কদর - রূপবালা সিংহ রায় // সেরা নতুন বাংলা গল্প // নতুন বাংলা গল্প // মন ভালো করা বাংলা গল্প // মন ভালো করার গল্প।


কদর

রূপবালা সিংহ রায় 


 "শুভ জন্মদিন সৌনক" - গোটা গোটা অক্ষরে লেখা হাতের লেখাটা চিনতে ভুল হল না সৌনকের। বড়ো চেনা যে এই হাতের লেখাটা। কিছুতেই ভুল হতে পারে না তার। ক্লাস এইটে প্রথম পরিচয় হয়েছিল এই হাতের লেখাটার সঙ্গে। বাবার কাজের সূত্রে কলকাতায় পোস্টিং হওয়ার পর ভুবেনশ্বর থেকে এখানে আসা তার। তারপর ভর্তি হওয়া কলকাতার নামকরা এক স্কুলে। ও যখন ভর্তি হলো তখন ইতিমধ্যে সেশনের সাড়ে তিন মাস পেরিয়ে গেছে। আর মাস দেড়েক পর  হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষা। অর্ধেকের বেশি সিলেবাস শেষ। তখন মাথায় হাত সৌনকের। একে নতুন স্কুল, নতুন পরিবেশ তার ওপর এখানকার কেউ আগের পড়া ঠিকঠাক দিতেই চায় না। কি করে পাশ করবে সে? যেখানে ভুবনেশ্বরে যে স্কুলে পড়তো সেখানে সে প্রতি বছর প্রথম হতো। শেষমেশ তার মা গিয়ে কথা বলেন ক্লাস টিচারের সঙ্গে। তারপর ম্যাম পুরো বিষয়টা জানতে পেরে পৃথাকেই বলেন সৌনককে আগের পড়াগুলো দিয়ে সাহায্য করার জন্য। যদিও পৃথা হাবে ভাবে বুঝিয়ে দিত সে দিতে নারাজ তবুও বাধ্য হচ্ছে দিতে। এমনি করে দিন যেতে যেতে দুজনের মধ্যে একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়। তারপর তা পরিণত হয় ভালোবাসায়। সবই ঠিকঠাক চলছিল কিন্তু হঠাৎ করে ক্লাস ইলেভেনে পড়ার সময় একটা অ্যাক্সিডেন্টে পৃথার বাবা মারা যান। তার মায়ের পক্ষে সংসার চালিয়ে বেসরকারি স্কুলের অতিরিক্ত বেতন জোগাড় করা দায় হয়ে পড়ে। তাই বাধ্য হয়ে স্কুল ছাড়তে হয় তাকে। পরে যদিও একটা সরকারি বাংলা মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি হয়েছিল ও। কিন্তু টেনে উঠতে পারেনি। ইংরেজি মাধ্যমে এতগুলো বছর পড়ার পর এক ঝটকা সমস্ত বিষয় বাংলাতে পড়া তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। তবুও বহু কষ্টে উচ্চমাধ্যমিকটা দেওয়ার পর রেজাল্ট তেমন ভালো না হওয়ায় বাধ্য হয়ে পড়াশোনাটা ছেড়ে দেয় সে। তারপর বাড়িতে ছোট ছোট বাচ্চাদের আঁকা শিখিয়ে মাকে সাহায্য করতে থাকে আর অপেক্ষা করতে থাকে সৌনকের নিজে পায়ে দাঁড়ানোর জন্য। 


