পরনির্ভরশীলত - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // নতুন বাংলা গল্প // New Bengali Story ।


পরনির্ভরশীলতা

রূপবালা সিংহ রায়


 "বাবান বৌমাকে কি ফোন করেছিলি" ? "কেন আমি কেন ফোন করতে যাব"? - সকালের জলখাবার বানাতে বানাতে বেশ বিরক্তির সঙ্গে উত্তর দিল বিশাল তার মাকে । তার মা নিচু স্বরে বলল - "অনেকদিন তো হল যা গিয়ে নিয়ে আয় তিন্নিকে" । খাবার গুলো টেবিলে রাখতে রাখতে বিশাল বলল -"কেন তোমার কি কোনো কিছুতে অসুবিধা হচ্ছে ? তোমার বৌমা যা যা করত সবই তো আমি করে দিচ্ছি" । 

মা - "না অসুবিধা কিছু হচ্ছে না । তবুও ঘরের মানুষ যদি ঘরে না থাকে কেমন যেন খালি খালি....

 কথাটা শেষ হতে না হতেই বিশাল তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল - "এমন ভাবে বলছো যেন তোমার বৌমাকে সারাদিন তুমি ঘরে পাও"! 

মা - "সে থাকে না তবুও.... 

বিশাল - "তবুও কি শুনি , আমি কি ঘরের কাজ কিছু করতে পারি না নাকি ? আর ও কি কেবল একা করত ? আমি কি ওকে সাহায্য করতাম না ? 

মা - "হ্যাঁ তুই যেমন ওকে সাহায্য করতিস ,ও ও.. তো এই ফ্ল্যাটটা কিনতে তোকে সাহায্য করেছে "।

বিশাল - "সে আমি অস্বীকার করিনা । তবে ও কেন বলবে ও আমার ওপর ডিফেন্ডেড নয় , আমি ওর উপর ডিফেন্ডেট নাকি ? ও যেমন ঘর বাড়ি সামলে অফিস যেতে পারে , আমিও পারি । তোমার যত্নে যদি ঘাটতি পড়ে বলো" - বলে বিশাল অফিসের ব্যাগটা হাতে নিল । জীর্ণ মা পেছন থেকে চেঁচাতে লাগলো - "দুটো খেয়ে যা বাবান । দুটো খেয়ে যা ...

ক্যান্টিনে খেয়ে নেব বলে বিশাল বেরিয়ে গেল ।


 অফিসে এসে কাজে তেমন মন নেই বিশালের । এমনিতে তিন্নির জন্য মন খারাপ , তার ওপর সকালবেলা না খেয়ে বেরিয়েছে । মা নিশ্চয়ই কষ্ট পেয়েছে , ভাবতেই কেমন যেন অপরাধী অপরাধী মনে হচ্ছে তার । লাঞ্চ টাইমে অফিস ক্যান্টিনে আনমনে বসে আছে সে । এমন সময় তার অফিস কলিগ নিরঞ্জন বাবু এসে হাজির । বয়সে পার্থক্য বেশ খানিকটা হলেও বিশালের সঙ্গে ওনার সম্পর্ক বন্ধুর মতো । উনি বিশালের পিঠে হাত চাপড়ে বললেন - "কি খবর , সমস্যা মিটল "। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বিশাল উত্তর দিল  - "না" । "হু".. বলে দুটো কফি অর্ডার করে দিলেন তিনি । এমন সময় ওনার স্ত্রীর ফোন এলো । ওপার থেকে কি কথা হলো শুনতে পেল না বিশাল । তবে এপারের কথা শুনে মনে হল বেশ ক্ষেপে গেছেন নিরঞ্জন বাবু । "বলতো কোনো মানে হয় এর ? আমাকে এখন যেতে হবে বই কিনতে । ওনার স্টুডেন্টের জন্মদিন , বই আমাকে কিনতে হবে । অথচ উনি নিজে কিন্তু আসে কলেজ স্ট্রিটের উপর দিয়ে , তবুও আমাকে দিয়ে কেনাবে । এতটা পথ উল্টো যেতে হবে , বললাম - কি বলল জানো ? বলল এটাকে বলে 'পরনির্ভরশীলতা' । কলেজের প্রফেসর তো , আমাকে পড়িয়ে পড়িয়ে ছাড়লো এক্কেবারে । সকালে বেরোবেন উনি । চারিদিকে কাজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে । দৌড়ে দৌড়ে করছে , গেলাম সাহায্য করতে কি বলল জানো ? বলল - 'কিছু করতে হবে না। যাও গিয়ে চা খাও , আমি বানিয়ে দিচ্ছি । আমার উপর একটু নির্ভরশীল হও বুঝলে' । কোনো মানে হয় "? বিশাল হাসি চেপে রাখতে না পেরে হো হো করে হেসে ফেলায় নিরঞ্জন বাবু মুখ গোমড়া করে চলে গেলন ।


রাতে ঘুম আসছে না বিশালের । ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো । আকাশে এক ফালি চাঁদ আর বেশ কয়েকটা তারা মিটিমিটি করে জ্বলছে । হঠাৎই মনে পড়ে গেল নিরঞ্জন বাবুর কথা । ওনার গোবেচারা মুখখানা দেখতে বেশ লাগছিল - ভাবতেই ঠোঁটের কোনায় হাসি ফুটে এল তার । পরমুহূর্তেই মনে পড়লো প্রফেসর বৌদির কথাখানা "পরনির্ভরশীলতা" । সত্যি বৌদি কিন্তু কথাটা মন্দ বলেননি । আমরা স্বনির্ভর হতে হতে এতটাই এগিয়ে গিয়েছি যে , পরনির্ভরশীল হতেই ভুলে গেছি । আর তার ফলাফল বিচ্ছেদ । জন্ম নিচ্ছে ইগোর । সহ্য ক্ষমতা ক্রমশ লুপ্তের পথে । 'কিসে কম আমি' , ' আমি সব পারি' - কথাগুলো মাথা চাড়া দিচ্ছে । 

অবশেষে পকেট থেকে ফোনটা বার করে ফোন করল তিন্নিকে । 

তিন্নি - "কি হয়েছে ? ফোন করলে কেন" ? 

বিশাল - "কেন ফোন করতে পারি না" ?

তিন্নি  - "ভনিতা না করে কি বলবে বলো ? আমার ঘুম পাচ্ছে " । 

বিশাল - "কাল আমার চেকআপ আছে" । 

তিন্নি  - "তো আমি কি করবো" ?

বিশাল - "প্রেসক্রিপশনটা খুঁজে পাচ্ছি না"।

তিন্নি  - "সেটা তো তুমি রেখেছিলে "।

বিশাল - "রেখেছিলাম , কিন্তু এখন খুঁজে পাচ্ছি না" । তিন্নি  - "আলমারিতে আছে ভালো করে দেখো"।

বিশাল - " না নেই তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি , তবুও পাচ্ছিনা" । 

তিন্নি  - " কেন ? খুঁজে পাচ্ছ না কেন ? তুমি তো সব একা করতে পারো ! আমাকে নাকি তোমার দরকার নেই ....

প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিয়ে বিশাল তিন্নির কথাগুলো শুনতে শুনতে হাসছে আর ভাবছে সে তো তুমিও বলেছিলে । দাঁড়াও তুমি ফেরো , তারপর কি করে শেখাই তোমায় 'পরনির্ভরশীলতা' । মানে বিশাল 'নির্ভরশীলতা' ‌।

ওপার থেকে তিন্নি চেঁচিয়ে যাচ্ছে - "কি হলোটা কি ? কথা বলছো না কেন" ? 

বিশাল - "কাল সকালে চলে এসো" ।

তিন্নি  - "না আমি আসছি না । ভালো করে দেখো পেয়ে যাবে"।

 বিশাল - "পেয়ে তো যাবো কিন্তু হসপিটালে যাব কি করে ? কে নিয়ে যাবে ? পা-টাতে আবার ব্যথা পেয়েছি যে । একেতো ভাঙা পা ,তার ওপর আবার চোট  ...

তিন্নি ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল - "কি করে লাগলো ? চোখদুটো কি গেছে ? সাবধানে চলাফেরা করতে পারো নাকি ...

বিশাল স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল ...


#পরনির্ভরশীলতা

#রূপবালা_সিংহ_রায়...🖋️





সাঁঝবাতির রূপকথায় - Rupbala Singha Roy

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।