হারানো শৈশব - রূপবালা সিংহ রায় // নতুন বাংলা গল্প// বাংলা গল্প // Bangla Golpo // Bengali Story।
হারানো শৈশব
রূপবালা সিংহ রায়
"নিশ্চয়ই তুই কিছু করেছিস তা না হলে হেডমিসট্রেস ম্যাম পেরেন্টস কল করবেন কেন ? বাড়িতে ফিরি তারপর দেখিস কি হাল করি তোর ?" গতকাল হেডমিসট্রেসস ম্যামের মেইলটা পাওয়ার পর থেকে মোনালিসা সেই যে মেয়েকে বকা শুরু করেছে স্কুলের গেটের কাছে প্রায় পৌঁছে গেল এখনো তার বকা শেষ হয়নি । রাতে পিঠেও পড়েছে দু এক ঘা । ভয়ে একদম কুঁকড়ে আছে ক্লাস থ্রি এর তিন্নি । হেডমিসট্রেস ম্যামের ঘরের দিকে যেতে যেতে মোনালিসা বলেই চলল - "আজ পর্যন্ত কোনোদিন প্যারেন্টস কল হয়েছে ? স্কুলের অন্য প্যারেন্টসরা ছিঃ ছিঃ করবে না ? প্রেস্টিজ বলে কিছু থাকলো আমার ? কেন হবে প্যারেন্টস কল শুনি ? তবুও আবার এক্সামের সময় । এখনও তিনটে এক্সাম বাকি । মাঝে একটা দিন ছুটি পড়েছে কোথায় একটু রিভাইস দেবে তা নয় এখন স্কুলে ছুটতে হচ্ছে ! তুমি দিনকে দিন যাচ্ছে তাই হয়ে যাচ্ছ । তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড নিশাকে দেখো না । ও তোমার থেকে শতগুণ ভালো" । হেডমিসট্রেস ম্যামের রুমের সামনে এসে মোনালিসা নিজেকে একটু শান্ত করে শাড়ির প্লিটটা আর চুলগুলো হাত দিয়ে সোজা করে নিয়ে বলল -"মে আই কাম ইন " ম্যাম"। হেডমিসট্রেস ম্যাম একটু মুচকি হাসি দিয়ে বললেন - "হ্যাঁ হ্যাঁ আসুন , বসুন (চেয়ার দেখিয়ে) । মোনালিসা বসলে হেডমিসস্ট্রেস ম্যাম অন্য একজন ম্যামকে ডেকে তিন্নিকে বাইরে নিয়ে যেতে বললেন । তিন্নি বাইরে চলে গেলে হেডমিস্ট্রেস ম্যাম বললেন - "আপনি কি জানেন তিন্নি এক্সামের প্রত্যেকটা দিন কোয়েশ্চেন পেপার হাতে নিয়ে নার্ভাস ফিল করেছে । ওর চোখে মুখে অজানা এক আতঙ্ক ছিল তখন । আর গতকাল ম্যাথস এক্সামে তো ও কান্নাই করে দিল । প্যানিক করছিল । কোনো ম্যাথসই নাকি ও বুঝতে পারছিল না । তারপর অনেক বোঝানোতে দু-চারটে অংক করতে পেরেছে সে । কেন বলুন তো ম্যাম ? ক্লাস টিচারের কাছ থেকে যতটা জানতে পেরেছি , ও বেশ ইন্টেলিজেন্ট । ক্লাসে ভালোই পড়াশোনা করে । তাহলে এমন কেন করছে ও ?
মোনালিসা - "ম্যাম আমিও ঠিক বুঝতে পারছি না ! বাড়িতে আমি ওকে যে কটা ম্যাথস দিয়েছি সবকটাই ঠিক করেছে । এমনকি প্রাইভেট টিচারের কাছেও সব ঠিকঠাক করেছে। এক্সামের সময় কেন এমন করছে কে জানে ? শুধু তো ম্যাথস বলে নয় , অন্য সাবজেক্ট গুলোও তিন্নির ভালোভাবে রিভাইস দেওয়া ।
হেডমিসট্রেস ম্যাম - "তাহলে ওর এমন অবস্থা কেন ? রিটেন এক্সাম দিতে ওর কি কোনো সমস্যা হচ্ছে ?
মোনালিসা - "ম্যাম এটা তো ওর ফাস্ট রিটেন এক্সাম নয় ! ওদের ক্লাস ওয়ান থেকে রিটেন এক্সাম হচ্ছে । ও তো সেই নার্সারি থেকে এই স্কুলে পড়ছে । আর প্রত্যেক বছরইও ফার্স্ট হয় । এমনকি ওয়ান ও টু তেও ফার্স্ট হয়েছে । শুধু হাফ-ইয়ার্লি এক্সামটা একটু খারাপ হয়েছে তাই রিসেন্টলি প্রাইভেট টিচারও রেখেছি । সেই সঙ্গে আমিও যতটা পারি ওকে পড়াই । আর স্কুলে আপনারা তো আছেনই ...
মোনালিসার কথা শেষ হওয়ার আগেই হেডমিসট্রেস ম্যাম একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে হতাশা ভরা মুচকি হাসি দিয়ে বললেন - "আপনাকে আমার এক পরিচিতার গল্প শোনাই তাহলে হয়তো বুঝতে পারবেন তিন্নির কি হয়েছে" ? মোনালিসার কাছ থেকে প্রত্যুত্তরের অপেক্ষা না করেই হেডমিসট্রেস ম্যাম বলতে শুরু করলেন - "আমার এক বান্ধবী অনুরাধা । ও একজন স্কুল টিচার। ওর স্বামী একটা ভালো প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে । ওদেরও তিন্নির মতই মিষ্টি একটা মেয়ে ছিল । তার ডাকনাম ছিল মাম্পি । কোনো অভাব রাখেনি ওরা মাম্পির । একমাত্র সন্তান , তাই চেয়েছিল তাকে সেরার সেরা করতে । তার ওপর এখনকার সময় ভালো রেজাল্ট না হলে ভালো জায়গায় চাকরি-বাকরিও হবেনা । তাকে নিয়ে মা-বাবার স্বপ্ন ছিল অপরিসীম। বাইরে গান ও ড্রয়িং শিখলেও অনুরাধা চাইতো মেয়ে পড়াশোনায় ভালো হোক । আরও ভালো । স্কুল টিচারের মেয়ে বলে কথা ! ক্লাসে ফার্স্ট না হলে কি হয় ? তাই যতটা পারতো তাকে নিয়ম-শৃংখলার মধ্যে রাখতো । রাতে দিয়ে রাখতো হোমওয়ার্ক যেটা মাম্পিকে পরদিন স্কুল থেকে ফিরে বিকেল বেলায় করে রাখতে হতো । সেই সঙ্গে স্কুলের হোমওয়ার্ক গুলোও । এক্সাম এর দিনগুলো এলে তো আর কথাই নেই ! বই থেকে মুখটুকুও তুলতে পারত না সে । প্রত্যেকটা সাবজেক্টের প্রতিটি চ্যাপ্টারের প্রতিটি লাইন প্রায় তাকে মুখস্ত করতে হতো । খুব সুন্দর ছবি আঁকত মাম্পি । সময় পেলেই আঁকার খাতা নিয়ে বসে পড়তো । মাঝে মাঝে মায়ের দেওয়া হোমওয়ার্কের কপিগুলোর মাঝে এঁকে রাখত নানান ছবি । তার জন্য মায়ের কাছে বকুনিও খেতে হতো তাকে । আস্তে আস্তে মেয়েটা কাঠপুতুলে পরিণত হয়েছিল । নিজের ইচ্ছা , নিজের ভালোলাগা , নিজের ছেলেবেলা তার কাছ থেকে হারিয়ে গিয়েছিল । বড়োদের মতো বাঁধাধরা জীবনে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল সে । আস্তে আস্তে ডিপ্রেশন তাকে গ্রাস করে ফেলেছিল । তখন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা চলছিল । সেদিন ফিজিক্স এক্সাম দিয়ে ফিরেছিল । কাজের দিদি খাবার দিয়ে তাকে খেতে বললে সে তাকে বলেছিল - "মাসি আমার খিদে নেই । আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। আমি আর জেগে থাকতে পারছি না । আমি ঘুমাতে যাচ্ছি । মা বাবা ফিরলে তুমি ওদেরকে খেতে দিও" । স্কুল থেকে ফিরে ক্লান্ত অনুরাধা কাজের দিদির কাছে মেয়ের খবর নিলে , কাজের দিদি মাম্পির বলা কথাগুলো বলল । তা শুনে মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে অনুরাধার । দুদিন বাদে ম্যাথস এক্সাম । এখনো সে ঘুমাচ্ছে । সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে মেয়ের ঘরে গেল মেয়েকে জাগাতে কিন্তু মাম্পি আর জাগেনি" ।
ম্যামের বলা গল্পটা শুনতে শুনতে চিক চিক করে উঠলো মোনালিসার চোখ দুটো । গল্প শুনতে এতটাই বিভোর ছিল যে সে লক্ষ্যই করেনি হেডমিসট্রেস ম্যামের দু'চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুধারা । হঠাৎই মোনালিসার নজর পড়লো হেডমিস্ট্রেস ম্যামের টেবিলে থাকা নেম-প্লেটার দিকে -"অনুরাধা দাশগুপ্ত"। আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না মোনালিসার । নিজেকে সামলে নিয়ে হেডমিসট্রেস ম্যাম বললেন - "বলতে পারেন বাচ্চা গুলো কেন এত ছোট বয়স থেকে ডিপ্রেশনে ভুগবে ? কেন নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা ভাববে ? কেন তারা বাঁধা পড়বে বড়দের মতো রুটিন মাফিক জীবনে ? এইটুকু বয়স থেকে ছুটতে ছুটতে ওরা যে বড়ো ক্লান্ত । উঠা পড়া জীবনের ধর্ম । একসাথে সবাই তো আর প্রথম হতে পারে না তাই না ? একেক জন একেক জায়গায় সেরা । তাই অতো প্রেশার দেবেন না ওকে । ও যতটা পারছে ততটাই যথেষ্ট। ওর মতো করে বাঁচতে দিন ওকে । ওর মতো করে বড় হতে দিন । ওকে ওর কাজের জন্য এ্যাপ্রিসিয়েট করুন । ওর ভালো লাগাকে সমর্থন করুন । কিছুটা সময় খেলতে দিন । শৈশবকে শৈশবের মতো করে কাটাতে দিন । উৎসাহ দিন সবার সেরা হতে নয় , নিজের মতো করে সেরা জীবন যাপন করতে । জীবনের থেকে সেরা কিন্তু কিছু হতে পারে না ! তাই ও কি চায় সেটা বুঝুন । দেখবেন সব ঠিক হয়ে গেছে ।
মোনালিসা আর তিন্নি স্কুল থেকে বেরিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল । তিন্নির মুখ শুকিয়ে গেছে । গলা শুকিয়ে কাঠ । বকুনির ভয়ে ম্যাম কি বললেন সেটাও জিজ্ঞাসা করতে পারছে না । তবুও মনে মনে আন্দাজ লাগাচ্ছে ম্যাম মাকে কি বলতে পারে ? শুধু কাঁপা কাঁপা হাতে মায়ের হাতটা ধরে নীচের দিকে মুখ করে হেঁটে চলেছে । একটা আইসক্রিম ওয়ালা কে দেখতে পেয়ে মোনালিসা বলল -"আইসক্রিম খাবে"? তিন্নি মায়ের দিকে একটু তাকিয়ে আবার মুখ নিচু করে বলল -"জানো তো মা আমার এক্সাম গুলো ভালো হয়নি। আমি সব জানতাম। কিন্তু আমার ভয় পাচ্ছিল আমি ফার্স্ট হতে পারব কিনা ভেবে ? আমি যেন লিখতেই পারছিলাম না" । মোনালিসা একগাল হেসে তিন্নির ছোট ছোট চুলগুলোকে এলোমেলো করে দিয়ে বলল -"ফার্স্ট নাই বা হলে পাশটুকু করবে তো ? আর তাও যদি না হয় পরের বছর আবার ট্রাই করবে । চলো এখন আইসক্রিম খেতে খেতে তাড়াতাড়ি বাড়ি যাই । বিকালে আবার পার্কে যেতে হবে খেলতে "। মায়ের কথাগুলো শুনে হাঁ হয়ে গেল ছোট্ট তিন্নি....
#হারানো_শৈশব
#রূপবালা_সিংহ_রায়.....🖋️©️
banglagolpo ,bengalistory, বাংলাগল্প, rupbalasingharoy , golpo ,story
সাঁঝবাতির রূপকথায় - Rupbala Singha Roy
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন