কালবৈশাখী - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // নতুন বাংলা গল্প // New Bengali Story ।
কালবৈশাখী
রূপবালা সিংহ রায়
কালবৈশাখী - রূপবালা সিংহ রায় // Kalboisakhi by Rupbala Singha Roy
শেষ রাতে কা কা শব্দে হঠাৎই ঘুমটা ভেঙে গেল কুমোদিনীর । এমনিতেই রাতে আজকাল আর ঘুম আসে না তার । শেষ রাতের দিকে একটু ঘুম আসে আবার ভোরবেলা ঘুম ভেঙে যায় । আগে যখন রাতের বেলা চোখ ঘুমে ঢুলুঢুলু করতো তখন জাগতে হতো ছেলে মেয়েদের জন্য । আবার সকাল সকাল উঠতে হতো ঘরের কাজকর্ম করার জন্য । তখন শুধু তার মনে হতো যদি একটু সময় পেতাম আর একটু ঘুমিয়ে নিতাম । আর এখন হাতে অফুরন্ত সময় থাকলেও ঘুমটাই যেন উধাও হয়ে গেছে তার । সবেমাত্র ঘুমটা এসেছে অমনি বৃষ্টির আওয়াজ ও তার সঙ্গে কাকেদের গলা ফাটা চিৎকারে তাও ভেঙে গেল । শুয়ে শুয়ে এপাশ ওপাশ করতে থাকলো সে । কিন্তু আর ঘুম আসছে না । কাকগুলো এখনো কা কা করেই চলেছে । উঠে পড়লো সে । ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার । তবুও আলো জ্বালালো না সে পাছে যদি তার স্বামী অমিতাভ বাবুর ঘুমটা ভেঙে যায় ! আস্তে আস্তে বাইরের বারান্দায় এলো সে । আলো জ্বালানোর জন্য সুইচ অন করল , কিন্তু জ্বললো না । গ্রামের দিকে এই একটা সমস্যা ঝড় বৃষ্টি হলেই বিদ্যুৎ চলে যায় । এখনো বৃষ্টি হচ্ছে , সেই সঙ্গে হালকা হালকা ঝড়ো হাওয়াও বইছে । খোলা বারান্দার গ্রিল অতিক্রম করে মাঝে মাঝে জলের ঝাপটা এসে লাগছে কুমুদিনের গায়ে । বারান্দাটাও পুরো জলে থৈথৈ করছে । কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে দেখার চেষ্টা করল সে । কিন্তু কিছু দেখতে না পেয়ে ঘরের দেয়াল ধরে খুব সাবধানে ধীরে ধীরে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল ।
ঘুম ভাঙলো সকাল বেলা অমিতাভ বাবুর ডাকে । ঘুম আসছে না আসছে না করে ঠান্ডায় কখন যে চোখ লেগে গেছে বুঝতেই পারেনি সে । তাড়াতাড়ি উঠে একটু রান্না-বান্না করে খেল স্বামী-স্ত্রী দুজনে । খাওয়া শেষে অমিতাভ বাবু গেলেন তাদেরই গ্রামে অন্য একজন আত্মীয় বাড়িতে । আর কুমোদিনী রোজকারের মতো চেয়ারটা নিয়ে বসলো বারান্দায় । সামনের কুল গাছটার দিকে তাকাতেই দেখল - বাসাখানা আর নেই । আর কাক দুটো চুপ করে বসে আছে গাছটার একটা ডালে । মাঝেমধ্যে একটা কাক কা কা করে একবার নিচে নামছে আবার ডালে গিয়ে বসছে । আর অন্য কাকটা একটু গোঙানির সুরে কা কা করে আবার চুপ করছে। মনে হয় সে নিজের ব্যথাটা চেপে রেখে অন্যজনকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে । বড়ো মায়া হতে লাগল কাকদুটোর জন্য কুমুদিনীর । পাঁচ-ছয় দিন ধরে কাক দুটো এদিক ওদিক থেকে ডাল-পালা-খড়-কুটো যোগাড় করে কত কষ্ট করে সারাদিন ধরে ধরে বাসাখানা বানিয়েছিল । তা গতকাল রাতের কালবৈশাখী ঝড়টা এসে ভেঙে দিয়ে গেছে । আহা রে ! বেচারা কাক দুটো ! না জানি কত কষ্ট হচ্ছে তাদের ? কুমোদিনীর চোখ দুটো জলে ভরে উঠতে উঠতেই মুহূর্তে তা মিলিয়ে গেল । আর তার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো । সে মনে মনে কাক দুটোকে বলল - "ভালোই হয়েছে কাকেরা তোদের বাসাখানা এখন ভেঙেছে । কিছুদিন পরে ভাঙলে হয়তো তার মধ্যে থাকা ডিমগুলোও বাসার সঙ্গে নিচে পড়ে গিয়ে ভেঙে যেত ! তখন কত কষ্ট হতো বলতো ? কিংবা যদি বাচ্চাগুলো সবেমাত্র ডিম ফুটে বেরিয়ে এসেছে আর তখন যদি ঝড়টা হত ! তখন কি হতো বলতো ? কত কষ্ট , কত যন্ত্রনা , কত-শত হাহাকার করতে হতো তোদের । চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো কুমুদিনীর । সে ফিরে গেল নিজের বাসাখানিতে । আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগে অমিতাভের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তার । তখন ওরা ভাড়া বাড়িতে থাকতো । তাই ওরা চেয়েছিল নিজের একটা বাড়ি বানাতে । দিনরাত পরিশ্রম করে এক চিলতে জমি কিনে একটা মাটির বাড়িও বানিয়েছিল তারা । তারপর ছেলে মেয়েরা হল । তাদের মানুষ করতে করতে সময় চলছিল নিজের গতিতে । এরপর একদিন মাটির বাড়ি থেকে পাকা ইটের একটা বাড়িও বানাল তারা । দেখতে দেখতে ছেলেমেয়েরাও বড় হল । বেশ চলছে কুমোদিনীর সংসার বাসা ভর্তি ছানা-পোনা নিয়ে ।
কুমোদিনীর সংসারে প্রথম ভাঙন ধরল যখন বড় মেয়ের বিয়ে দিল । সমাজের রীতিতো মানতেই হবে , এমনই এক কালবৈশাখী ঝড় এসে মেয়েকে নিয়ে চলে গেল । কোলে পিঠে করে মানুষ করা মেয়েটা আস্তে আস্তে পর হয়ে গেল । এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঝড় এল যখন মেজো মেয়ে ও ছোট মেয়ে বিয়ে দিল । তার ভরা বাসাখানা শূন্য হতে শুরু করল । ছেলেও বেশ কিছুটা দূরে চাকরি পেল । সেই সূত্রে বাইরে থাকে সে । শনি-রবি দুদিন বাড়িতে আসে । বাড়ি খানা এক্কেবারে ফাঁকা । ফাঁকা বাড়িটা খাঁ খাঁ করে । ভালো লাগে না কুমোদিনীর । অমিতাভও ব্যস্ত নিজের কাজে । বড় একা মনে হয় তার । ছেলেকে বিয়ে দিল । ভাবলো নাতি-নাতনি হলে তার বাসাখানা আবার পরিপূর্ণ হবে । কিন্তু ঘরে যে কালবৈশাখী ঝড়টা এলো সেই ঝড়ের তোড়ে কুমোদিনীর সাধের বাসাখানা আজ শূন্য । হয়তো কাক দুটোর মত তার বাসাখানা ভেঙে পড়ে যায়নি , মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে । কিন্তু তার মধ্যে যে দুজন মানুষ আছে তারা ভেঙে-দুমড়ে গেছে । ভাবতে থাকে কুমোদিনী - আমরা একা থাকার জন্য তো বাসাখানা বানাইনি ! আর মরার সময়তো সঙ্গে করে নিয়েও যাব না । হয়তো যাদের জন্য বানিয়েছিলাম তাদের আজ পাখা হয়েছে । তারা উড়তে শিখেছে । একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল সে ...
#কালবৈশাখী
#রূপবালা_সিংহ_রায়_🖋️
banglagolpo , bengalistory #banglakobiagolpo , bengalipoetryandstory
সাঁঝবাতির রূপকথায় - Rupbala Singha Roy
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন