বলেছে তোমায় ডাকতে? আমি চাইনা আর কোনদিন আমার ঘুম ভাঙুক? কি হবে এমন জীবন বেঁচে? যেন জেলখানায় আছি আমি! আমার কোনো চাওয়া পাওয়া নেই, কোনো মূল্যই নেই আমার। জন্ম দিয়েছে বলে যা খুশি তাই করবে"। আরো নানান উল্টোপাল্টা কথা বলেছিল সে। মা অপলক তাকিয়ে শুনেছিল তার কথাগুলো। একটাও কথা বলেননি। কিছুক্ষণ পর নীরবে সেখান থেকে চলে গেলেও তার চোখ দুটো সারাক্ষন পাহারা দিত তাকে। বড্ড অসহ্য লাগত তমসার।
দুদিন বাদে হঠাৎ করে মা তাকে টেনে নিয়ে বসালো তার সামনে তেলের বোতলটা নিয়ে। সেই ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত বরাবরই মা তার চুলে তেল লাগিয়ে দেয়। মাকে হাতে তেল ঢালতে দেখে তমসা বিরক্তির স্বরে বলল - ছাড়ো আমায়। আমার চুলে এক্কেবারে হাত দেবে না।
-- চুলগুলো উসকো খুসকো...
-- হোক ,তোমায় অত আমার চুলের যত্ন করতে হবে না।
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর মা বলল -- জানিস মানু তোর বিথী মাসির বর কল্যাণ গতকাল মারা গেছে। বিথী মাসি মায়ের দূর সম্পর্কে বোন হলেও তার সঙ্গে তমসাদের একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। আর কল্যাণ মেসোও বেশ হাসিখুশি মজার মানুষ। বয়সও তো তেমন বেশি কিছু নয়। মায়ের দিকে তাকিয়ে তামসা বুঝলো মা বেশ আপসেট। তারও বেশ কষ্ট হচ্ছে। তাই সে জিজ্ঞাসা করল -- "কি করে? মেসো তো সুস্থ সবল মানুষ! তার মা এখনো বেঁচে আছেন অথচ!"
-- জানিনা। বিথী বলল হঠাৎ করে বুকটা ব্যথা করছে বলায় ওরা হাসপাতালে নিয়ে যায় কিন্তু আর ফেরেনি।
এর মধ্যে বিথী মাসির ফোন। তার কথা শুনে তমসা বুঝলো মাসি বড় অসহায়। বাচ্চাটা ছোট বয়স বছর তিনেক হবে। মাসির কোনো উপার্জন নেই, এবার সংসার চলবে কি করে?
মাসির সঙ্গে কথা বলার পর মা তমসার চুলে তেল লাগাতে লাগাতে বললো -- "জানিস তো মানু আমাদের মেয়েদের ভীষণ রকম দরকার নিজের পায়ে দাঁড়ানো। কে বলতে পারে জীবন আমাদের কখন কোন রাস্তায় এনে দাঁড় করাবে? দেখিস না আমাদের কাজের দিদিটাকে তিনটে বাচ্চা, স্বামী ছেড়ে চলে গেছে। এমন কত শত কারণ আছে মেয়েদের স্বাবলম্বী হওয়ার। নিজের উপার্জন থাকলে নিজের একটা জোর থাকে। অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে বাঁচতে হয় না জীবনে। তাই বলি কি এসব করার বয়স এখনো পড়ে আছে এখন তো সবে ক্লাস টুয়েলভ। তুই শুধু মন দিয়ে পড়াশুনাটা কর। নিজেকে দাঁড় করা। যে সুযোগটা আমি পাইনি। সে সুযোগটা তোর আছে। সেটা কে তুই হেলায় হারাস না। সংসার বড় সমস্যার, আর এখনই সেই ফাঁদে পা দিস না। আমি বলছি না বিয়ে করিস না। কর কিন্তু আগে নিজের পায়ে দাঁড়া তারপর।
সেই যে মায়ের কথাগুলো মাথায় ঢুকে গেল তারপর আর অন্য কিছু তার মাথায় স্থান পায়নি। আজ তমসা একটা ব্যাংকের ম্যানেজার। কদিন বাদে তার বিয়ে তবে সেই ছেলেটার সঙ্গে নয়। সে তো সপ্তাহখানেক পর অন্য আর একটা গার্লফ্রেন্ড জুটিয়ে নিয়েছে। তার বিয়ে হচ্ছে অন্য একটা ছেলের সঙ্গে। সেও তার সঙ্গে একই ব্যাংকে কাজ করে। কিন্তু হঠাৎ করে মায়ের শরীরটা খারাপ করায় তাকে নিয়ে এই মাঝ রাতে যেতে হচ্ছে হাসপাতালে। গেটের কাছে অ্যাম্বুলেন্স এসে হাজির। অ্যাম্বুলেন্সে মায়ের সেই হাত দুটোকে শক্ত করে ধরে বসে আছে সে। যে হাত দুটো একদিন তাকে সঠিক পথে টেনে নিয়ে এসেছিল, সেই হাত দুটো যেটা আজও তাকে এক আলাদা পরশ দেয়...
#সঠিক_পথ
#রূপবালা_সিংহ_রায়...🖋️
@সাঁঝবাতির রূপকথায় - Rupbala Singha Roy
#bengali_story_and_poetry
#banglagolpo #bengalistory #golpo
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন