উজান স্রোতে - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // নতুন বাংলা গল্প।

 

উজান স্রোতে

রূপবালা সিংহ রায়


-- ছাড়ো! ছাড়ো বলছি আমার হাত। লাগছে তো! 


-- লাগছে, না? লাগুক। খুব শখ তো তোর নিজেকে কষ্ট দেওয়ার! এটুকুতেই এত লাগছে! তাহলে ভাব অত যন্ত্রণা সহ্য করতিস কি করে? সাহস তো কম নয় তোর? কি করে এত সাহস হয় তোদের? নিজেকে শেষ করার আগে একবারও ভাবলি না! তুই চলে যাওয়ার পর তোর মা বাবার কি হবে?


-- কি হবে আবার? বেঁচে যাবে। আমার মত একটা বোঝা ওদের মাথা থেকে নেমে যাবে। 


কথাটা শেষ না হতে হতেই গায়ের শক্তি ভরে সপাট জোরে একটা চড় এসে পড়ে বিশাখার গালে। গালের পাশটা প্রচন্ড জ্বালা করতে থাকে তার। সেইসঙ্গে কানটা বোঁ বোঁ করতে থাকে। কানে এমন ভাবে তালা ধরে যায় যে পাশ থেকে দ্রুত গতিতে চলে যাওয়া ট্রেনেটার আওয়াজ পর্যন্ত তার কানে পৌঁছায় না তার। 


গালের দাগটা মিশে গেলেও হাতে থাকা পাঁচটা নখের আঁচড় আজও স্পষ্ট। সেই দিনটার কথা মনে পড়লে নিজেকে নিজের কাছে বড় ছোট মনে হয় বিশাখার। সেদিন যদি বিভা দি তাকে না বাঁচাতো, আজ তাকে আর এই বিশাখা হয়ে ওঠা হত না। সে জানতেই পারতো না যে বাঁচার থেকে বড়ো আনন্দের জিনিস এই পৃথিবীতে আর কিছুই নেই। এই যে বেঁচে আছি, এটাই তো অনেক। থাক না অভাব, মন খারাপ, কষ্ট, দুঃখ, কান্না, রাগ, অভিমান। থাক না একাকীত্ব, থাক না শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, থাক না হাজার অসুখ। জীবন আছে মানে এরা তো থাকবেই। জড় বস্তুদের কি আর ওসব থাকে? থাকে না....

 জানা হতো না মা-বাবার ভালোবাসার কথা। মা-বাবার কাছে আমি যে কতখানি, সেটা অজানাই থেকে যেত। রাগের বসে তাদের বলা কথাগুলোর অর্থ না বুঝেই ভুলভাল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে ছিলাম সেদিন। তারাও তো দুশ্চিন্তায় ছিল আমাকে নিয়ে। তার ওপর আমি যেভাবে ভেঙে পড়েছিলাম ওরা বলতে বাধ্য হয়েছিল - "মরলেই যদি বেঁচে যাস তবে মর গিয়ে"। তার আগে পরে বোঝানো হাজার কথাগুলো কানে ঢোকেনি আমার। ঢুকে ছিল শুধু ওই কথা খানা। তাই বেরিয়ে পড়েছিলাম বাড়ি থেকে। আর কেনই বা বের হবো না? কি করতাম তখন আমি আমার অমন জীবন নিয়ে? কি করতাম আমি আমার এমন মুখশ্রী নিয়ে? নিজের যে মুখ দেখলে নিজেই আঁতকে উঠছিলাম, অন্যে তো চোখ ফিরিয়ে নেবেই। আমার যে রূপ দেখে পাড়ার কাকিমা জেঠিমারা মাকে বলতো তোমার মেয়ে যা দেখতে, দেখো কোনো রাজপুত্রই আসবে ঘোড়ায় চেপে নিয়ে যেতে। তারাই তখন নানান কথা বলতে শুরু করল। কেউ অপরাধীর অপরাধ দেখেনা। অপরাধ দেখে অপরাধ ভোগ কারীর। কেউ কেউ তো বলল - "কি এমন ক্ষতি হতো তোর বিশাখা কেষ্টার কথায় রাজি হলে? তাহলে এমন দিন তো আর আসতো না তোর জীবনে"।


বেশ কয়েকদিন ধরেই কেষ্টা প্রপোজ করছিল বিশাখাকে। নাকজ করছিল বিশাখা। শেষমেশ সে যায় বিশাখার মা-বাবার কাছে। মা বাবা হয়ে কিভাবে পাড়ার বখাটে গুণ্ডার হাতে তুলে দেবেন তাঁরা তাঁদের মেয়েকে? তাই তাকে না করে দিয়ে শুরু করে পাত্র দেখা। অন্যত্র মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য। খবরটা যায় কেষ্টার কানে। সেদিন রাত আটটা নাগাদ নাচের পারফরমেন্স থেকে ফেরার পথে আচমকা কেউ তার সামনে এসে এক বোতল অ্যাসিড ছুড়ে মারে। তার মুখ না দেখতে পারলেও কানে ভেসে আসে একটা কন্ঠস্বর - "তুই যখন কেষ্টার হবি না, অন্য কারোও হতে পারবি না"। তখন থেকে শুরু হয় তার বাঁচার লড়াই। লড়াই করতে করতে এক পর্যায়ে হার মেনে সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলেছিল সে।


 বিয়েটাই যে মেয়েদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয় সেটাই সে ভুলে গিয়েছিল। ভুলে গিয়েছিল বাঁচার জন্য একজন সঙ্গী লাগে ঠিকই কিন্তু সে যে স্বামী হতে হবে তার কি কোনো মানে আছে? যে কেউই হতে পারে বাঁচার অবলম্বন। হতে পারে যে কোনো কিছুও। হতে পারে নিজের মধ্যে থাকা কোনো প্রতিভা কিংবা হতে পারা যায় নিজেই নিজের সঙ্গী। বাঁচতে গেলে সুস্থ-অসুস্থ, ভালো-মন্দ, ধনী-গরিব, সুশ্রী-কুশ্রী, বিবাহিত-অবিবাহিত সবাইকে যে লড়াই করতে হয়। সে কথাই বুঝিয়েছিল বিভাদিদি। বয়স বেশি নয় তার। বিশাখার থেকে আট-নয় বছরের বড় হবে। সুন্দরী-শিক্ষিতা-চাকরিজীবী হওয়া সত্বেও একা একা বাঁচতে ভীষণ ভালোবাসে সে। একা বাঁচলে কাছের মানুষদেরর থেকে প্রতারিত হওয়ার ভয় নাকি খুব কম থাকে। তার জীবনের দুটো গল্প তাকে বাধ্য করেছে একা থাকতে। প্রথম গল্পটা ছিল কলেজ বেলাকার। সময়ের নিয়ম অনুযায়ী সেও পড়েছিল প্রেমে। ঘুরতে যাবার অজুহাতে প্রেমিক ছেলেটা তার হাত ধরে একদিন ঢুকে ছিল নির্জন পার্কে। আশেপাশের কাজকর্ম দেখে চলে আসতে চাইলে ছেলেটা তাকে আশ্বস্ত করে। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার রূপ বদলে যায়। কোনো রকমে নিজেকে বাঁচিয়ে দৌড়ে পালিয়ে আসে সেখান থেকে সে। তারপর প্রেম নামক শব্দটা তার কাছে ঘৃণার বস্তু হয়ে ওঠে। পড়াশোনা শেষে বিয়ে। বাবা-মা'ই দেখাশোনা করে দেন বিয়েটা। ভালোই চলছিল বেশ কয়েকদিন। তারপর আস্তে আস্তে সামনে আসতে থাকে তার স্বামীর আসল চেহারাটা, আসল চরিত্রটা। ছোট ছোট ভুল ভেবে ক্ষমা করে দিলেও যখন সামনে আসে তার আসল মতলব খানা, আর পেছন ফিরে তাকায়নি সে। অফিসের বস কেন বারবার বাড়িতে আসতেন বুঝতে বেশি দেরি হয়নি তার। একটা প্রমোশনের জন্য মানুষ যে এতটা নিচে নামতে পারে ভাবতে পারেনি সে! 


তখনও পর্যন্ত নিজে পায়ে দাঁড়ায়নি সে। মায়ের কথা মতো মানিয়ে নিতেও চায়নি সে। শুধু চেয়েছে নিজের মতো করে বাঁচতে। কিন্তু বাঁচার লড়াই যে সহজ নয়। তবুও দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে গেছে। হেরে যায়নি বিশাখার মত। বেছে নেয়নি বেঁচে যাওয়ার অন্য পথ। লড়াই করেছে, লড়াই করতে শিখেছে, লড়াই করতে শিখিয়েছে বিশাখার মত আরো সাত সাতটা মেয়েকে। শিখিয়েছে কিভাবে উজানেও ভেসে থাকা যায়.....


আজ বিশাখার বড় আনন্দের দিন। অনেক কষ্ট করার পর আজ তার হাসার দিন। ঠোঁটের থেকে চোখ দুটো যেন বেশি আনন্দিত আজ তার। আজ যে তার স্বপ্ন সফল হতে চলেছে। খুলতে চলেছে নাচের স্কুল। এটা তার ছোটবেলাকার স্বপ্ন -- তার পায়ের তালে তাল মিলিয়ে মাতাল করা সুরে বাজছে ঘুঙুর দুটো আর সেই শব্দে নাচছে তার সামনে থাকা অজস্র ছোট ছোট নতুন পা। যার ধ্বনি-তাল-ছন্দ আকাশে বাতাসে মিশে গিয়ে নাচাচ্ছে সমগ্র বিশ্বকে....


#উজান_স্রোতে

#রূপবালা_সিংহ_রায়...✍🏻



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।