জীবনসঙ্গিনী - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // নতুন বাংলা গল্প // New Bengali Story ।

 জীবনসঙ্গিনী

রূপবালা সিংহ রায় 


ধুর ! আর ভালো লাগেনা এই একঘেঁয়ে জীবন । সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সেই একই কাজ করে আসছি । ঘুম থেকে উঠতে না উঠতে সকাল সকাল নাকে মুখে গুঁজে ছোটো অফিস , অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত আটটা । তারপরেও তো শান্তি নেই । শুনতে হয় বউয়ের গজর গজর । কোনো কিছুতে মন ভরে না তার । সবসময় খ্যাচর-খ্যাচর করতেই থাকে । সপ্তাহে একদিন ছুটি তাও ছুটতে হয় বাজারে । একটু যে ঘুমাবো তারও উপায় নেই । সূর্য ওঠার সাথে সাথে ঠেলতে শুরু করে বাজারে যাওয়ার জন্য । তারপর সারা সপ্তাহের বাজার একাই বয়ে আনতে হয় মুটের মত । অসহ্য এক্কেবারে । আর নেওয়া যাচ্ছে না । কেন যে সাত তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে গেলাম কে জানে ? কি যে ভূত চেপে ছিল সে সময় আজ তার খেসারত দিতে হচ্ছে । টিফিনটা বানিয়েছে দেখো মুখে তোলা যাবে বলে মনে হয় না । ফেলে যে দেব মনটা সায় দিচ্ছে না । মা বরাবরই বলতো - অন্ন নষ্ট করলে নাকি লক্ষ্মী দেবী রুষ্ট হন । আর নীলাটাও হয়েছে তেমনি বলি লাঞ্চ দিতে হবে না ক্যান্টিনে খেয়ে নেব, না তা উনি শুনবেন কেন ? এইসব শাক পাতা সেদ্ধ না খাওয়ালে ওনার আবার সুখ হয় না । সেদিন সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফেরার সময় একটা চিকেন রোল খাওয়ার মাশুল এখনো গুনতে হচ্ছে ! বাইরের খাবার খেয়ে পেট খারাপ হতেই পারে এক-দুবার। তাই বলে কে খায় এক সপ্তাহ ধরে এইসব খাবার । কোনো দিন কাঁচকলা দিয়ে পাতলা মাছের ঝোল খাওয়াচ্ছে তো কোনদিন শুক্ত । এটা কোনো টিফিন হল - কর্ণ সেদ্ধ , চিকেন সুপ আর স্যালড । ব্যাস্ এতে কি হয় শুনি ? সকালে কতবার করে বললাম --"এসব খেতে আর ভালো লাগছে না একটু অন্য কিছু দাও না । বেশি কিছু না ভাত তো রান্নাই করছো সেখান থেকে কিছুটা তুলে নিয়ে একটু ফ্রাইড রাইস করে দাও আর একটু চিকেন কষা । আর সেটা যদি করতে না পারো তাহলে ছেড়ে দাও। আমি বাইরে খেয়ে নেব । ক্যান্টিনের পাশে রবিদার একটা দোকান আছে সেখানে দারুন বিরিয়ানি বানায়। জানো ! পাশ থেকে গেলে বিরিয়ানির গন্ধে অর্ধেক পেট ভরে যায় " ।


অমনি নীলা গম্ভীর স্বরে বলে উঠল --" অর্ধেক পেট বিরিয়ানির গন্ধ শুঁকে ভরিও আর বাকি অর্ধেক এগুলো দিয়ে । এই গরমে ওসব চলবে না । আর হ্যাঁ যদি তুমি ওসব খেয়েছ আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না । সেটা তুমি ভালো করেই জানো । আমার মাথার পেছনে দুটো চোখ আছে জানো তো সব দেখতে পাই আমি একদম চালাকি করবে না" । 

মনে মনে গজরাতে থাকে রাতুল -- "চোখ আছে না ছাই । আমিই তো ঠিকঠাক না পারি মিথ্যে বলতে ওকে আর না পারি কিছু লুকাতে । না এবার থেকে এই ট্রেনিংটা নিতেই হবে আমায়" --ভেবে ছোটে অফিসে । 


লাঞ্চ করতে করতে রাতুলের চোখ পড়ল রামতনুদা ও অনির্বাণের দিকে । তাদেরকে তার দিকে আসতে দেখে মহা বিপদে পড়ে গেল সে । লাঞ্চ বক্সে এসব দেখলে আর রক্ষে নেই । বিশেষ করে অনির্বাণ , যা পেছনে লাগবে বলার মত নয় । "বুঝবি কি করে ব্যাটা ? বিয়ে তো করিস নি এখনো পর্যন্ত । বিয়েটা কর তারপরে বুঝবি ঠেলা" --ভাবতে ভাবতে গোটাতে থাকে টিফিন কৌটো গুলো । ওরা এসে যে যার মত চেয়ার টেনে বসে রাতুলের সামনে । অনির্বাণ প্রায় জোর করেই আধ গোছানো টিফিন কৌটোগুলো রাতুলের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে দেখতে দেখতে বলল -- "কিরে ডায়েটে আছিস নাকি" ? 

রাতুল কিছু বলার আগেই সে বলল --"তা বেশ । তুই যা পেটুক তোর দ্বারা তো ওসব কিছু হবে না বৌদির পাল্লায় পড়ে যদি একটু ফিট থাকতে পারিস । এবার ভাবছি বিয়েটা করেই ফেলবো বুঝলি । কি সুন্দর একজন দেখভাল করার মানুষ পাবো । সারাদিন কি খেলাম কি করলাম তার কৈফিয়ত নেওয়ার একজন মানুষ থাকবে । আর ভালো লাগে না জানিস এই বাউন্ডুলে জীবন । এক গ্লাস জল পর্যন্ত গড়িয়ে দেওয়ার কেউ নেই । মায়েরও বয়স হচ্ছে সেও আর পারেনা সবকিছু সামলাতে । তার ওপর সে এখন চাইছে গ্রামে বাবার কাছে ফিরে যেতে । বাবার শরীরটাও ঠিক নেই । বাবা আবার শহুরে বদ্ধ জীবন ভালোবাসে না "। 


রামতনু বাবু এক গাল হেসে অনির্বানের পিঠ চাপড়ে বললেন --"সেই ভালো । এতদিনে একটা ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছো । তবে হ্যাঁ বউকে কিন্তু আবার গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিও না । নিজের কাছেই রেখো । যদিও একসঙ্গে থাকলে ঝগড়া-ঝাটি হয় প্রচুর । তবে ভালোবাসাটাও থাকে সেইসঙ্গে থাকে যত্নটাও । চাকরিটা পাওয়ার পর তোমার বৌদিকে নিয়ে আসি এখানে । ছিলামও বেশ কয়েক বছর একসাথে । একটা সময় পর সবকিছু অসহ্য হয়ে উঠল । ও যেন কেমন একটা হয়ে গেল । সারাক্ষণ ঝগড়া ঝগড়া । সবকিছুতে তার বিরক্তি ‌। এই কেন হয়নি ? সেই কেন হয়নি ? এটা কেন করলে না ? সেটা কেন করলে ? রোজকার এই ঝগড়ার ভালো লাগছিল না । ভেবেচিন্তে একটা উপায় বার করলাম । ওকে পাঠিয়ে দিলাম গ্রামে মা-বাবার কাছে । মা বাবার বয়স হয়েছে দেখভাল করার কেউ নেই , তারপর ছেলেটাও তখন ক্লাস ফোর । শহরে পড়াশুনোর যা খরচ ঠান্ডা মাথায় বোঝালাম ওকে । ছেলেকে ওখানকার একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করে দিলাম । ও চলে গেল কিছু বলল না । ওই যে গেল আর ফিরলো না । পরে অনেক বার বলেছি এখানে আসতে । আর আসেনি । ছুটিতে যাই ওখানে খুব যত্ন-আত্তি করে বুঝলে । এখানে থাকলে দিনে দু-তিনবার করে ফোন করে খোঁজ নেয় । গরম পড়েছে বাইরের খাবার খাবে না ঘরের খাবার খাবে ইত্যাদি ইত্যাদি বলে আরো নানান কথা , তবে মৃদুস্বরে আগের মতো রাগী স্বরে নয় । খুব মিস করি জানো তো সেই ঝগড়াঝাটি , মান অভিমান , সামনে বসিয়ে খাওয়ানো , রাগ হলে না খেয়ে বসে থাকা । নিজে বেশি কথা বলে আবার কান্না করা । খুব মিস করি "। লাঞ্চ টাইম শেষে সবাই গেল যে যার কেবিনে । 


কাজের ফাঁকে ফাঁকে রাতুলের মনে পড়ছে রামতনু বাবুর কথাগুলো । বড্ড কষ্ট হচ্ছিল ওনার জন্য । বয়স তো কম হলো না পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে । একা একা থাকতে হয় তাকে । সেবার তো কতদিন অফিসেই আসতে পারলেন না । হঠাৎ করে জ্বর । কে নিয়ে যাবে ডাক্তারের কাছে ? কে করবে সেবা যত্ন ? কি করুন অবস্থা ! অনির্বাণ আর রাতুল গিয়েছিল তার সঙ্গে দেখা করতে । শেষে আবার বৌদি এসেছিল খবর পেয়ে --ভাবলেই কেমন গা টা শিরশির করে ওঠে । ওদিক থেকে দেখতে গেলে বেশ ভালোই আছি আমি । সেদিন বাথরুম আর ঘর করতে করতে প্রায় নাজেহাল অবস্থা । সেইসঙ্গে হচ্ছিল বমিও । দাঁড়ানোর ক্ষমতা প্রায় ছিলই না । নীলা ধরে ধরে নিয়ে গেল ডাক্তারের কাছে । নিয়ম মেনে খাওয়াল ওষুধ। ও ভুল তো বলে না কিছু । এই যে এমন টিফিন দিচ্ছে সেটা আমার ভালোর জন্যই -- ভাবতে ভাবতে ফোন করলো নীলাকে। 


--হ্যালো। ফোন করলে কেন ?


--কেন , ফোন করতে পারি না ?


-- সব ঠিকঠাক আছে তো ?


-- আরে বাবা হ্যাঁ ।


-- সত্যি সত্যি বলো কিন্তু


-- বলছি তো সব ঠিক আছে । এমনিই ফোন করেছি । কি করছো সেটা জানতে ?


--বাবা ! দাঁড়াও দাঁড়াও , দেখি সূর্যটা এখন কোন দিকে আছে তাহলে বুঝতে পারবো কোন দিক থেকে উঠেছে আজ ।


-- উপহাস করছো ?


-- আরে উপহাস কেন করতে যাব ? অবাক হলাম ! অবাক ! কত বছর হয়ে গেল তুমি ফোন করে খবর নাও না আমার । নিতে না সে কথা বলবো না বিয়ের প্রথম প্রথম কয়েক মাস নিয়েছিলে । তারপর তুমি কেমন হারিয়ে গেলে । আমি ফোন করলেও ব্যস্ততা দেখাও । কথা বলার সময় নেই তোমার । ঘরে ফিরেও তেমন সময় নেই তোমার আমার জন্য । মোবাইলে ব্যস্ত থাকো । তাই আর কি ...


রাতুল কি বলবে বুঝতে না পেরে নিশ্চুপ । তাই দেখে নীলা বলল -- বাইরে কি বিরিয়ানি খাওয়া হয়ে গেছে ? নাকি রাতে বানাবো ?


-- বাইরে বিরিয়ানি খাওয়া হয়ে গেছে মানে? আমি কি তোমার অবাধ্য স্বামী ? যে তোমার কথা শুনবো না ।


-- খুব বাধ্য বুঝি ?


--অবশ্যই , জীবনসঙ্গিনী বলে কথা ।


--ঠিক আছে হয়েছে । অত তেল দিতে হবে না । তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরো ।


-- ঠিক আছে ম্যাডাম বলে মুচকি হেসে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ফোনটা কাটে রাতুল ।


#জীবনসঙ্গিনী

#রূপবালা_সিংহ_রায়...

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।