বাঁচার মতো বাঁচা - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // নতুন বাংলা গল্প।
বাঁচার মতো বাঁচা
রূপবালা সিংহ রায়
মন ভালো করা নতুন বাংলা গল্প ,মন ভালো করা গল্প ,বাংলা গল্প ,mon valo kora bangla golpo ,romantic bangla golpo ,new bengali story ,মন ভালো করা সেরা বাংলা গল্প ,new bengali stories,সেরা গল্প ,popular bangla story ,bengali story and poetry
-- "ম্যাম গতকাল এক্সিবিশনে আপনার যে ছবিটা প্রথম হয়েছে সেটা অনেকেই কিনতে চাইছে। আপনি কি ছবিটা বিক্রি করবেন"?
শুভঙ্কর নামক সহকারী ছেলেটির মুখে কথাটা শুনে চলে যেতে যেতে একটু থমকে দাঁড়ালো সোমা। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলল - "কিন্তু, আমি তো ওটা আমার কাছে রাখবো বলে ভাবছি। আচ্ছা দাঁড়াও, আমায় একটু ভাবতে দাও। আর শোনো কে কত দিতে চাইছে সবার থেকে জেনে রাখো। ভালো দাম পেলে বেকার বেকার নিজের কাছে কেনই বা রাখবো। তাছাড়া এই মুহূর্তে টাকার দরকার আছে। মাস খানেকের মধ্যে ট্রেনিং সেন্টার টা খুলতে চাই। ও ভালো কথা ড্রইং ক্লাসের ব্যানার আর হ্যান্ডবিল গুলো কি হলো"?
-- "চিন্তা করবেন না ম্যাম, ব্যানারগুলো আপনার কথা মতো নির্দিষ্ট স্থানে স্থানে টাঙানো হয়ে গেছে। আর হ্যান্ডবিল কিছুটা বিতরণ করা হয়েছে আর কিছুটা বাকি।
-- "ঠিক আছে "বলে নিজের ঘরের দিকে দু পা বাড়িয়ে পেছন ঘুরে শুভঙ্কর কে উদ্দেশ্য করে সোমা বললো -" এ ভাই শোনো না বলছি ছবিটা একটু আমার ঘরে দিয়ে যাও তো"।
শুভঙ্কর ছবিটা নিয়ে রেখে গেল সোমার ঘরে। ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানার ওপর রাখা ছবিটার দিকে নজর পড়তে আস্তে করে গিয়ে বসল সে বিছানায়। তারপর হাত বোলাতে লাগলো ছবিটার গায়ে। এই ছবিটা যে আর কিছুই নয় তার জীবনের ছবি। চৌকো ফ্রেমে আঁকা একটা আকাশ। যার এক পাশে রয়েছে রঙিন ফুলের বাহার আর ঝলমলে রোদ্দুর। দুটো পাখি প্রেমালাপ করতে করতে উড়ে যাচ্ছে নিজেদের বাসার দিকে। তার ঠিক কিছুটা দূরে চারটে ঘন কালো কুচকুচে মেঘ ঢেকে ধরেছে তাকে। ছিন্নভিন্ন অবস্থা তার। তার কিছুটা পর আকাশটা ঢলে পড়েছে রাতের আঁধারের কোলে। উড়ে বেড়াচ্ছে অশুভ শক্তিগুলো। আকাশের প্রাণ যায় যায় অবস্থা। তবুও আকাশ লড়াই করছে নতুন সূর্য দেখার জন্য। অবশেষে এক রাঙা সূর্য উঁকি মারেছে তার মাঝে। আবারও আলোর দিশা খুঁজে পেয়ে আকাশটা নতুন করে নিজেকে সাজিয়ে গুছিয়ে সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছে এভাবেও জেতা যায়। এভাবেও বাঁচা যায়। এক্সিবিশনে আসা সব ছবিগুলোকে হারিয়ে দিয়ে এই ছবিটা প্রথম হয়েছে। তাই নিজেকে নিয়ে আজ একটু অহংকার হচ্ছে সোমার। তবুও জীবনে এমন কিছু স্মৃতি থেকে যায় যেগুলো একেবারে ভুলে যাওয়া বড়ই দুষ্কর হয়ে পড়ে। অমন খারাপ বেদনাদায়ক ভয়ংকর স্মৃতি যেন কোনো মেয়ের জীবনে না আসে তার জন্য নারী সুরক্ষার্থে সে খুলতে চায় একটা ট্রেনিং সেন্টার। যেখানে মেয়েরা শিখবে নানান রকম কলা কৌশল নিজেদের আত্মরক্ষার্থে, খারাপ পরিস্থিতিতে নিজেকে শক্তিশালী ও সাহসী রাখতে, মানুষ রূপী বন্য জন্তুদের খপ্পর থেকে নিজেকে বাঁচাতে।
মনে পড়ে সেদিনের কথাখানা। শপিং শেষে ডিনার করতে করতে বেশ খানিকটা রাত হয়ে গিয়েছিল তাদের। বিজিত বারবার করে বলেছিল আমি যাই সঙ্গে বাড়ি পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে আসি। না করেছিল সোমা। বলেছিল - "সপ্তাহখানেক পর বিয়ে ভুলে যেওনা কথা খানা। এত রাতে তুমি যাবে মা বাবা ছাড়বে তোমায়? তুমি থাকবে তারপর পাশের বাড়ির কাকিমাটা যা না তাই কথা বলবে! বাড়ি বয়ে এসে মাকে দুটো কথা শুনে যাবে। কি দরকার বলো তো? আর তাছাড়া আমি একা একাই চলে যেতে পারবো। কি এমন রাত হয়েছে, সবে দশটা বাজে। বাসে লাগবে ১৫ মিনিট মতো। তারপর নেমে মিনিট পাঁচেক হাঁটলেই বাড়ি। অতো চিন্তা করো না আমি ঠিক পৌঁছে যাব।
বাস থেকে নামতেই এলো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। ছাতাটাও নেওয়া হয়নি। বিয়ের শাড়ি কাপড় গুলো ভিজে যাচ্ছে তাই বেশ কিছুটা যাওয়ার পর একটা নির্মীয়মান বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে গেল সে। তার দাঁড়ানোটাই যে কাল হবে বুঝতেই পারিনি সে। তিন চারটে দস্যু মিলে চালালো নির্মম অত্যাচার। ভোররাতে কোনো রকমে তাদের থেকে ছাড়া পেয়ে বিধ্বস্ত অবস্থায় ফিরেছিল বাড়িতে। মা বাবা বলতে মানা করেছিল বিজিতকে এসব। কিন্তু সোমা তা পারেনি। বলেছিল বিজিতকে। কিন্তু হায়! যে বিয়ের শাড়িটা বাঁচানোর জন্য সে আশ্রয় নিয়েছিল সেই বিয়েটাই ভেস্তে গেল। বিজিত দূরে সরে গেল। একে একে কথা খানা পাঁচ কান হলো। পাঁচটা লোকে পাঁচ রকম কথা বলতে লাগলো। সবথেকে বড় দুর্বিষহ হয়ে উঠল সে নিজে, নিজেকে নিয়ে, নিজের জীবন খানা নিয়ে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখলে ঘেন্নায় গা টা গুলিয়ে উঠত তার। নিজেকে অসুচী মনে হতো সব সময়। মাঝে মাঝে মনে হতো এমন জীবন থাকার চেয়ে না থাকাই বোধহয় ভালো ছিল। একদিন কাঁদতে কাঁদতে মুখ ফসকে সেকথা মাকে বলে ফেললে ঠাস ঠাস করে মা দুগালে দুটো চড় লাগিয়ে বলে -"স্বার্থপর কোথাকার"!
ছল ছল চোখে সোমা বলেছিল -"মা"
-- "স্বার্থপর বলবো না তো কি বলবো তোকে বল? তুই শুধু নিজের স্বার্থটাই দেখলি আমাদের কথাটা ভাবলিনা একবারও? তুই ছাড়া কে আছে বল আমাদের জীবনে? তুই ছাড়া আমরা বাঁচব কি নিয়ে বল? মানছি কষ্টটা তোর বেশি। কিন্তু আমাদেরও তো কিছু কম নয় রে মা। মানুষের জীবনে কত কি তো ঘটে, তাই বলে কি তারা পালিয়ে গিয়ে বাঁচে? আর তাছাড়া তুই তো অন্যায় কিছু করিসনি অন্যায় যদি কেউ করে থাকে তো করেছে তারা। মরতে যদি হয় কারোর তো তারা মরবে। নিজেকে শক্ত কর। নিজেকে এতটাই যোগ্য তৈরি কর যে যারা তোকে নিয়ে আজ নানান কথা বলছে তাদের মুখ যেন বন্ধ হয়ে যায় একদিন।এসব যেন তলিয়ে যায় তোর সাফল্যের নীচে। নিজেকে ফেলনা ভাবিস না রে মা। তুই কথা দে ওইসব উল্টোপাল্টা চিন্তাভাবনা জীবনেও আনবি না মাথায়। কথা দে ...
সেদিন মাকে ছুঁয়ে কথাখানা দিয়েছিল সোমা। আর দিয়েছিল বলেই না আজ মাথা উঁচু করে বেড়াচ্ছে সে। আজকাল লোকজন তাকে এক ডাকে চেনে। নামকরা শিল্পী যে আজ। যার রং তুলির ছোঁয়ায় সাদা কাগজের টুকরোটা প্রাণ ফিরে পায়। মাঝেমধ্যে তার ডাকও আসে বিভিন্ন ছোট বড় আর্ট স্কুলগুলো উদ্বোধনের জন্য। তাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয় অনেক হেরে যাওয়া মেয়েরা। তারাও চালিয়ে যায় বাঁচার লড়াইটা। জীবনে এর থেকে বড় পাওনা আর কি হতে পারে তার মতো একটা সাধারণ মেয়ের কাছে।
#বাঁচা_মতো_বাঁচা
#রূপবালা_সিংহ_রায় ...✍🏻
#banglagolpokobita #bengalipoetryandstory #banglagolpo #bengalistory #golpo #storytelling #story
সাঁঝবাতির রূপকথায় - Rupbala Singha Roy
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন