সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য - রূপবালা সিংহ রায় // Bangla Golpo//Bengali Story// বাংলা গল্প।


সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য 

রূপবালা সিংহ রায় 


 অনুষ্ঠান বাড়ি থেকে ফেরার পথে গাড়ি থেকে ঋতুজার হঠাৎই চোখ পড়লো ঐত্রীর দিকে । সাইকেলের পেছনের সিটে বসে আছে সে । তার কোলে রয়েছে বছর আড়াইয়ের একটা মেয়ে । সাইকেল চালককে দেখে মনে হল ওর স্বামীই হবে । তারা কিছু নিয়ে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করছে । ঐত্রীর পরনে সাধারণ একটা কুর্তি ও প্লাজো আর ওর স্বামীও সাধারণ একটা টি শার্ট ও ট্রাক প্যান্ট পরে রয়েছে । ওদের পোশাক- আশাক , চাল-চলন দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় ওদের পরিবারটা কতটা সাধারণ । অপরদিকে ঋতুজার পায়ের জুতো থেকে শুরু করে মাথার ক্লিপ পর্যন্ত আভিজাত্যের মোড়কে জড়ানো । কলকাতার নামকরা এ্যাপার্টমেন্টে তাদের বাস । তিন তিনটে চার চাকার গাড়ি রয়েছে তাদের । বছরে দুবার বাইরে যায় ঘুরতে । বাড়িতে দুটো কাজের লোক আছে । যা তার কাছে অহংকারের বিষয়ও বটে । কোনো কিছু চাইবার আগেই তার সামনে হাজির হয় । নিজেকে সবচেয়ে সুখী বলে মনে হয় তার । ঐত্রীকে দেখতে দেখতে মনে পড়ে গেল সেদিনের কথা - আদি ঢাকেশ্বরী থেকে বেরোনোর সময় গড়িয়াহাটের মোড়ে দেখা হয়েছিল তার সাথে । ওর হাতে ছিল বেশ কয়েকটা প্লাস্টিকের ক্যারি ব্যাগ । তাতে ছিল ফুটের দোকান থেকে কেনা কিছু জামা কাপড় । দূর থেকে ঋতুজাকে দেখতে পেয়ে এক গাল হেসে ঐত্রী প্রায় ছুট্টে এসেছিল তার সঙ্গে আলাপ করতে । হয়তো সে ভুলতে পারেনি তাদের স্কুল জীবনের কথা । তার বেস্ট ফ্রেন্ড ঋতুজার কথা । একসঙ্গে টিফিন শেয়ার করা কথা । দুজন একসঙ্গে বসে নানান গল্প করার কথা । একজন স্কুলে না এলে অপরজনের মন খারাপের কথা । একজন শাস্তি পেলে আরেকজনেরও ইচ্ছা করে শাস্তি নেওয়ার কথা । এছাড়াও রয়েছে মান-অভিমান কথা কাটাকাটি এমনও কত-শত স্মৃতির কথা , যা বলে শেষ হওয়ার নয় । তাছাড়া ঋতুজাকে কম তো সাহায্য করে নি সে । নিজের ক্লাসওয়ার্ক শেষ করে ঋতুজার পড়ে থাকা ক্লাসওয়ার্ক গুলো করে দিয়েছে সে । মাঝেমধ্যে হোমওয়ার্কগুলোও করে দিতে হতো তাকে । ঋতুজাকে সাহায্য করার জন্য তার হাতের লেখা পর্যন্ত নকল করে নিয়েছিল সে । তারপর স্কুল জীবনের সাথে সাথে কালের নিয়মে হারিয়ে যায় তারাও । তাই হঠাৎ করে এত বছর পর ঋতুজাকে দেখতে পেয়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি ঐত্রী । কিন্তু সেদিন ঐত্রীর সঙ্গে কথা বলতে আত্মসম্মানে বেঁধেছিল ঋতুজার । হাবে-ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিল সেকথা । ঐত্রীও বেস্ট ফ্রেন্ডের মনের কথা বুঝতে পেরে একটা মুচকি হেসে বলেছিল জানিস তো আমার হয়তো তোর মতো অত টাকা নেই তবুও আমি খুব সুখে আছি । একজন মনের মতো মনের মানুষ পেয়েছি । তারপর সে অন্য একটা অজুহাত দেখিয়ে দ্রুত সেখান থেকে চলে গিয়েছিল । আজ ঋতুজা বুঝতে পারছে সেদিন কেন সে মুচকি হেসেছিল । হয়তো ঐত্রী ঋতুজার চোখ মুখ দেখে বুঝে গিয়েছিল তার সুখের কথা । যেটা আজ সে বুঝতে পারলো । এমন সময় লাল সিগন্যালটা সবুজ হয়ে গেল । ঐত্রীরা সিগন্যালটা পেরিয়ে মেইন রাস্তার বাঁদিকে দাঁড়িয়ে গেল । ঋতুজার বড্ড ইচ্ছে হলো ওরা কোথায় যায় সেটা দেখতে । ও গাড়িটা থামাতে বললে ওর হাজবেন্ড রাতুল বেশ বিরক্তির সঙ্গে বলল - এখানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে কি হবে ? ও আমতা আমতা করে বলল - পাশে একটা পার্ক আছে সেখানে একটু যেতে ইচ্ছে করছে । ওর হাজবেন্ড বেশ খানিকটা রেগে গিয়ে বলল -এত ভালো ভালো জায়গায় ঘুরতে যাচ্ছ তাতেও তোমার হচ্ছে না ? শেষে কিনা এই পার্ক মনে ধরল । রাগ করলেও গাড়ি থেকে নেমে ট্যাবে চোখ বোলাতে বোলাতেই গটগট করে হেঁটে নিজে আগে চলে গেল পার্কের মধ্যে । পেছন পেছন ঋতুজাও পৌঁছালো সেখানে । পরিষ্কার মতো একটা বেঞ্চে গিয়ে বসল দুজনে । ইতিমধ্যে ঐত্রীরাও সেখানে পৌঁছে গিয়ে রীতিমতো ছোট বাচ্চাটাকে নিয়ে ছোঁয়া-ছুঁয়ি খেলায় মেতেছে । ঐত্রীর মুখের অফুরান হাসি দেখলেই বোঝা যায় সে কতটা ভালো আছে । সে কতটা সুখে আছে । ওদের দেখতে দেখতে ঋতুজা ভাবলো আমরাও তো গিয়েছি অনেক জায়গায় ঘুরতে । সাগর , নদী , পাহাড় কোনো কিছুই বাদ যায়নি । এমনকি বিদেশেও গিয়েছি বেশ কয়েকবার । তবুও হয়তো কোনোদিন ঐত্রীর মতো আনন্দিত হতে পারেনি । অমনভাবে প্রাণ খুলে হাসতে পারিনি । আনন্দ যে পাইনি তা নয় কিন্তু হাজার হাজার টাকা খরচ করে পাওয়া আনন্দ আজ ফিঁকে হয়ে যাচ্ছে ঐত্রীর কাছে । কই রাতুল তো কখনও অমন ভাবে খেলেনি ওর আর ওর মেয়ের সাথে ? সে অতটা খোলামেলা মানুষ নয় ? তার মধ্যে একটা গাম্ভীর্য কাজ করে । হয়তো তার অনেক টাকা রয়েছে বলে ? সারাদিন দৌড়াচ্ছে টাকার পেছনে । সময় তার খুব কম । বেশিরভাগ দিনই থাকে বাইরে বাইরে । আর যদিও বা একটু-আধটু সময় পায় ব্যস্ত থাকে মোবাইল ,ট্যাব, কম্পিউটারেই । ইতিমধ্যে ওরা ব্যাডমিন্টন খেলা শুরু করছে । বাচ্চাটা পাশে খেলছে বল নিয়ে নিজের মতো । হাতের কাছে সব রয়েছে ঋতুজার । যত খুশি শপিং করতে পারে সে , তার কাছে এমন অনেক পোশাক রয়েছে যেটা সে দ্বিতীয়বার পরাতো দূরের কথা খুলে পর্যন্ত দেখেনি । বাড়ির সবকিছুর তার কথা মতো হয় । লকার ভর্তি সোনা ও হীরের গয়না । ইচ্ছা করলে যেখানে খুশি যেতে পারে । মাঝে মাঝে ক্লাবে যায় , বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি করে তবুও কেন জানি না আজ ঐত্রীকে দেখে বড্ড হিংসা হচ্ছে তার। এক অজানা কষ্ট তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে । বিনোদনের হাজারও সামগ্রী ও পন্থা থাকায় সত্বেও একাকীত্ব একটু একটু করে যে তাকে গ্রাস করছে সে তা ভালো করেই বুঝতে পারছে । আজ সে বুঝতে পারছে সাচ্ছন্দ্য জিনিসটা সুখ নয় । সুখ আর সাচ্ছন্দ্যের মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য । আসল সুখীই তো ঐত্রী .....


#সুখ_ও_সাচ্ছন্দ্য

#রূপবালা_সিংহ_রায়






মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।