বচন - রূপবালা সিংহ রায় // Bangla Golpo // নতুন বাংলা গল্প।

 বচন

রূপবালা সিংহ রায় 


মনীশবাবু আর প্রীতলতা দেবীর একমাত্র মেয়ে  মৌপ্রীতি। চার বছর হল মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন ।এক বছরের ছোট্ট একটা নাতনিও আছে। মেয়ের বিয়ের পর বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এখন প্রায় অবসরে চলে গেছেন। মাত্র দুজনের সংসার । টুকটুক করে চলছে। মেয়ে অন্য বাড়িতে থাকলেও প্রতিদিন একবার করে মা-বাবাকে ফোন করে। বাচ্চাটা হওয়ার পর এ বাড়িতে একটু কমই আসে । ওকে নিয়ে ব্যস্ত সারাদিন। বাচ্চাটা দুপুরবেলা ঘুমিয়ে গেলে মৌপ্রীতি ফোন করলো মাকে। মায়ের সাথে যথারীতি কথা শেষ করে বাবার সাথে কথা বলছে এখন । সমস্ত কথা নাতনিটাকে নিয়ে । সারাদিন সে কি করে ? হাঁটতে শিখেছে কিনা ? মা বাবা বলছে কিনা ? রাতে ঘুমায় না জেগে থাকে ইত্যাদি ইত্যাদি । প্রায় পৌনে এক ঘন্টা ধরে ওর কথা বলার পর মৌপ্রীতি বলল - "তুমি কেমন আছো বাবা"? মনীশবাবু বললেন - "ভালো আছি তুই ভালো আছিস তো মা ? মৌপ্রীতি - " হ্যাঁ, ভালো আছি"। মনীশ বাবু - "রাতে ঘুমাতে দিচ্ছে ও" ? মৌপ্রীতি - " হ্যাঁ বাবা " । মনীশ বাবু একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন - "কিছু না করো সবার আগে নিজের খেয়ালটা রেখো । সংসারে কত কাজের চাপ। তার ওপর ছোট্ট বাচ্চা ।  নিজে আগে দুটো খাবে সময়মতো , তারপর কাজ-বাজ । জানিস তো মা নিজের শরীর ঠিক না থাকলে স্বামী-সন্তান কেউই পাত্তা দেবেনা । পরে কেবল কাজটাই বোঝে, নিজেরটাই বোঝে। 


পাশ থেকে প্রীতিলতা দেবী কথাগুলো শুনছিলেন । বাবা মেয়ের কথাগুলো শুনতে শুনতে ফিরে গেলেন অতীতে। নিজের সংসার জীবনে । যৌথ পরিবার ছিল তাঁর । শ্বশুর,শাশুড়ি, দেওর, ননদ ,তার ওপর ছোট্ট বাচ্চা ‌ । শ্বশুর মশাই বিছানা সজ্জা । শাশুড়ি মাও তেমন কাজ করতে পারতেন না । এমনকি বাচ্চাটাকেও সামলাতে পারতেন না ।দওর ননদের কলেজ ছিল , টিউশন ছিল । তাদের টাইমলি খেতে দেওয়া টিফিন বানানো , সব কাজ একা হাতে করতে হতো প্রীতিলতাকে ।মনীশবাবুর একার ইনকামে সংসারটা চলত বলে প্রীতিলতা দেবী চারটে বাচ্চাকেও পড়াতেন । এক একটা দিন কাটতো অক্লান্ত পরিশ্রমে । রাতে ঘুমটাও ঠিকঠাক হতো না। মৌপ্রীতি ছোট ছিল তার ওপর মাঝে মধ্যে শ্বশুর মশাইকে উঠে দেখতে হতো। 


সেদিন মনে হয় তরকারিতে লবন না লঙ্কা একটু বেশি হয়েছিল মনীশ বাবুর রেগে খাবারের থালা ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলেছিলেন কি করো সারাদিন বাড়িতে ? এইতো দুটো কাজ বাসন মাজা আর রান্না করা । তাও ঠিকঠাক করতে পারো না । না পারলে চলে যাও বাপের বাড়ি। বড় অভিমান হয়েছিল প্রীতিলতার । একদিন রান্না খারাপ হয়েছে বলে এত রাগ , কই যেদিন ভালো হয় সেদিন তো কিছু বলে না। রাগও হয়েছিল তাঁর । ভেবেছিলেন সকাল বেলা চলে যাবেন কিন্তু সকালবেলা কাজের চাপে রাগটা চলে গিয়েছিল । এতগুলো মানুষকে ফেলে যেতে পারেননি সেদিন । নিজেকে বুঝিয়েছিলেন হয়তো ওর দিনটা ভালো যায়নি। সারাদিন কাজের প্রেসার তার ওপর সংসারের টানাটানি ।


 দেওর বিয়ের পর আলাদা । ননদেরও বিয়ে হয়ে গেছে । শ্বশুর-শাশুড়িও মারা গেছেন  অনেকদিন আগে । মেয়েরও বিয়ে দিয়েছেন । এখন মনীশ বাবু বেশ কেয়ারিং । হাঁটুতে ব্যাথা হলে তেল মালিশ করে দেন। রান্নাতেও সাহায্য করেন । সব্জি কেটে দেন । সন্ধ্যেবেলা দুজনের জন্য চা বানান। নানান রকমের গল্প শোনান । মাঝে মাঝে গানও করেন। দুজন বেশ ভালোই আছে বলা যায় । কিন্তু কেন জানি না বাবা মেয়ের কথা শুনে প্রীতিলতা দেবীর মুখ ভেতর থেকে একটা গভীর দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো ...


আসল কথাটা হলো এই "কথা"। আমরা যখন কথা বলি মাঝে মাঝে ভুলে যাই আমরা ঠিক কি বলছি ? আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার উপর তার প্রভাব কি পড়ছে ? আমরা যে পরিস্থিতির কথা বলি , যে প্রেক্ষাপটে কথা বলি, যে মানসিকতায় কথা বলি, যে সময়ে কথা বলি সেগুলো সব বদলে যায় একদিন । কিন্তু যে কথাটা বলি সেটা বদলায় না। আমরা কথাটা ভুলে যাই কিন্তু যে মানুষটাকে বলি সে কিন্তু ভোলে না । আজীবন মনে রাখে । একটা খারাপ কথার পরে যতই তুমি হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ ভালো কথা বলো না কেন কোনো না কোনো সময় সহস্র ভালো কথার পাহাড় ভেদ করে খারাপ কথাটা বেরিয়ে আসে । কথা এমন একটা অস্ত্র যেটা দিয়ে শত্রুকেও বসে আনা যায়। যেটা দিয়ে পাষাণ হৃদয়ের মানুষের চোখ দিয়ে জল আনা যায়। এটা এমন একটা জিনিস যার খারাপ প্রয়োগ কাছের মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়। অন্তরঙ্গ বন্ধুকেও শত্রু বানিয়ে ফেলে এক নিমেষে । তাই যদি কখনো সেই রকম পরিস্থিতি তৈরি হয় নিজেকে যতটা পারো শান্ত রাখার চেষ্টা করো ....


বচন

কলমে : রূপবালা_সিংহ_রায়

bengalistory ,beststoey , benglipoetryandstory ,মনভালোকরাবাংলাগল্প 

সাঁঝবাতির রূপকথায় - Rupbala Singha Roy

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।