সেই জীবন রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // , বাংলা ছোট গল্প।

 

সেই জীবন - রূপবালা সিংহ রায়

সকাল থেকেই পড়ছে অঝোরে বৃষ্টি। কখনো ঝমঝমিয়ে তো কখনো ঝিরিঝিরি করে। এমনিতেই স্কুলে গরমের ছুটি চলছে তাই বাইরে যাওয়ার দরকারও নেই। যখন রোজ চোখে চশমা এঁটে শাড়ি পরে রাগী দিদিমনি সেজে স্কুলে যেতে হতো তখন খুব খারাপ লাগতো মহুয়ার। কিন্তু এখন এতো দিন ছুটি পেয়ে মাঝে মাঝে মনটা আবার যেতে চাইছে সেখানে । তাই শুধু দিন গুনছে কখন স্কুলটা খুলবে। মা বাবার সঙ্গে আর কত সময় কাটানো যায়। সারা দিনটা এদিক ওদিক করে কাটানোর পর সন্ধ্যেতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম চা আর মায়ের হাতে বানানো পেঁয়াজি নিয়ে খেতে খেতে জানালা দিয়ে দেখতে লাগলো বাইরের দিকে। রাস্তা দিয়ে দুটো একটা গাড়ি পিঁকপিঁক আওয়াজ করে চলে যাচ্ছে নিজের নিজের গন্তব্যে। রাস্তার পাশে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছটা আগের থেকে বেশ বড়ো হয়ে রাস্তার মাঝ বরাবর ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামনের বাড়িটার রং নীল থেকে কবে যেন হলুদ হয়ে গেছে। ওবাড়ির মাম্পি ছোট্ট ছেলেটাকে কোলে নিয়ে ঘরময় পায়চারী করছে আর খাওয়াচ্ছে। সেই মাম্পি যাকে কিনা কদিন আগে পর্যন্ত তার মা এমনি করে খাওয়াতো! বিচ্চুদের গ্যারেজে থাকা পুরাতন সাদা গাড়িটা চলে গিয়ে তার জায়গা দখল করে নিয়েছে ঝাঁ চকচকে একটা বিশাল লাল রঙের গাড়ি। বাবা মা'র শরীরেও ফুটে উঠছে বার্ধক্যের ছাপ। বাবা আজকাল অফিস থেকে ফিরে আর খবর চালিয়ে বসে না দিব্যি মায়ের সঙ্গে বসে সিরিয়াল দেখে। শহরটা বদলে গেছে, সবাই বদলে গেছে শুধু বদলায়নি সে আর তার ভেতরে থাকা ফাঁকাগুলো। আজ থেকে ছয় বছর আগে এমনই এক বর্ষার দিনে চলে গিয়েছিল সিদ্ধার্থ তার জীবন থেকে। 


তাদের গল্পটা শুরু হয়েছিল কলেজ জীবনে। কলেজ ফেস্ট, কবিতার আসর, আর সিদ্ধার্থের সেই এক জোড়া চোরা হাসি। প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর অনেক লুকানো চাওয়া-পাওয়া। কিন্তু যতটা কাছাকাছি এসেছিল তারা, বছর তিনেকের মধ্যে ততটাই ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে থাকে তারা।


চাওয়া-না চাওয়া, পাওয়া-না পাওয়া গুলো মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। পিঁষে যায় ভালোবাসা। শুরুর আগেই হাতে পড়ে থাকে সমাপ্তির ঝোলাটা। যাতে ছিল কেবল বহু রাতের কান্না , বহু মান অভিমান আর ভুল বোঝাবুঝি। অবশেষে সময়ের সাথে সাথে নিজেকে শক্ত করতে শিখেছিল মহুয়া। পরে অনেক নতুন মানুষও চিনেছিল, কিন্তু কোনো সম্পর্কেই সেই গভীরতা খুঁজে পায়নি কখনো। তাই সে এখন নিজে বাঁচে।


কিন্তু এত দিন পরে আবার কেন সেই রোগ এসে ধরল তাকে কিছুতেই মাথায় আসছে না তার। চোখের কোণা দুটো ভিজে উঠেছে। এতবার নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুতেই পারছে না। অবশেষে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল আলো আঁধারি রাস্তায়। মা অনেকবার বারণ করার সত্ত্বেও যখন ও শুনলো না বাবা গিয়েছিল ছাতা খানা আনতে। কিন্তু বাবা আসার আগেই বেরিয়ে পড়ল সে। এখনো বৃষ্টি পড়ছে ঝিমঝিম করে। বেশ ভালই লাগছে তার। সঙ্গে বইছে ঠান্ডা হিমেল হাওয়াও। শরীরটা জুড়িয়ে গেলেও মনটা কিছুতেই জুড়াচ্ছে না তার। আধা ঘন্টা খানিক হাঁটার পর কেমন যেন শীত শীত করতে লাগলো। এবার সম্বিত ফিরল। মনে পড়লো মা বাবার শুকনো মুখ দুটোর কথা। নিশ্চয়ই দুশ্চিন্তা করছে, ভেবে রওনা দিল বাড়ির দিকে। মোবাইলটাও নেওয়া হয়নি যে ফোন করবে। এদিকে হাতে টাকাও নেই যে একটা রিকশা বা অটো ধরবে। তাই দ্রুত পা চাললো সে। বেশ কিছুটা যাওয়ার পর একজনকে পেরিয়ে আগে যাওয়ার জন্য বেখেয়ালে ধাক্কা লেগে পড়ে যায় তার হাতে থাকা সিঙাড়ার প্যাকেটটা। সরি সরি বলে তার দিকে তাকাতেই মহুয়া দেখে সে সিদ্ধার্থ। তারপর মিনিট দুই দুজনেই চুপ। 


মহুয়াকে কিছু বলতে না দেখে সিদ্ধার্থ বলল -

 


-- ভয় পেলে নাকি ?


-- ভয় কেন পেতে যাব? তুমি কি ভূত?


-- ভূতই তো ভবিষ্যত আর হতে পারলাম কোথায়?


-- সেই জন্যই না অন্য কারোর বর্তমান


-- নিজে যখন অতীত থেকে বেরিয়ে বর্তমানে ঢুকতে পারলে না তাহলে কি করে আশা করি আমি পারবো


কি বলবে বুঝতে না পেরে মহুয়া বলে --খিদে পাচ্ছে সিঙাড়া খাওয়াবে ? আশেপাশে আছে কোনো দোকান?


-- দোকান তো আছে তবে সেই জীবনে ফিরতে গেলে সেই দোকানে যেতে হবে যেখানকার সিঙাড়া খাইয়ে তোমায় প্রপোজ করেছিলাম। যাবে...


-- চলো যাই তবে ...


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।