জয় জগন্নাথ - রূপবালা সিংহ রায় // নতুন বাংলা গল্প // Bengali Story ।

জয় জগন্নাথ 

রূপবালা সিংহ রায় 


জমিদারিটা এখন না থাকলেও জমিদার বাড়ির খ্যাতিটা এখনো বর্তমান আছে শাস্ত্রী বাড়িতে। বসন্ত বাবুকে দেখলেই বোঝা যায় তাঁর গায়ে জমিদার বংশের রক্তই বইছে। তাঁর পোশাক-আশাক, আচার-ব্যবহার, চাল-চলনে তা স্পষ্ট। সেইসঙ্গে রয়েছে প্রচুর অর্থ ও জমিজমা। যা দিয়ে তাঁর পরবর্তী তিন পুরুষ হামেশাই বসে খেতে পারে। জমিদারিটা চলে যাওয়ার পর তাঁর দাদামশাই একটা ব্যবসা শুরু করেন। তারপর বাবামশাই সেটা দেখভাল করেন । এখন তাঁর পালা। তবুও তো কম বছর হলো না একাই সামলাচ্ছেন সবটা । আজকাল আর শরীরটাও সাথ দেয় না। ছেলে নেই তাঁর যে সে ব্যবসাটার হাল ধরবে। এত বড় বাড়ি, এত জমিজমা, ব্যবসা তাঁর অবর্তমানে কে সামলাবে? সেই চিন্তায় রাতের ঘুম উধাও তাঁর। সন্তান বলতে রয়েছে একটা মেয়ে নাম ভার্গবী। তার আবার এসবের প্রতি আকর্ষণ খুব কম। সে এ বছর এম.এ. পরীক্ষা দিল। সে চায় চাকরি করতে। বারবার বলার সত্ত্বেও মেয়েকে বসাতে পারেননি ব্যবসার কাজে। তাঁর এবং তাঁর পূর্বপুরুষদের এত কষ্টের অর্জিত ধন সম্পদ হেলায় নষ্ট হতে দিতে চান না তিনি। তাই একজন যোগ্য পাত্র খুঁজছেন যে তাঁর মেয়ের সাথে সাথে বিষয়-আসয়েরও খেয়াল রাখবে। কিন্তু বর্তমান সমাজের যা অবস্থা একটা ভালো ছেলে খুঁজে পাওয়া ভীষণ মুশকিল। তারওপর আজকাল মেয়ের হাবভাব একদম ভালো লাগে না তাঁর। কেমন যেন উৎশৃংখল। গ্রামের ছন্নছাড়া মানুষদের সঙ্গে মেলামেশা করে। জাতপাত কিছু মানে না। ঘরের টাকা-পয়সা নিয়ে গিয়ে বিলিয়ে দেয় তাদের মধ্যে। এমন চলতে থাকলে তো একদিন পথে হবে তাঁদের। এই নিয়ে মতবিরোধ মেয়ের সঙ্গে। এখন কেবল জগন্নাথ দেবই ভরসা। দিনরাত তাঁকে ডেকে যাচ্ছেন। যাতে করে শেখরের ছেলেটা রাজি হয় বিয়েতে। শেখর তাঁর ছোটবেলাকার বন্ধু। সেই সঙ্গে সে তাঁর ব্যবসার অর্ধেক অংশীদারও। তাদেরও বেশ প্রতিপত্তি রয়েছে। তার ছেলে এখন বিদেশে থাকে। সেখানে পড়াশোনা করছে। শেখরের সঙ্গে এসব নিয়ে কথা হয়ে গেছে। এখন কেবল তার ছেলের দেশে আসার অপেক্ষা। একবার সে বিয়ের জন্য রাজি হয়ে গেলে বাজবে সানাই। সেই সঙ্গে তিনিও একটু স্বস্তি পাবেন। 


এদিকে আষাঢ় মাস পড়ে গেছে। আষাঢ় মানেই রথ। আর রথ মানে শাস্ত্রী বাড়িতে ধুন্ধুমার কান্ড। দূর দূরান্ত থেকে আসতে শুরু করেছে আত্মীয়-স্বজনেরা। মাঝেমধ্যে গ্রামের মান্যি-গন্যি মানুষেরা এসে খোঁজখবর নিয়ে যাচ্ছেন কাজ কত দূর এগালো জানতে। শাস্ত্রী মশাই নিজে দাঁড়িয়ে থেকে রথের কাঠামো থেকে শুরু করে জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রার নবকরলেবর স্থাপন পর্যন্ত সব কাজ ধরে ধরে করাচ্ছেন। রথ উপলক্ষে বসবে মেলাও সেদিটাও দেখতে হয় তাঁকেই। মেয়ের তো এসবের দিকে নজরই নেই। তার নজর সবসময় অন্যদিকে। গত বছর থেকে সে আবার দান খয়রাতি শুরু করেছে। রথ দেখতে আসা সমস্ত গরীব দুঃখীদের পাত পেড়ে খাওয়ায় সে। সে খাওয়াক অসুবিধা নেই কিন্তু ওইসব অচ্যুতদের নাকি রথের দড়ি টানতে দিতে হবে! কি আবদার! এ বছরও যদি সে অমন জেদ ধরে তাহলে তাকে আর আস্ত রাখবো না আনমনে ভাবতে থাকেন শাস্ত্রী মশাই। এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎই খুব রাগ হয় হরিচরণের উপর। বুড়োর এখনই শরীর খারাপ হতে হলো। বংশ-পরম্পরায় ওরাই এ বাড়ির রথ তৈরি করে আসছে। তাদের পূর্বপুরুষই নাকি সর্বপ্রথম রথের কাঠামো আর জগন্নাথ দেবের কলেবর তৈরি করেছিলেন। তাই অন্য কাউকে দিয়ে কাজটা করাতে মন চাইছিল না বসন্ত বাবুর। লোক পাঠিয়ে খবর দিয়েছিলেন কিন্তু হরিচরণের শরীরের যা অবস্থা ঠিক হতে কতদিন লাগবে তারও ঠিক নেই। হরিচরণ নাকি বলেছিল তার নাতি জগন্নাথকে কাজটা গিয়ে করে আসতে। কিন্তু জগন্নাথের ঘোর আপত্তি। নিজে যাওয়া তো দূরের কথা সে চায় না ঠাকুরদা শাস্ত্রী বাড়িতে গিয়ে কাজ করুক। যার হাতে জগন্নাথ দেব সাজলেন, যার তৈরি রথে চড়ে মাসির বাড়ি যাবেন রথের দিন সেই নাকি রথের দড়িতে হাত দিতে পারবে না! হাত দিলে নাকি বাবুদের জাত যাবে! হরিচরণ নাতিকে অনেক বুঝিয়েছেন --"সেই প্রথম দিন থেকেই এটা হয়ে আসছে এখানে আমরা অমান্য করার কে। রথের দড়ি নাইবা ছুলাম রথের চাকা থেকে শুরু করে পুরো রথটাই তো তৈরি আমাদের হাতে। রথের দিন জগন্নাথ দেবের নাইবা দর্শন পেলাম জগন্নাথ দেব আমাদের দেওয়া চক্ষু দিয়েই তো সমগ্র বিশ্বকে দেখেন"। তবুও জগন্নাথ ওসব মানতে রাজি নয়। সে বলে--" এখন কে বাছে অত জাত পাত। আর যারা জাতপাতের বড়াই করে থাকুক তারা তাদের জাত-পাত নিয়ে। যে জগন্নাথ দেব নিজে এসে স্বপ্নাদেশে বললেন আমাদের দিয়ে ঠাকুরের কাঠামো আর রথ বানাতে তাঁর ওপর এরা কথা বলে! তেমন হলে জগন্নাথ দেব কি বলতেন ওসব কথা? এবার তোমার জগন্নাথ দেবকে এর একটা বিহিত করতেই হবে। তা নাহলে আমি ভাববো তিনি নেই "-- এই বলে ফিরিয়ে দেয় বসন্ত বাবুর পাঠানো লোককে। 

তার মুখে জগন্নাথের বলা কথাগুলো শুনে মাথায় রক্ত চেপে যায় বসন্ত বাবুর। এমনিতেই জগন্নাথের উপর তাঁর রাগের শেষ নেই। লোকমুখে কথাগুলো শুনে বিশ্বাস না হলেও সেদিন যখন দেখলেন মেয়েকে জগন্নাথের সাইকেলের পেছনে বসতে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি তিনি। নিচু জাতের মানুষকে দান-দক্ষিণা দেওয়া পর্যন্ত ঠিক আছে কিন্তু তাদের সাথে বিয়ের মতো একটা সম্পর্ক মেনে নেওয়া যায় না। ইতিমধ্যে হাজির বন্ধুর ছেলে। সে বাইরে থেকে লোক নিয়ে আসে রথ বানানোর জন্য। রথের কাজ এগোচ্ছে পুরোদমে তাই দেখে বেশ খুশি শাস্ত্রি মশাই। মনে মনে নিশ্চিন্ত হলেন এই ভেবে একবার রথটা হয়ে গেলেই বিয়ের তোড়জোড় শুরু করবেন।


 

রথের দিন ভোররাত থেকে তুমুল বর্ষা। গ্রাম প্রায় ভেসে যায় যায়। এবার আর রথ বোধ হয় বড় রাস্তা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যাবে না মাসির বাড়ি তো দূরের কথা। চিন্তায় মাথায় হাত বসন্ত বাবুর। দেখতে দেখতে সকাল। ফোন এল তাঁর কাছে। সম্পূর্ণ নিঃস্ব তিনি। ম্যানেজার জানিয়েছে --" শেখর গোপনে পুরো ব্যবসাটা নিজের নামে করে নিয়েছে দিন পনেরো আগে। ছেলের সঙ্গে ভার্গবীর বিয়েটা দিচ্ছে নাকি বাকি সম্পত্তি গুলোর লোভে"। বসন্ত বাবু দৌড়ে গেলেন ঠাকুর দালানে জগন্নাথ দেবের কাছে। সামনের কাপড়টা সরাতেই দেখলেন ঠাকুরের দুচোখ ভেসে যাচ্ছে জলে তাঁর সঙ্গে গায়ের রং গুলো গলে গলে পড়ছে। তাকালেন রথের জায়গাটায় মুহূর্তের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা রথটা চাকা ভেঙে দুমড়ে মুচড়ে শুয়ে পড়ল মাটিতে। বাড়ির লোকজন সবাই হায়! হায়!করতে লাগলো। বয়স্করা বলতে লাগলেন -"সবই বসন্তের কৃতকর্মের ফল। কি দরকার ছিল ওর বাইরের লোককে দিয়ে কাজ করানোর। ও কি পারত না নিজে গিয়ে জগন্নাথের সঙ্গে কথা বলতে? সব হচ্ছে ওর অহংকারের ফল। নে সামলা এখন। রথের দিন রথ বের হবে না এ যে ঘোর অমঙ্গল!"


 বসন্ত বাবু দিশেহারা। কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। শেষমেশ মেয়ের কথা মতো তাকে নিয়ে ঝড়-বৃষ্টি মাথায় করে দৌড়ে গেলেন গ্রামের শেষ প্রান্তে থাকা জগন্নাথের বাড়ি, এত বছর বয়সেও যেখানে তিনি ভুলেও পা ফেলেননি । বাবামশাই -দাদামশাই থাকার সময় তিনি দেখেছিলেন রথের আগে তারা নিজেরা বায়না নিয়ে যেতেন জগন্নাথদের বাড়িতে। সেই সঙ্গে যেত অনেক ভেটও। বাবামশাই, দাদামশাইরা হাতজোড় করে তাদের বলে আসত। বন্ধুদের মুখ থেকে যখন কথাগুলো শুনতেন তখন খুব খারাপ লাগতো তাঁর। নিচু জাতের কাছে অত নিচু হওয়ার কি আছে। ওরা তো আর এমনি এমনি সব করছে না তার জন্য পারিশ্রমিক পাচ্ছে। যত্তসব! বাবা-মশায়ের পর যখন দায়িত্ব এলো তাঁর কাঁধে তখন থেকে তিনি লোক পাঠিয়ে দিতেন বলে আসার জন্য। কিন্তু আজ বিধির বিধানের কাছে নত শিকার হয়ে তাকে স্বয়ং আসতে হলো জগন্নাথের কাছে। হাতজোড় করে তাঁকে এই সংকটে থেকে মুক্ত করার কথা বললেন। তাই দেখে জগন্নাথ দ্রুত গেল ঠাকুরদালানে জগন্নাথ দেবের কাছে। তাঁকে প্রণাম জানিয়ে সব ঠিক করে দেওয়ার প্রার্থনা করে শুরু করলো নতুন করে ঠাকুরের রং করা। গ্রামবাসীরা হাতে হাতে সাহায্য করলো রথ মেরামতির কাজে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। ঝড় বৃষ্টি থেমে গিয়ে ঝলমলে পরিষ্কার আকাশ। সাজ সজ্জা প্রায় শেষ। জগন্নাথ দেব উঠে গেলেন রথে। সবাই প্রস্তুত রথের দড়ি ধরে। কেবল বাড়ির কর্তা বসন্ত বাবুর ছোঁয়া টুকু অপেক্ষা, রথ চলতে শুরু করবে। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তাঁর জন্য। চলছে খোঁজা-খুঁজিও। বাড়িময় তন্ন তন্ন করে খুঁজে পাওয়া গেল না তাঁকে। সবাই বেশ চিন্তিত বেশ কিছুক্ষণ পর তাঁকে দেখা গেল জগন্নাথের সঙ্গে। জগন্নাথের হাত ধরে তিনি ঢুকছেন বাড়ির মধ্যে। তারপর জগন্নাথের হাত আর মেয়ের হাত একসঙ্গে করে তাদের হাতে তুলে দিলেন রথের রশি। রথের চাকা গড়ালো সামনের দিকে। সবাই বলতে লাগলো -"জয় জগন্নাথ। জয় জগন্নাথ"।


#জয়_জগন্নাথ

#রূপবালা_সিংহ_রায়

সাঁঝবাতির রূপকথায় - Rupbala Singha Roy 


     জয় জগন্নাথ 

    কন্ঠে ও কলমে - রূপবালা সিংহ রায় 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।