প্রত্যাবর্তন - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // নতুন বাংলা গল্প।
প্রত্যাবর্তন
রূপবালা সিংহ রায়
"তোরা কি থাকবি , নাকি যাবি ? থাকলে থাক আর গেলে সকাল সকাল যা । বেশি রাত করার দরকার নেই" । নাতনি মিমিকে কোলে নিয়ে নিখিলেশ বাবু কথাগুলো বললেন তাঁর মেয়ে পূজাকে । মায়ের সাথে বসে গল্প করছিল পূজা । বাবার কথাগুলো শুনে একটু রাগ হলো তার - "এই বাবার এক দোষ । যে ক'বারই পূজা মেয়েকে নিয়ে একা আসে , যাওয়ার দিন সকাল গড়িয়ে দুপুর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাবা তাড়া দিতে থাকে তাড়াতাড়ি বের হওয়ার জন্য । আজকাল না হয় একটু তাড়াতাড়িই সন্ধ্যে হয়। তো কি হবে একটু সন্ধ্যে হয়ে গেলে ? আমি তো মাঝে মধ্যে মেয়েকে নিয়ে সন্ধ্যের পরে একা একা বের হই বাড়ি থেকে প্রয়োজনে । কই তখন তো কিছু হয় না।" সে ভেবেছিল চারটে কুড়ি ট্রেনটা ধরবে ছটার মধ্যে বাড়ি পৌঁছে যাবে । কিন্তু না বাবা তো তা শুনবে না তার হুকুম তোমায় তিনটে দশের ট্রেনটা ধরতে হবে। "খাওয়ার পরে একটু বসতেও দেবে না"- বলে নিজের আর মেয়ের জামা কাপড় গোছাতে শুরু করলো পূজা।
শেষমেষ তৈরি হয়ে বের হল সে । বিয়ের পর থেকে প্রত্যেকবারই পূজা শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার সময় তার মায়ের মুখটা ভার হয়ে যায় । ছল ছল করে তাঁর চোখ দুটো । তারপর যখন ও স্টেশনে যাওয়ার জন্য টোটোতে ওঠে তখন মায়ের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে । জীবনে কখনো জল দেখেনি সে বাবার চোখে । এমন কি বিয়ের সময়ও না ? আজ বের হওয়ার সময় যখন সে বাবাকে জড়িয়ে ধরল বিদায় নেওয়ার জন্য বাবা কেমন যেন ফোঁপাতে লাগলেন । বাবার মুখের দিকে চেয়ে দেখলো তাঁর চোখে জল । বিয়ের পর প্রথম প্রথম এবাড়ি থেকে ও বাড়িতে যাওয়ার সময় পূজার চোখ দুটোতেও জল চলে আসতো । কিন্তু এখন আর আসে না । মানিয়ে নিয়েছে সে নিজেকে । কিন্তু আজ বাবা-মা দুজনের চোখে জল দেখে থেমে থাকতে পারল না সে । তার চোখ থেকেও জলের ধারা নেমে এলো । বাবাকে ছেড়ে মাকে জড়িয়ে ধরে চোখের জলটা মায়ের শাড়িতে মুছে দুজনকে বোঝাতে শুরু করলো - "আচ্ছা আমি কি আজ নতুন যাচ্ছি ? তোমরা যদি চাও আমি থেকে যাই । থাক অমিত (পূজার স্বামী ) ওর বাড়িতে একা । না হলে বলো মিমিকে পাঠিয়ে দিই ওর বাবার কাছে । যার মেয়ে তার কাছে থাক। আর তোমাদের মেয়ে থাকুক তোমাদের কাছে " । কথাটা শুনে বাবা ছল ছল চোখে মুচকি হেসে মেয়ে আর নাতনিকে বসিয়ে দিলেন টোটোতে । আগে বাবাই ট্রেনে তুলে দিয়ে আসতেন । কিন্তু পূজা এখন বারণ করে। মিমি অনেকটাই বড় হয়েছে । ও নিজেই এখন পূজার হাত ধরে উঠে পড়ে । তাছাড়া বাবা আবার একা একা এতটা পথ আসবে ভালো লাগেনা পূজার । তাই একাই চলে যায় । টোটোতে উঠে চেয়ে থাকে পূজা বাবা-মার দিকে । বাড়ির মধ্যে যায়নি ওরা । দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার ওপর। প্রত্যেকবারের মতো যতদূর পর্যন্ত দেখতে পায় দেখতে থাকে মা-বাবাকে । বাবা-মাও দেখেন তাঁদের মেয়েকে । বিয়ের পর প্রথমবার যখন সে মা-বাবাকে ছেড়ে গিয়েছিল ঠিক সেই রকমই কষ্ট হচ্ছে তার । বেশি কষ্ট হচ্ছে বাবার জন্য। যে বাবা এতটা শক্ত । সব সময় মা আর ওকে সামলেছেন । সেই বাবার চোখে আজ জল । বয়স বাড়ার কারণে শরীরের সাথে সাথে মানুষের মনটাও বোধহয় দুর্বল হয়ে পড়ে । চোখ থেকে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে পূজার । তারপরে মিমিকে শক্ত করে ধরে বসে সে ।
টোটো থেকে নেমে ট্রেনে চাপে সে । নানান লোকজনের নানান কাণ্ডকারখানা দেখতে দেখতে মাথা থেকে উধাও হয়ে যায় মা-বাবার চিন্তা । তারপর ট্রেন থেকে নেমে রিক্সা করে পৌঁছায় বাড়িতে। এদিকে সেই দুটো মানুষ হাঁসফাঁস করছে সেই বেলা আড়াইটা থেকে । সন্ধ্যা হতে চলল । মেয়েটা ঠিকঠাক পৌঁছল তো ? নিখিলেশ বাবু একবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছেন । একবার ফোনটাকে হাতে তুলে কল লিস্টে যাচ্ছেন। আবার কি মনে করে রেখে দিচ্ছেন । ঘড়ির কাঁটা পাঁচটা ছোঁয়া মাত্রই তিনি ফোন করলেন মেয়েকে । ফোন তুলে পূজা জানালো - " হ্যাঁ বাবা পৌঁছে গেছি । চিন্তা করো না । আসতে কোন অসুবিধা হয়নি । তোমরা কি করছো " ? তার প্রশ্নের উত্তরটা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য মা পাশ থেকে বললেন - " তাড়াতাড়ি দুটো রান্না বসিয়ে দে। তারপর তাড়াতাড়ি খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়। ধকল তো কম হলো না । দেরি হলে দিদিভাই আবার না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বে"। ঠিক আছে বলে পূজা ফোনটা রেখে রান্না ঘরের দিকে গেল।
রাতের খাওয়া শেষ । অমিত ল্যাপটপে বসে অফিসের কিছু কাজ করছে । পূজা মেয়েকে নিয়ে গেল ঘুমাতে। মিমি ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু ঘুম আসছে না পূজার বারবার মা-বাবার কথা মনে পড়ছে। আজ এত বছর পরও ওরা কষ্ট পায় আমার জন্য ঠিক আগের মতই ! আজও মিস করে আমাকে । আচ্ছা এই যে মিমিকে ছেড়ে আমি এক মুহূর্তও থাকতে পারি না , ওর বিয়ে হয়ে গেলে কি করে থাকবো ? এমন সময় অমিত এল ঘুমাতে । পূজাকে জাগতে দেখে বলল - "কি গো এখনো ঘুমাওনি ? ট্রেন জার্নি করলে তোমার তো প্রচন্ড ঘুম পায় । কি হলো আজ "। পূজা ওর মনের কথাগুলো বলল অমিতকে । অমিত একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে পূজাকে বুকে টেনে নিয়ে ওর মাথায় হাত বুলাতে লাগলো । কিছুক্ষণ পর ঘুমিয়ে পড়ল পূজা । কিন্তু ঘুম নেই অমিতের চোখে । সত্যি তো মিমি যখন পরের বাড়ি যাবে তখন আমার আর পূজার অবস্থা ও বাড়ির মা-বাবার মতই হবে। কি করে বাঁচবো আমরা মিমিকে ছাড়া । ভাবতেই মনে পড়ে গেল সেদিনের কথা - "বিয়ের পরের দিন বিদায়ের সময় পাগলের মত চিৎকার করতে করতে কাঁদছিল পূজা। কাঁদছিল ওর মা-বাবা , আত্মীয় - স্বজনরাও। তবুও আমি পূজাকে নিয়ে চলে এসেছিলাম ও বাড়ি থেকে । অমনি করে কেউ এসে আমাদের কাঁদিয়ে দিয়ে মিমিকে তুলে নিয়ে যাবে । সন্তান দূরে থাকার যন্ত্রণা আমাকেও কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে। মিস করবো মিমিকে । যখন ইচ্ছা তখন দেখতে পাবো না ওকে। হ্যাঁ সেদিনই তো সবেমাত্র দুমাস খানিক বিয়ে হয়েছিল আমাদের । এক সপ্তাহ আগে ও বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসেছিলাম আমি আর পূজা। সেদিন মাঘী পূর্ণিমা ছিল । পূজা ও বাড়িতে যেতে চেয়েছিল। ওদের বাড়িতে বড়ো করে লক্ষ্মী নারায়ণ পূজো হয়। নিশ্চয়ই ওর বাবা-মাও আশা করেছিলেন মেয়ের পথ চেয়ে। আমার কাছ থেকে সম্মতি পেয়ে মায়ের কাছে জিজ্ঞাসা করতে গিয়েছিল ও । মা না করে দিয়েছিল । বলেছিল অত ঘনঘন বাপের বাড়ি যাওয়ার কি আছে ? মায়ের কথা শুনে পূজা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল অপলকে ... আমি কোনো কথা বলতে পারিনি মায়ের উপর । সত্যি সেদিন চুপ করে থাকা উচিত হয়নি আমার । মাকে বোঝাতে তো পারতাম ? আচ্ছা শুনেছি সময়ের চক্র নাকি বৃত্তাকারে ঘোরে । এমনটা হবে না তো আমার মিমির সাথে" ? কেমন যেন অজানা আশঙ্কায় চোখ দুটো জলে ভরে উঠলো অমিতের .....
#প্রত্যাবর্তন
#রূপবালা_সিংহ_রায়_🖋️©️
banglagolpo ,bengalistory ,বাংলাগল্প
সাঁঝবাতির রূপকথায় - Rupbala Singha Roy
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন