মা - রূপবালা সিংহ রায় // Maa - Rupbala Singha Roy // Bangla Golpo // Bengali Story // Happy Mother's Day।

 

মা - রূপবালা সিংহ রায়

Mother's day story

Maa diboser golpo



বিশ্বাস হয়নি সেদিন ফালতু লোকটার কথা। তাই ঝিলমিল ছুটে গিয়েছিল বাজে গলিটাতে। যথেষ্ট বয়স হয়েছিল তার সবকিছু বোঝার তাই কোনো উপায় না দেখে নোংরামি গুলোকে এড়িয়ে পা রেখেছিল সেই বাড়িটাতে, যেখান থেকে তার মা তাকে বের করে দিয়েছিল সেই ছোট্ট বয়সে। তখন তার বয়স তিন চার হবে। কেন মা বের করে দিয়েছিল তাকে? কেন তাকে তার কাছে নিয়ে যায় না? কেন মা তার সঙ্গে তেমন দেখা করতে যায় না? কিছুই মাথায় ঢুকতো না তার! শুধু মনে হতো মা পচা, মা খারাপ, মা আমাকে ভালোবাসে না। যদিও এই কথাগুলো মায়ের কাছে থাকার সময় থেকেই তার মনে গেঁথে গিয়েছিল। মা সব সময় তাকে একটা বদ্ধ ঘরে আটকে রাখতো। যখন সমগ্র গলিটা জুড়ে তারই মত বাচ্চাগুলো খেলা করে বেড়াতো তখন খুব খারাপ লাগতো তার। রাতের বেলাতেও না জানি মায়ের কি সব কাজ থাকতো তাই অন্ধকার ঘরটাতে একা একা রাত কাটাতে হতো তাকে। তারপর একদিন মায়ের সঙ্গে কার যেন ঝগড়া লেগে গিয়েছিল। কি নিয়ে তা জানা নেই তবে মা তাকে জোরে জোরে বলছিল -- না আমি মিশতে দেব না আমার মেয়েকে ওদের সঙ্গে। আমি চাই না আমার মেয়ে ওদের মতো করে বড় হোক আর তারপর আমার মত জীবন কাটাক। কথাগুলো বলছিল আর আমার জামাকাপড় একটা ব্যাগে ঢোকাচ্ছিল। তারপর মা দিয়ে এলো আমাকে একটা হোস্টেলে। সেখানে কোনো কিছুর অভাব ছিল না আমার। খাবার-দাবার, জামাকাপড়, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছে যেত ঠিক সময় মত। যখন জিজ্ঞাসা করতাম কে দিয়ে গেল তখন ওখানকার মাসিটা বলতো -- তোর মা এসেছিল। দৌড়ে যেতাম মায়ের সঙ্গে দেখা করতে। নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে যখন নামতাম ততক্ষণে মা বাইরে যাওয়ার গেটটার কাছে পৌঁছে যেত। গলা ছেড়ে ডাকতাম মা মা মা... শুনতো না মা গাড়িতে উঠে পড়তো। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কান্না করতাম। খুব রাগ হত মায়ের ওপর। তারপর ভাবতাম মা হয়তো ব্যস্ত, কত কিছুই তো করতে হয় তাকে, কম খরচ আমাকে এখানে রাখার। আর রাগের কথা মনে থাকত না। মাঝে মাঝে অভিমান হতো কেন মা আমায় নিয়ে যায় না তার কাছে? ছুটির সময়টাতেও তো নিয়ে যেতে পারে। খুব মিস করতাম তখন মাকে। যখন সবাই ছুটিতে বাড়ি চলে যেত বড় একলা লাগতো তখন আরো বেশি বেশি করে মনে পড়তো মা'র কথা। এতক্ষণে হঠাৎ তার ভাবনায় ছেদ পড়ল একটা ঘরের দরজা দেখে। দরজাটা খুব চেনা তার। দরজাটার উপর মা দুর্গার একটা ছবি লাগানো বুঝতে দেরি হলো না তার এটা মায়ের ঘর। ঠিক চিনেছে সে তার ভুল হতেই পারে না। এইতো ছবিটা ময় লাল কালির দাগ। একবার খুব ইচ্ছা করছিল মা দুর্গার এমন একটা ছবি আঁকতে কিন্তু কিছুতেই পারছিল না সে। মনে পড়েছিল মায়ের দরজায় লাগানো ছবিটার কথা। কিন্তু ও ঘরে তার যাওয়ার কোনো অনুমতি না থাকলেও স্নানে যাওয়ার সময় ওই পথটা দিয়েই যেত হত তাকে। মাথায় এলো হাত বলানোর কথা। মা যখন লেখা শেখায়, স্লেটে একটা অক্ষর লিখে বারবার হাত বোলাতে বলে। তাই সেদিন স্নানে যাওয়ার সময় ছবিটাতে হাত বোলাচ্ছিল সে। হঠাৎ মা এসে পড়ায় তা অসমাপ্তই থেকে যায়। সেই হাত বোলানো ছবিটা আজও অসমাপ্তই আছে। তাহলে লোকটা ঠিক বলেছিল মা এখানেই থাকে। ছিঃ! ঘৃণা করছে নিজেকে দেখে। আরো ঘৃণা করছে মায়ের ওই নোংরা পথে ইনকাম করা টাকা দিয়ে আমি লেখাপড়া শিখেছি! মানুষ হয়েছি! লজ্জা এ যে ভীষণ লজ্জা। ঘৃণায়, লজ্জায়, অভিমানে, রাগে জ্বলতে জ্বলতে দুবার জোরে জোরে সে লাথি মারলো দরজাটিতে। দরজা খুলে বেরিয়ে এলো মা সঙ্গে একটা লোক। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল তার। তার মা এরকম ভাবতেই গা টা কেমন যেন গুলিয়ে উঠছে তার, মাথাটা ঘুরছে, চোখ দুটো ঝাপসা, পড়ে গেল পড়ে গেল ভাব। শুধু কানে আসছে মায়ের বলা কথা -- চলে যা ঝিলমিল চলে যা। কেন এলি এখানে তুই মা? পালা এখান থেকে পালা। যা বলছি, দাঁড়িয়ে আছিস কেন যা? মাথা কাজ করছে না তার। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মেয়ে মানুষ ও পুরুষ মানুষগুলো এসে জড় হয়েছে তার সামনে। মেয়ে মানুষগুলো কৌতুহলে আর পুরুষ মানুষগুলো লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। কি নোংরা তাদের চাহনি। ঝিলমিল কথা শুনছে না দেখে তার মা তার একটা হাত ধরে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বাইরে দিকে। আর বলছে -- রাগ করিস, ঘেন্না করিস, যা করিস কর তবু এখানে যেন জীবনেও আসিস না। আমি মরে গেলেও না। আমার মরা মুখ দেখতেও না। চলে যা তুই চলে যা অনেক দূরে। যেখানে আমার কলঙ্কের দাগ যেন ছুঁতে না পারে তোকে।

 কিন্তু এখানে পা দেওয়াটা যত সহজ বের হওয়াটা ততটা সহজ নয়। হঠাৎই তার আর এক হাত খপ করে ধরে নিল একটা লোক আর চেচিয়ে চেঁচিয়ে একটা ষন্ডা মার্কা মহিলাকে বলল -- মাসি যত টাকা চাও তাই দেব। ওদিকে মাসিও ইশারায় হুকুম দিয়ে দিল। মা ঝিলমিলের হাত ছেড়ে দৌড়ে গিয়ে পড়লো মাসির পায়ে। মাসি তোমার পা দুটো ধরি ছেড়ে দাও, দয়া করে ছেড়ে দাও আমার মেয়েটাকে। কিন্তু মাসি গলার পাত্রী নয়। ওদিকে লোকটার শক্তির কাছে পেরে উঠছে না ঝিলমিল। তাকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে মায়ের ঘরের দিকে। দরজা ঠেলে ঢোকার মুহূর্তে লোকটা লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। তার মাথা থেকে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। পেছন ঘুরলো ঝিলমিল দেখল মায়ের হাতে মোটা একটা রড। সেটার ডগায় এখনো লেগে আছে তাজা রক্ত। মায়ের চোখ থেকে বের হচ্ছে আগুন ঠিক মায়ের দরজায় লাগানো মা দুর্গার মত। দীপ্ত কণ্ঠে মা বলল -- চলে যায় এখান থেকে। কে বলেছে তোকে এখানে আসতে? যা চলে যা। মায়ের ধমক খেয়ে ঝিলমিল বেরিয়ে এসেছিল সেদিন সেখান থেকে। একটা কথাও বলতে পারিনি সে - না রাগের কথা, না ঘৃণার কথা, না ভালোবাসার কথা। পরে জানতে পেরেছিল মায়ের জেল হয়েছে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। গিয়েছিল একবার সেখানে সে মায়ের সাথে দেখা করতে কিন্তু দেখা করেনি মা। ঝিলিমিল এখন স্বাভাবিক জীবন ছন্দে বাঁচে আর পাঁচটা মেয়েদের মত। তবে মাঝে মাঝে মায়ের কথা খুব মনে পড়ে। দৌড়ে যেতে ইচ্ছা করে তার কাছে। সে ছিল বলেই না আজ সে অন্য জীবন বাঁচার সুযোগ পেয়েছে.....


#মা

#রূপবালা_সিংহ_রায়....🖋️

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।