জন্মদিন - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // নতুন বাংলা গল্প।
জন্মদিন
রূপবালা সিংহ রায়
Jonmodin by Rupbala Singha Roy // মন ভালো করা নতুন বাংলা গল্প // মন ভালো করা গল্প // বাংলা গল্প // mon valo kora bangla golpo // romantic bangla golpo // new bengali story // মন ভালো করা সেরা বাংলা গল্প // new bengali stories// সেরা গল্প // popular bengali story // bengali story and poetry
"আজকের মধ্যে সারপ্রাইজ গিফ্টটা নিতে না পারলে আর সময় পাওয়া যাবে না" ভাবতে ভাবতে মেয়েকে স্কুলে ছেড়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটল গৌরী, ঝাঁ চকচকে শপিংমলে। যদিও বড় একটা ওপথ পথ মাড়ায় না সে। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা মানুষ তো অযথা দাম দিয়ে জিনিসপত্র কিনে পোষায় না তার। তবে যাওয়া যে এক্কেবারে হয়না তাও নয়, মাঝেমধ্যে ঢু মারে সেখানেও। খুব রাগ হচ্ছে তার প্রীতমের উপর। ও তো ফর্দ আর টাকা দিয়ে খালাস। এখন সবকিছু ধরে ধরে করতে হবে তাকে। সেও বা কি করবে? তারও তো অফিস আছে। তাই অগত্যা যেতে হচ্ছে তাকে।
আজ বাদে কাল মেয়ের জন্মদিন। স্কুলে হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষা চালায় এবছর বার্থডে পার্টি দিতে চাইছিল না তারা। কিন্তু মেয়ের মন খারাপ দেখে ঠিক করল আগামী রবিবার বন্ধুদেরকে ডেকে পার্টি দেওয়া হবে। আর আগামীকাল পুরো ক্লাসকে একটা করে গিফট আর ট্রফি দেওয়া হবে। তাই শুনে মেয়ের আনন্দ আর ধরে না। ওরই জন্য তো সব, না হয় কটা টাকা খরচ হবে। এতে যদি ও খুশি হয় হোক না, ক্ষতি কি!
সেই মত চলল গৌরী। সারপ্রাইজ গিফ্টটার সঙ্গে সঙ্গে নিতে হবে পুরো ক্লাসের জন্য চকলেট আর তার সঙ্গে ছোট কোনো একটা খেলনা বাজেট অনুযায়ী। কেনাকাটা প্রায় সব শেষ। এবার বাড়ি ফেরার পালা। বাড়ি ফিরে আবার মেয়ের জন্য নেওয়া এতো বড়ো টেডিটাকে কোথাও লুকিয়ে ফেলতে হবে, তা নাহলে সারপ্রাইজটা আর সারপ্রাইজ থাকবে না। সে আবার বাড়ি ফিরে এতো কিছু দেখে নিজের সারপ্রাইজ গিফ্টটা খুঁজতে লেগে যাবে। তাকে অমন খুঁজতে দেখে যা মজা হবে না! তারপর স্কুলের গিফ্টগুলোকে আলাদা আলাদা করে প্যাক করতে হবে। কাল আবার মেয়ের জন্য ভালো মন্দ কিছু রান্না করতে হবে। কেকটা না হয় রবিবার নেওয়া যাবে। কিন্তু পায়েসটা তো কাল বানাতেই হবে -- মনে মনে এমন সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে সে জিনিসগুলোকে কোনোরকমে বয়ে নিয়ে ফুটপথ ধরে চলল ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকে। এতগুলো জিনিস নিয়ে বাস বা অটোতে ওঠা মুশকিল। তারপর সেগুলো আবার বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া আরও দুঃসাধ্য কাজ। যেতে যেতে হঠাৎই চোখ গেল তারই মেয়ের বয়সী একটা বাচ্চা মেয়ের দিকে। যত্নের অভাবে লাল লাল চুলগুলো খোঁচা খোঁচা হয়ে গেছে। পরনে মলিন একটা ফ্রক। ফুটপাতের একপাশে একটা বস্তা বিছিয়ে বসে আছে সে। তার কোলে আবার রয়েছে মাস আটেকের ছোট্ট একটা বাচ্চা। চলার পথে তাদেরকে দেখে যদি কেউ কিছু দিয়ে যায় সেই আশাতেই বসে থাকা তার। করুণ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সে গৌরীর হাতে থাকা বড়ো টেডিটার দিকে। তাকে দেখে বড় মায়া হল গৌরীর। বেশ কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পরও পিছিয়ে এলো সে। মনে হল তাকে কিছু দিই। হাতে থাকা ব্যাগটা থেকে দুটো চকলেট ও ছোট ছোট সফ্টটয়গুলোর মধ্যে থেকে দুটো টেডি বার করে ধরিয়ে দিল বাচ্চা দুটোর হাতে। আনন্দে উচ্ছ্বাসিত মেয়েটা। বেশি আনন্দিত টয়টা নিয়ে। যারা দুবেলা দু মুঠো পেট ভরে খেতে পায় না তাদের কাছে খেলনার মত জিনিস কেনা বড় লোকি চাল ছাড়া যে আর কিছুই নয়। খুব কষ্ট হলো গৌরীর। মনে পড়ল নিজের ছোটবেলাকার কথা। পাশের বাড়ির প্রিয়াঙ্কা দিদির কত্ত রংবেরঙের পুতুল ছিল। মায়ের কাছে অমন পুতুল বায়না করলে মা বলতো -- চল আমি মাটি দিয়ে তোকে ওর থেকে সুন্দর সুন্দর পুতুল বানিয়ে দিই। সেগুলোকে মা শাড়িও পরিয়ে দিত। তবুও প্রিয়াংকা দিদির পুতুলগুলো বড্ড মনে ধরত তার। মাঝে মাঝে মন খারাপও হত। কথাগুলো মনে পড়ায় মনে হল - যাদের কাছে অনেক আছে তাদের দেওয়ার থেকে যাদের নেই তাদের দিলে কেমন হয়? কিন্তু মেয়ে কি মানবে? না মানারই বা কি আছে? বুঝিয়ে বললে নিশ্চয়ই বুঝবে।
স্কুল থেকে মেয়েকে বাড়ি আনার পর ভয়ে ভয়ে বলল কথা খানা সে তাকে। মেয়ের তো প্রথমে কত্ত রাগ, কত কথা-- "সবাই তাদের জন্মদিনে সারা ক্লাস ফ্রেন্ডদের গিফ্ট দেয়। আর তুমি আমায় না দিতে বলছ! সবাই কি বলবে মাম্মাম? তোমার প্ল্যান তোমার কাছেই রাখো। আমি ওগুলো কাল স্কুলেই নিয়ে যাব"। কোনো উপায় না দেখে গৌরী বলল আচ্ছা ঠিক আছে -- "এগুলো চলো ওদেরকে দিয়ে আসি আর পাপ্পাকে বলি স্কুলের জন্য আবারো কিনে আনতে"। শেষমেষ রাজি হয় মেয়ে। বেশ কিছুটা স্বস্তি পায় গৌরী।
কথামতো রাস্তার দুঃস্থ শিশুদের মধ্যে বিলিয়ে দিচ্ছে খেলনা আর চকলেট গুলো মেয়ে। তার চোখে মুখে যেন আলাদা এক চমক, আলাদা এক উল্লাস। এটাই তো চেয়েছিল গৌরী। ইতিমধ্যে প্রীতমও এসে গেছে। সেও দেখছে তার মেয়েকে।
অবশেষে তার উপহার গুলো দেওয়া শেষ হলো। ওদেরকে বিদায় জানিয়ে একগাল হাসি নিয়ে হাজির হলো সে গৌরী আর প্রীতমের কাছে। তাকে কোনো কথা না বলতে দেখে প্রীতম বলল -- "এবার চলো মাম্মাম যাই তোমার বন্ধুদের জন্য চকলেট কিনতে...."
মাথাটা হালকা ঝাঁকিয়ে সে বলল -- "না পাপ্পা কিনতে হবে না আর চকলেট। মাম্মাম ঠিক বলেছিল জানো, যাদের আছে তাদের দেওয়ার থেকে যাদের নেই তাদের দেওয়া অনেক ভালো। আর তাছাড়া জানো তো, আমার স্কুলের কজন বন্ধু তো খুব ঢং দেখায়। আমাদের থেকে একটু বড়লোক কিনা! নেওয়ার বেলা নেবে আবার পরে বলবে আমার বার্থডেতে আমি আরো দামী আর বড় টয় দিয়েছিলাম। কেউ কেউ আবার বললে এত ছোট টয়! আরো কত্ত কি? তার থেকে এদের দেখো এরা কত খুশি। এবার থেকে প্রত্যেক বছর জন্মদিনে আমি এদেরকেই গিফ্ট আর চকলেট দেব"।
"ঠিক আছে" -বলে গৌরী মেয়ের হাত ধরে প্রীতমের সঙ্গে রওনা দিল বাড়ির উদ্দেশ্যে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন