ডিভোর্স ফাইল - রূপবালা সিংহ রায় // Bangla Golpo // নতুন বাংলা গল্প // Bengali Story ।

 

ডিভোর্স ফাইল

রূপবালা সিংহ রায়


হেয়ারিংটা শেষ করে সবেমাত্র চেম্বারে এসে বসেছে সুচরিতা । আজ বেশ তাড়ায় আছে , তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে বাড়িতে। এমন সময় অনিক এসে বলল- "ম্যাম সেই ক্লায়েন্টটা এসেছে"। "কোন ক্লায়েন্ট? আজ আমি যে কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট রাখতে বারণ করেছিলাম তোমায় । কোনো কথা শোনো না তুমি আমার । এমন করলে কাল থেকে তুমি আর এসো না আমার কাছে "। রাগে গর্জে উঠল সুচরিতা । বছর সাতান্নের সুচরিতা রায়চৌধুরী সিনিয়র অ্যাডভোকেট অফ আলিপুর জর্জ কোর্ট । বয়সের কারণে তেমন আর দৌড়াদৌড়ি করতে পারে না । কাজের এত প্রেসার তাই বছর খানেক হল অনিককে রেখেছে তার কাজে হেল্প করার জন্য। অনিক সবে মাত্র "ল" কমপ্লিট করে প্র্যাকটিস করছে। একটু থতমত খেয়েই সে বলল - "ম্যাম আমি রাখিনি ওরা বারবার রিকোয়েস্ট করছে আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য। ওই যে সেই কাপলটা যারা ডিভোর্সের জন্য এসেছিল কদিন আগে। কি ঝামেলা টাই না করেছিল মনে নেই" ... রাগটা যেন জল হয়ে গেল সুচরিতার । ওদের পাঠিয়ে দাও বলে চেয়ার থেকে উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। বাইরের দিকে লোকের আনাগোনা দেখতে দেখতে ফিরে গেল নিজের সাতাশ বছর বয়সে । তখন সবেমাত্র "ল" পাস করে প্র্যাকটিস করছে সে আর তার হাজবেন্ড সিদ্ধার্থ । "ল" কলেজেই আলাপ তাদের । তারপর প্রেম । অবশেষে দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে । বিয়ের চার-পাঁচ মাস পর থেকেই শুরু হল অশান্তি। প্রেমটা মধুর হলেও দাম্পত্য জীবন মোটেও সুখের হয়ে উঠতে পারছিল না । বিয়ের আগে সিদ্ধার্থকে বেশ শান্ত স্বভাবের মনে হলেও আদতে সে একজন বদমেজাজি মানুষ । এমনি বেশ ভালো কিন্তু রাগটা তার প্রচন্ড রকমের । একবার রাগ মাথায় উঠে গেলে আর রক্ষা নেই । প্রচণ্ড রকমের খারাপ অবস্থা সৃষ্টি করে । এদিকে সুচরিতাও কম যায় না । মাঝেমধ্যে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ লেগে যায় । তার ওপর এডজাস্টিং এর প্রবলেম , ছোট বড় কথা ইত্যাদি । আর সহ্য করতে পারছিল না সুচরিতা । সারাদিন কোর্টের প্রেসার তারপরে সংসারের খুঁটিনাটি সমস্যা সামলে উঠতে পারছিল না । মানিয়ে নিতে পারছিল না দুজন দুজনের সঙ্গে । ভালোবাসাটা তলিয়ে যাচ্ছিল সমস্যার সমুদ্রে । ইগোটা প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিল দুজনের মাঝখানে। অবশেষে দুজন সিদ্ধান্ত নিল ডিভোর্সের । সুচরিতা চলে এলো বাপের বাড়িতে। কথা হলো ডেট ফাইনাল করে জানাবে সিদ্ধার্থকে। সবটা জানালো মা-বাবাকে । বাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটা মুচকি হাসি দিয়ে সুচরিতার মাথায় হাত রেখে বললেন - "জানিস তো মা কোনো কিছু খুব সহজেই ভেঙে ফেলা যায় কিন্তু গড়তে অনেক সময় লাগে । অনেক ধৈর্য লাগে । লাগে অনেক পরিশ্রমও । এই দেখ আমি যে এই বাড়িটা বানিয়েছি একদিনে কি হয়েছে কিন্তু ভাঙতে গেলে নেমেসেই ভেঙে ফেলা যাবে । তোর মা আর আমার বিয়ে হল এই চল্লিশটা বছর । আমাদের মধ্যে কি ঝগড়া গন্ডগোল হয়নি হয়েছে । তবুও আমরা একসাথে পার করে দিলাম এতটা বছর । সবারই সংসারে একটু-আধটু ঝামেলা হয়ে থাকে । তবে হ্যাঁ তার মানে এই নয় আমি তোমাকে তোমার সব কিছু বিসর্জন দিয়ে জামাইয়ের সঙ্গে থাকার জন্য বলছি । আমি কেবল এইটুকুই বলছি যা করবে ভেবেচিন্তে করবে । সময় নাও এক সপ্তাহ , এক মাস যতটা তোমার দরকার । রাগের বশে হুট করে কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলো না । তুমি কিছুদিন এখানে থাকো। সিদ্ধার্থের সঙ্গে দেখা করোনা আর কথাও বলো না । দেখো তোমার মন কি বলছে । আর মনে রাখবে তোমার কথা হল শেষ কথা। যদি একসঙ্গে থাকতে চাও থাকবে আর না থাকতে চাইলে পথ তো খোলাই আছে । এরপর বাবা সিদ্ধার্থকে ফোন করে একই কথা বললেন । কিছুদিন পর সিদ্ধার্থ নিজে এসে সুচরিতাকে নিয়ে ফিরিয়ে যায় । মাঝেমধ্যে ঝগড়া-গন্ডগোল যে হয়নি তা কিন্তু এক্কেবারেই নয়। যখন একজনের রাগ হয়েছে অন্যজন চুপ থেকেছে। একজনের অভিমান হলে অন্যজন মানভঞ্জন করেছে। একজন অন্যজনের ভুল ধরিয়ে দিয়েছে। মানিয়ে নিয়েছে দুজন দুজনকে । এমনি করে আজ তাদের বিয়ের ৩৫ বছর পূর্ণ হল। একটা মেয়ে ও একটা ছেলে। ছেলে বিদেশে আছে । আর মেয়ে ডাক্তারি পড়ছে। তাই আজ একটু বেশি তাড়া বাড়ি ফেরার জন্য। হিয়ারিংটা ইম্পরট্যান্ট ছিল না হলে আজ কোর্টে আসতো না সে । 


এমন সময় ছেলে-মেয়ে দুটো ঢুকলো চেম্বারে। বয়স বেশি নয় ওই ত্রিশ- বত্রিশ এর কাছাকাছি হবে । বিয়ে হয়েছে এই চার বছর । কদিন আগে ডিভোর্সের জন্য এসেছিল সুচরিতার কাছে । ডিভোর্স ফাইল করার আগে সুচরিতা সকল কাপলকে একসঙ্গে পাশাপাশি বসিয়ে বাবার বলা কথাগুলো বলে । তারপর তারা যেমন ডিসিশন নেয় সেই অনুযায়ী কাজ হয়। আজ পর্যন্ত যে কটা ডিভোর্স কেস এসেছে কেউই তার কথায় নিজেদের সিদ্ধান্তটাকে পাল্টায়নি। কি আর করা যাবে ? এটাই তার প্রফেশন । ডিভোর্স করিয়ে দিয়েছে । আজ মনটা কেমন যেন খারাপ লাগছে সুচরিতার । যেহেতু আজ তাদের বিবাহ বার্ষিকী । এই কাজটা করতে যেন তার মন সাড়া দিচ্ছে না । তাছাড়া কাপল দুটো যেদিন প্রথম তার কাছে ডিভোর্সের জন্য এসেছিল মেয়েটা কথা বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল তখন ছেলেটা তার দিকে একটা জলের বোতল এগিয়ে দিয়েছিল । মেয়েটা রাগের বশে জলটা খায়নি তবুও কেন জানি না মনে হচ্ছিল সেও তার হাজবেন্ডকে খুব ভালোবাসে। তাই সুচরিতা ভেবেছিল বাবার ডোজটা হয়তো কাজে লাগলেও লাগতে পারে । কিন্তু আজ আচমকা আসার কারণ কি হতে পারে বুঝতে না পেরে তাদেরকে বসতে বলে সে নিজের চেয়ারটাতে বসলো। ছেলেটা একটা মিষ্টির প্যাকেট বার করে রাখলো টেবিলের উপর। তারপর একটা লাজুক হাসি দিয়ে বলল - "থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাডাম । আপনি না থাকলে হয়তো সেদিনই আমাদের ডিভোর্সটা হয়ে যেত। আর সেটা হয়ে গেলে আজ আমি হয়তো এই খুশির খবরটা পেতাম না । জানেন তো আমি বাবা হতে চলেছি । কাল ওর শরীরটা খারাপ লাগছিল বলে শাশুড়ি মা ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় । তারপর তিনি আমাকে ফোন করেন । এই তিন মাস হল আমাদের বেবিটা এসেছে । ডিভোর্সটা হয়ে গেলে বলুন তো কি হতো আমার বাচ্চাটার? আর আমার বাচ্চার মাকে দেখছেন তো সে নিজেই এখনো বাচ্চা। নিজেকে সামলাতে পারে না বাচ্চা সামলাবে কি করে ? আর এত বদমাশ আমাকে হয়তো কথাটা জানাতোই না "। পাশে বসে মুখ চেপে হাসছিল মেয়েটা । ওদেরকে একসাথে এমন দেখে চোখ দুটো জুড়িয়ে গেল সুচরিতার । তারপর মিষ্টির প্যাকেট থেকে ওদেরকে একটা করে মিষ্টি খাইয়ে কনগ্র্যাচুলেট করে কোর্টটা গায়ে চাপালো । তারপর নিজে একটা মিষ্টি খেতে খেতে গাড়িতে উঠে পড়ল বাড়ি যাওয়ার জন্য । ওদিকে আবার সিদ্ধার্থ পথ চেয়ে বসে আছে । ছেলেটা এতক্ষণে হয়তো চলেও এসেছে। মেয়েটা হয়তো বেলুন ফোলাতে ব্যস্ত .....




গল্প : ডিভোর্স ফাইল

কলমে : রূপবালা সিংহ রায়

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।