বেশ ছিল তখনকার দিনগুলো। মনে পড়তে সৌনকের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো এক ফালি হাসি। সারা সপ্তাহ কলেজ শেষে শনিবার বিকেলে দেখা করত ওরা। পাড়ার কেষ্টদার দোকানে চা খেত সৌনক আর তার পাশে বসা ফুচকা কাকুটার কাছ থেকে ফুচকা খেত পৃথা। পৃথা দিত চায়ের দাম আর সৌনক ফুচকার। এমনি করে নানান ঘাত-প্রতিঘাত ভালোলাগা-মন্দলাগা, মিলন-বিরহ, সুখ-দুঃখ পেরিয়ে একদিন ওদের চার হাত এক হয়। বেশ কাটছিলো তাদের সংসার। পৃথা প্রথম দিন থেকে পাকা গৃহিনীর মতো সংসারের হালখানা ধরেছিল। হয়তো বাবা মারা যাওয়ার পর অভাবের সংসার কিভাবে চালাতে হয় বেশ ভালো করে শিখে গিয়েছিল সে তার মায়ের কাছ থেকেই। বেশি অপচয় পছন্দ করত না সে। শপিংয়ে গেলে বেছে বেছে কম দামের জিনিসগুলোই কিনত। প্রথম প্রথম খুব খারাপ লাগলেও পরে তা বিরক্তির কারণ হয়ে উঠেছিল সৌনকের কাছে। না থাকতে ওসব করতো ঠিক আছে কিন্তু থাকতে ওসব করা এক্কেবারে ঠিক লাগেনা তার কাছে। কিন্তু পৃথার এই গুণটা সৌনকের ভালো না লাগলেও ওর মা বাবার মন জয় করে নিয়েছিল। তারাও তো একসময় প্রায় শূন্য থেকে উঠে এসেছেন তাই এমন লক্ষী মন্ত সঞ্চয়ী বৌমা পেয়ে বেশ খুশি তাঁরা। 


বাধ সাধল সেদিন যেদিন সৌনকের মুখ ফসকে বেরিয়ে পড়েছিল সেই কথাটা - "নিজে তো কিছু ইনকাম করো না। সারাদিন বাড়ি বসে থাকো। আমার রক্ত জল করা উপার্জনের টাকা আমার জন্য খরচ করতে এত গায়ে লাগে তোমার! কি করবে অত টাকা নিয়ে শুনি? পুরো মাসের মাইনেটা তো তোমার হাতেই তুলে দিই। হিসাবও চাইনা। আমার মা-বাবাও সেসব দেখতে যায় না। সংসারটা এখনো পর্যন্ত বাবা চালায়। টাকাগুলো নিয়ে কি করছো? তোমার মাকে দিচ্ছ?" বেশ খানিকক্ষণ থ হয়ে সৌনকের দিয়ে তাকিয়ে থাকার পর একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে নিচে গিয়ে সবার জন্য খাবার সাজিয়েছিল পৃথা খাবার টেবিলে। খাওয়া-দাওয়া শেষে রোজকার মতো রান্নাঘর গুছিয়ে গিয়েছিল নিজের ঘরে। সৌনক ঘুমানোর ভান করে শুয়েছিল অন্যদিকে ফিরে। তখন তার মধ্যে রাগ কাজ করছিল। ভাবছিল - বিয়ের পর প্রথম জন্মদিন আমার ওর সঙ্গে। কোনো উৎফুল্লতা নেই ওর মধ্যে! গত বছর পর্যন্ত মা-বাপীর সঙ্গে রেস্টুরেন্টে গিয়েছি ডিনার করতে। আর ও কি করল বাড়িতে বিরিয়ানি আর পায়েস বানালো! কি ক্ষতি হতো বাইরে খেতে গেলে। খরচের ভয়ে বাইরে যাওয়াটাও এড়িয়ে গেল। এইতো সেদিন অফিস কলিগ মৃগাঙ্কদার জন্মদিন গেল। ওর ওয়াইফ ওকে গোল্ড ব্রেসলেট গিফট করেছে। বৌদিও তো হাউজওয়াইফ মৃগাঙ্কদার টাকাতেই উপহারটা কিনে দিয়েছে। এমনও তো কিছু একটা দিতে পারতো আমায়। কি করলো? একটা সাদা পাঞ্জাবিতে কটা কল্কা এঁকে দিয়েছে। গিফটের কি ছিরি! ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখ দুটো বুজে এসেছিল টেরই পায়নি সে। ঘুম ভেঙে ঘড়ির দিকে তাকাতে দেখলো নটা বাজে। তড়িঘড়ি নিচে নেমে দুটো মুখে গুঁজে দৌড়েছিল অফিস। সারা দিনে একবারও কথা হয়নি পৃথার সঙ্গে। প্রত্যেকদিন দুপুরবেলা নিয়ম করে ফোন করে পৃথা তাকে কিন্তু সেদিন করেনি। সৌনকেরও করা হয়নি কাজের চাপে আর কিছুটা অভিমানে। সন্ধ্যেতে বাড়ি ফিরে সারা ঘরময় খুঁজে পাওয়া যায়নি তাকে। মা বাপীও বলতে পারিনি ও কখন বেরিয়ে গেছে। তারপর হতাশ হয়ে নিজের ঘরে গিয়ে দেখতে পায় বিছানার ওপর পড়ে আছে একটা হিসাবের ডায়েরি আর একটা ব্যাংকের পাসবুক। নিজের ভুলটা বুঝতে পেরে ফোন করে সৌনক। বলে তাকে ফেরার কথা। কিন্তু সে নারাজ হয়। এক পর্যায়ে সৌনকের ইগোটাও বেড়ে যায়। ভাবে থাক ও ওর আত্মসম্মান নিয়ে। কিসের এত জেদ ওর?


 

আজ প্রায় তিন বছর অতিক্রান্ত। কালের নিয়মের পৃথা অনেকটা ঝাপসা হয়ে গেছে সৌনকের হৃদয় থেকে। এখন তার হৃদয়ে বাস করে তারই অফিস কলিগ সিঞ্চিনি। যেমন স্মার্ট তেমন ওপেন মাইন্ডেড। এক্কেবারে সৌনকের মনের মত। এটাও সিঞ্চিনির সঙ্গে প্রথম জন্মদিন পালন সৌনকের। সৌনকের তো নিজেরই মনে ছিল না তার জন্মদিন টার কথা। পৃথা চলে যাওয়ার পর গত দুবছরের জন্মদিনটা ইচ্ছা করে ভুলে যেতে চেয়েছিল সে।  তার সত্ত্বেও বারে বারে তা মনের কোঠোরে উঁকি দিয়ে তার জীবনটা দূর্বিষহ করে তুলেছিল। কিন্তু সপ্তাহখানেক আগে সিঞ্চিনি জন্মদিনটা মনে করিয়ে দেওয়ায় বেশ উৎসাহিত সৌনক। হ্যাঁ মনে পড়ছে পৃথার কথা তবে দুঃখ পাওয়ার জন্য নয়, সিঞ্চিনির সঙ্গে তাকে তুলনা করার জন্য। আজকের এই সারপ্রাইজ গিফটটার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছিল সে। যতবার জিজ্ঞাসা করেছে তাকে ততবার ঘুরিয়েছে সে। কথার ফাঁদে ফেলে বোকা বানিয়েছে।  শেষমেষ পাঞ্জাবিটা হাতে পেয়ে চক্ষু চড়কগাছ সৌনকের।


পাঞ্জাবিটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সিঞ্চিনি বলে উঠলো - "কি হলো সৌনক পাঞ্জাবীটা তোমার পছন্দ হয়নি? কি সুন্দর না পাঞ্জাবিটা। সত্যি পৃথার হাতে জাদু আছে। ওর কাজ দেখলে চোখদুটো জুড়িয়ে যায়। জানো তো, ও আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড। মেয়েটা জিরো থেকে শুরু করেছে। প্রথমে অনলাইনে এটা শুরু করে তারপর আস্তে আস্তে দাঁড়িয়ে যায়। জানো ওর দুটো অফলাইন শপও আছে। যেখানে না হলে পঁচিশটা মেয়ে কাজ করে। ওর হাতে তৈরি জিনিস পাড়ি দেয় বিদেশেও। তাছাড়াও ও অনেক মেয়েকে শেখাচ্ছে এই কাজগুলো। যাতে তারা দু-পয়সা ইনকাম করে স্বাবলম্বী হতে পারে। শুধু একটাই দুঃখ জানো ওর ভালোবাসার মানুষটা ওকে বুঝলো না। ওর কদর করল না। আমি চাই ও ওর মনের মত কাউকে খুঁজে পাক যে ওকে বুঝবে ওর কাজের কদর করবে"। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ছল ছল চোখে সৌনকও বলল - "আমিও তাই চাই সিঞ্চিনি। আমিও তাই চাই....


#কদর

কলমে : রূপবালা_সিংহ_রায়


bengalistory,banglagolpo

সাঁঝবাতির রূপকথায় - Rupbala Singha Roy

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।