মায়ের ছুটি - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // নতুন বাংলা গল্প // New Bengali Story // Best story bangla ।
মায়ের ছুটি
রূপবালা সিংহ রায়
আজ শনিবার বাচ্চাদের স্কুল ছুটি । কিন্তু কুনালের একটা ক্লায়েন্ট মিটিং আছে তাই তানিয়া সকাল সকাল রান্নাটা সেরে ফেলল । কুনাল খাওয়া দাওয়া করে বেরিয়ে গেল । ঘরের কাজকর্মও শেষ। বাচ্চা দুটো তানিয়াকে এসে বলল চলোনা মা কোথাও থেকে ঘুরে আসি । তানিয়া ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো সময় সাড়ে নটা । কোথায় যাওয়া যায় কোথায় যাওয়া যায় ভাবতে ভাবতে মনে হল অনেকদিন আদ্যা মন্দিরে যাওয়া হয়নি । তেমন ঘটা করে পূজার্চনা না করলেও তানিয়া মাঝে মধ্যে যায় সেখানে । মায়ের কাছে পুজো দেয় আর সবার জন্য মঙ্গল কামনা করে। ছেলে মেয়ে দুটো যেন মানুষের মতো মানুষ হয় । নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে । তারা যেন সুখী হয় । কুনাল যেন ভালো থাকে । ক'দিন ধরে মায়ের শরীরটা খারাপ , মা যেন ঠিক হয়ে যায়। বাবার শরীর যেন ঠিক থাকে, আরো অনেক কিছু । তারপর ওখান থেকে খিচুড়ি প্রসাদ নিয়ে বাড়ি ফেরে । ওর মেয়ে ওটা খেতে খুব ভালোবাসে।
বাড়ি থেকে মন্দির পাঁচ মিনিটের পথ। তিনজনে পৌঁছে গেল মন্দিরে। তানিয়া একটু ফুল মিষ্টি নিয়ে নিল পুজো দেওয়ার জন্য । আজ বেশ লম্বা লাইন পড়েছে পুজো দেওয়ার জন্য । একে শনিবার তার ওপর অমাবস্যা তা নাহলে এখানে তেমন একটা ভিড় হয় না । ছেলে আর মেয়ে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করছে । কখনো তার কাছে আসছে আবার কখনো মন্দিরের মধ্যে উঁকিঝুঁকি মারার চেষ্টা করছে । কখনো নিজেদের মধ্যে গল্প করছে , বাচ্চারা যেমনটি করে আর কি । প্রায় আধাঘন্টা কেটে গেছে। একটু একটু করে এগোচ্ছে লাইনটা । হঠাৎ পাশ থেকে একজন ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন - "যতদিন ছোটো থাকবে ততদিন সাথে সাথে থাকবে । বড়ো হয়ে গেলে আর থাকবে না । জানো তো আমার ছেলে মেয়েও আমার সঙ্গে আসত । যেখানে যেতাম সেখানে যেত । বাজারে গেলেও নিয়ে যেতে হতো। এখন আর কোথাও যায় না ...। ছেলে এখন কলেজে পড়ে । মেয়ে এবার এইচএস দেবে । ছেলেকে বললাম একটু ফুল আর মিষ্টি এনে দে । তুমি মন্দিরের সামনে থেকে নিয়ে নিও বলে শুয়ে শুয়ে ফোন দেখতে শুরু করলো । মেয়েকে বললাম চল আমার সাথে সে বলল মা আমার পড়া আছে। কি করবো বলো " -বলে উনি একটা হতাশা ভরা একাকিত্বের হাসি হাসলেন । তারপর বাচ্চা দুটোর সাথে গল্প করতে লাগলেন । কি নাম , কোন ক্লাসে পড়ো , কোন স্কুল , কোথায় থাকো ইত্যাদি ।
পূজো দিয়ে প্রসাদ নিয়ে বাড়ি চলে এলো তানিয়া । বাচ্চারা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে । মাকে ফোন করল সে ।
তানিয়া -"কি করছো মা "?
মা বললেন -"এই বসে আছি" ।
কেমন আছো কথাটা জিজ্ঞাসা করতে পারল না তানিয়া কারণ কদিন ধরে মায়ের শরীরটা অনেকটাই খারাপ । তাই জিজ্ঞাসা করল -"দুপুরে খেয়েছো" ?
মা - "হ্যাঁ" ।
তানিয়া- " কি খেলে "?
মা -"ফুলকপি আলু দিয়ে মাছ আর বেগুন ভাজা" তানিয়া- " বাবা কোথায়" ।
মা-" ওই খবর দেখছে ।
"তানিয়া- " তা তুমি তো একটু টিভি দেখতে পারো না হলে একটু ঘুমাতে তো পারো"।
মা - "ধুর টিভি দেখতে ভালো লাগে না । আর ঘুম সেটা এখন আসে না । তোরা যখন ছোটো ছিলিস তোদের ঘুম পাড়াতে পাড়াতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়তাম টেরই পেতাম না । ঘুম ভেঙ্গে দেখতাম বিকেল । কখনো কখনো সন্ধ্যা হয়ে যেত । একা একা আর ভালো লাগে না।"
তানিয়া -" তা কি করবে এখন" ?
মা-" একটু পরেই তোর বাবা বেরোবে বাজারের দিকে আর আমি একটু ব্যালকনিতে গিয়ে বসবো"। মা-" নিজের খাওয়া হয়েছে "?
তানিয়া-" হ্যাঁ " ।
মা - "সোনাই বাবু কেমন আছে"?
তানিয়া- " ভালো " ।
মা- "কুনাল কোথায় " ?
তানিয়া - "অফিসে " ।
মা - " মিষ্টি, আলু ,ভাত একটু কম খাবে। একটু হাঁটাহাঁটি করবে। মাঝে মাঝে ব্যায়াম করবে । নিজের খেয়াল রাখবে। তোমাদের নিয়েই আমার যত জ্বালা "।
তানিয়া- " কেন এত ভাবো মা ? আমরা তো বড় হয়েছি। মা হয়েছি । তবুও এত ভাবনা তোমার "! মাকে কেবল একটু হাসলেন ।
মায়ের সঙ্গে কথা বলা শেষ করে তানিয়া বাচ্চাগুলোর মুখের দিকে তাকাল ।ভাবল সত্যি তো এরা যখন বড়ো হয়ে যাবে , ব্যস্ত হয়ে যাবে নিজেদের জীবন নিয়ে তখন আমি কি করব ? তখন আমিও তো একা হয়ে যাব মা আর ওই মন্দিরে দিদিটার মতো। আমিও তো বড়ো হয়ে যাওয়ার পর মাকে তো তেমন একটা সময় দিতে পারিনি । আর এখন তো দিতেই পারিনা । অথচ মা তার সারাদিনের সমস্ত সময়টা আমাদের জন্মের পর থেকে আমার আর বোনের জন্য ব্যয় করেছে। সব সময় আমাদের নিয়ে চিন্তা করেছে। কি খাব ? কি করব ? কি পরবো? ঠিকঠাক পড়াশোনা করছি কিনা ? আরও কত কি...? আজও সারাদিন ভেবে চলেছে আমাদের নিয়ে । নিজের শরীর নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। এমন সময় ছেলে তাকে জড়িয়ে ধরলো। মনে হয় কোনো স্বপ্ন দেখেছে। একটু তাকিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। সত্যি মা এমন একজন মানুষ যার কোল আমাদের কাছে সবচেয়ে শান্তির আশ্রয় । সে যতই আমরা বড়ো হয়ে যাইনা কেন ....
তাই সকল মায়েদের উদ্দেশ্যে একটাই অনুরোধ, একটু নিজের দিকে তাকান .... সন্তান একদিন বড়ো হয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে । আর সংসারের দায়িত্বটাও একটু হলেও কমবে । এটাই কালের নিয়ম । তাই সারাটা দিন থেকে একটু সময় নিজের জন্য রাখুন । শরীরচর্চা করুন । পরিবারের সদস্যদের সাথে সাথে নিজের শরীরের দিকেও একটু নজর রাখুন। শরীর খারাপ হলে অবহেলা না করে ডাক্তার দেখান । নিজের মনকে ভালো রাখুন । নিজের যত্ন নিন । গান শুনুন । নিজের সখগুলো বা হবিগুলোকে একটু হলেও বাঁচিয়ে রাখুন । যেটা পরবর্তীতে আপনাকে একাকিত্বের হাত থেকে বাঁচাবে । ভালো থাকুন । সুস্থ থাকুন। সব সময় হাসিখুশি থাকুন।
#মায়ের ছুটি
.....✍🏻 রূপবালা সিংহ রায়
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন