মনের অন্তরালে - রূপবালা সিংহ রায়//বাংলা গল্প// বাংলা ছোট গল্প//ভালোবাসার গল্প।
মনের অন্তরালে
রূপবালা সিংহ রায়
একবার অপারেশনের পরও ঠিক হলো না কণ্ঠস্বরটা , ভাঙ্গা গলায় কথা বলে রমা । আবারো একবার নাকি অপারেশন করাতে হবে । কথাখানা শুনে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরল মনোতোষ বাবুর ! "আবারও অপারেশন করাবে ? বয়স তো কম হলো না বাষট্টিতে পড়লে এবার । সবাই বলে এই বয়সে নাকি অপারেশন থেকে দূরে থাকাই ভালো । তার ওপর সুগারটাও বাঁধিয়ে বসে আছো । কে শোনে কার কথা ? সারা জীবন শুধু অন্যের কথাই ভেবে গেলে । নিজের খেয়াল রাখোনি কখনো । ছেলে-মেয়ে ছেলে-মেয়ে করে করে , তাদের পেছনে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বারোটা বাজিয়েছো তো গলার । দেখছে তারা এখন ? আসে কবার তোমার খবর নিতে ? বাবা-মা মরলো না বাঁচলো রাখে তার খবর" ? ই.এন.টি থেকে বেরিয়ে মনোতোষ বাবু চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথাগুলো বলছেন তার স্ত্রী রমাকে । ভোকাল কর্ডে একটা ইনফেকশন হয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে তারপর ঠিকও হয়ে গিয়েছিল । মাস ছয়েক আগে হঠাৎ করে একদিন সকালবেলা গলা থেকে আর আওয়াজ বার হচ্ছিল না রমার । তারপর থেকে হসপিটাল আর বাড়ি করছে দুজন । ছেলে-মেয়ে ব্যস্ত তাদের নিজের নিজের জীবনে । বাবা-মাকে দেখার সময় নেই তাদের । একটা সরকারি চাকরি করতেন মনোতোষ বাবু । তা থেকে সংসার চালিয়ে যতটা পারতেন সঞ্চয় করতেন ভবিষ্যতের জন্য । আজ তিনি রিটায়ার্ড পারসন । সেখান থেকে চলছে দুজনের সংসার , চিকিৎসা ইত্যাদি যাবতীয় খরচ । তার ওপর আবার অপারেশন । টাকাটা না হয় এদিক ওদিক করে যোগাড় হয়ে যাবে । কিন্তু অপারেশন থিয়েটারে রমার যদি কিছু হয়ে যায় ? কি করে থাকবেন তাকে ছাড়া একা একা ? ভাবতেই সারা শরীর কাঁটা দিয়ে উঠছে মনোতোষ বাবুর। রমাকে অনেক বুঝিয়েছিলেন অপারেশন না করার জন্য । কিন্তু রমার সেই এক গোঁ। "এই ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় হাঁসের মতো কথা বলতে ইচ্ছা করে না আমার । গানটাও গাইতে পারি না" । মনোতোষ বাবুর মনে পড়ে গেল সেই দিনের কথা - প্রথমবার যখন তিনি রমাকে দেখতে গিয়েছিলেন তখন একটা গান শুনিয়েছিল সে । ওই গান শুনেই বিয়েতে সম্মতি জানিয়েছিলেন মনোতোষ বাবু । বেশ গান গায় রমা । হয়তো মঞ্চে গিয়ে গান গায়নি কোনোদিন । সেই সুযোগ হয়নি তার। তবুও রান্নাঘরে কাজ করতে করতে বা ঘরের কাজ করতে করতে যখন গান গাইতো রমা বারবার তার প্রেমে পড়তেন মনোতোষ বাবু । অগত্যা রমার জেদের কাছে হার মেনে আবার হসপিটালে আসা । এবার সুগারটা বেশ বেড়েছে। তাই অপারেশন করার আগে ই.এন.টি ডক্টর বাবুরা মেডিসিনে একবার দেখাতে বলেছেন।
দুজনে এসে বসলেন মেডিসিন-এর সামনে । প্রচুর ভিড় । বেলা সাড়ে এগারোটা বাজে তবুও ডাক্তার বাবুরা এখনো এসে পৌঁছায়নি । পাশে বসে থাকা রমার বয়সী একজন ভদ্রমহিলাকে মনোতোষ বাবু জিজ্ঞাসা করলেন -"ম্যাডাম এখানে ভালো ডাক্তার কে আছেন"? উনি উত্তর দিলেন -"এই ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র ডাক্তার হলেন ড: কুনাল সরকার । আমি তো ওনার আন্ডারেই আছি এই চার বছর । ওনার প্রাইভেট চেম্বারও আছে । ওনাকে দেখান ভালো হবে"। এইভাবে এগিয়ে চললো ঘড়ির কাঁটা । বেলা দুটো বাজে । জুনিয়র ডাক্তাররা রোগী দেখছেন । কুনাল সরকার এখনো আসেননি । ধৈর্যের সীমাটাও প্রায় শেষ । রমা বলল -"দরকার নেই ওনাকে দেখাবার। জুনিয়র ডাক্তারও তো কিছু বোঝেনা কি ? চলো এদের দেখিয়ে বাড়ি যাই" । খবরের কাগজ থেকে চোখটা তুলে খেটখিটে মেজাজে মনোতোষ বাবু বলে উঠলেন -"কেন বসে থাকতে অসুবিধা কোথায় তোমার? বাড়ি গিয়ে কি রাজকার্য করবে শুনি "? হসপিটাল চত্বরের সবাই প্রায় তাকিয়ে রইল রমা আর মনোতোষ বাবুর দিকে। কেউ কেউ মুচকি হাসছিল। তাই দেখে রমা চুপ হয়ে গেল । কিছুক্ষণ পর রমা আবারও বলে উঠলো -"যাওনা নার্সদিদিকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করো না ডাক্তারবাবু আসবেন কিনা ? তখন মনোতোষ বাবু খবরের কাগজ পড়া শেষ করে মোবাইলে খবর চালিয়ে কানের কাছে চেপে ধরে খবর শুনছিলেন । চারিদিকের আওয়াজে শুনতে পেলেন না রমার কথা। রমা পুনরায় কথাটা বলায় তিনি আবারও রেগে গিয়ে বললেন - "ডাক্তারবাবু না আসলে ওরাই আমাদের জানিয়ে দিত"। রমা দু-তিন সেকেন্ড চুপ করে থেকে পাশে বসে থাকা বছর চল্লিশের ভদ্রলোকের সাথে আবার কথা বলতে শুরু করল । ভদ্রলোক বললেন -"উনি কি বরাবরই এমন রেগে কথা বলেন । এমন খিটখিটে মানুষ" । রমা এক গাল হেসে আবার ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় মনোতোষ বাবুকে বললেন -"এই দেখো উনি তোমায় খিটখেটে মানুষ বলছে" । মনোতোষ বাবু মোবাইলটা রেখে দিয়ে একটা মুচকি হেসে বললেন - "ডাক্তার না তোমায় বেশি কথা বলতে বারণ করেছে । শোনো ডাক্তারের কথা ? বকর বকর করেই চলেছো । আর যদি সন্ধ্যেও হয়ে যায় যাবে , আমি তোমায় সিনিয়র ডাক্তারকেই দেখাবো । বসো চুপটি করে মুখে আঙুল দিয়ে "। তারপর ব্যাগ থেকে একটা চটি বই বার করে ধরিয়ে দিলেন রমার হাতে । রমা বই পড়তে শুরু করল । আর মনোতোষ বাবু রমার সাথে গল্প করা ভদ্রলোকের সাথে সুখ-দুঃখের কথা বলতে লাগলেন ....
#মনের_অন্তরালে
#রূপবালা_সিংহ_রায়....🖋️
সাঁঝবাতির রূপকথায় - Rupbala Singha Roy
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন