মা - রূপবালা সিংহ রায় // বাংলা গল্প // বাংলা ছোট গল্প // নতুন বাংলা গল্প / মা দিবসের গল্প।


মা - রূপবালা সিংহ রায়

 আজকাল বিরক্তি লাগে হনুমান টাকে দেখলে আশার। কদিন ওকে দেখে মনে সহানুভূতি জাগলেও আজকাল বড় ভয় হয় তার। ছেলেটা যদি কিছু করে দেয় সেই ভয়ে ঘরের বাইরে আনে না সে তাকে। পরপর পাঁচটা মেয়ের পর হয়েছে এই ছেলেটা। তার ওপর হনুমানটার এমন নজর পড়ল! তাই দেখে তাকে আর বাড়ি ঘেঁষতে তে দেয় না সে। বাড়ির মধ্যে ঢুকলেই তাড়া করে। মধ্যপ্রদেশের প্রতন্ত এক গ্রামে আশার বাস। চাষবাসই তাদের প্রধান জীবিকা। বাড়ির সামনে প্রকাণ্ড উঠোন আর সেটা পেরোলেই বিঘের পর বিঘে চাষের জমি একেবারে পাহাড়ের গা পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। কি নেই সেখানে নানান রকমের মৌসুমী ফল ও শাকসবজি ভর্তি। সঙ্গে রয়েছে ভুট্টটাও। আর এই ভুট্টটাই হল হনুমানদের প্রিয় খাবার। তাই এই সময় দলে দলে হনুমান পাহাড়ের ওপর থেকে নিচে চলে আসে ভুট্টা ক্ষেতে। খাওয়ার থেকে নষ্ট করে বেশি। একদিন দুপুরবেলা সবে খেতে বসেছে সে ওমনি ক্ষেতে ঢুকেছে হনুমানের দল। যা যা বলে দৌড়ে এসে একটা লাঠি নিয়েছে তাড়াতে গেল সে তাদের। তাই দেখে পাশের বাড়ির কিছু লোকজনসহ বেরিয়ে এল তার বাড়ির লোকজন গুলোও। এতজনের তাড়া দেখে হনুমান গুলো দিশেহারা হয়ে এদিক-ওদিক করতে শুরু করল। তা দেখে এই হনুমানটি ক্ষেতের পাশে থাকা একটা প্রকাণ্ড আমলকি গাছের ডাল ধরার জন্য লাফ দিল নিচ থেকে। তার বুকের মধ্যে ছিল একটি হনুমান শাবক। ধাক্কা সামলাতে না পেরে হোক কিংবা ভয়ে তার হাত পা গুলো শিথিল হয়ে এসে সে পরলো নিচে থাকা একটা পাথরের উপর।


 বাচ্চাটা হারিয়ে তিন চার দিন সেকি কান্না হনুমানটার! বেশ কয়েকদিন হল এসে আশ্রয় নিয়েছে উঠোনে থাকা সবচেয়ে লম্বা আর বড় আম গাছটাতে। সারাদিন কেবল বসে থাকে। দুদিন হল আশা খেয়াল করেছে হনুমানটা তাকিয়ে থাকে তার ছেলের দিকেই। মনটা কেমন যেন কুগায় তার। যদি ছেলেটাকে নিয়ে পালায়? মন কে ধমক দেয়, বোঝায় তবুও মন বুঝতে নারাজ। একদিন স্নান সেরে সে আসছিল পাশের নদী থেকে। দূর থেকে দেখল হনুমানটা জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে কিছু যেন একটা করছে। বুকের মধ্যেটা ছ্যাঁত করে উঠলো তার। জানালা দিয়ে তো ছেলেকে বের করা যাবে না! তাহলে ও কি প্রতিশোধ নিচ্ছে? 'আমার ছেলেটাকে মেরে ফেলল গো' -- বলে হাতে থাকা ধোয়া জামা কাপড়ের বালতিটা ফেলে দিয়ে সে লাগালো ছুট ততক্ষণে হনুমানটা পালিয়েছে। দরজা খুলে অক্ষত ছেলেকে বুকে জড়িয়ে শেষ পর্যন্ত শান্তি পেল সে। তবুও যেন বুকের মধ্যে টা কেমন ধড়াস ধড়াস করছে তার। পরদিন সকালে যখন সে ছেলের গায়ে তেল মালিশ করছে রোদ্দুরে বসে তখন তার শ্বশুর মশাই এসে বলল -- জানোতো বৌমা, হনুমানটা মরে গেছে। বোধহয় সাপে কামড়েছে... পাহাড়ি বিষাক্ত সাপ, এক কামড়েই শেষ! হনুমানটারও সাহস আছে বলতে হবে সাপটাকে টেনে দু টুকরো করে ফেলেছে! এক টুকরো এখনো হাত কামড়ে আছে আর এক টুকরার হদিস মেলেনি।

 মনে পড়ে আশার তার চিৎকারে হনুমানটা যখন পালাচ্ছিল তার হাতে লম্বা মত কিছু একটা ঝুলছিল। সেটাকে হাত থেকে টেনে ছাড়াতে ছাড়াতে দৌড়ে চলে গিয়েছিল সে। ছেলেকে কোল থেকে নামিয়ে গেল সে জানালার কাছে। ঘরের পেছন দিকটা বলে সচরাচর যাওয়া হয়না সেদিকে। সেখানে গিয়ে সে দেখে দূরে পড়ে আছে সাপটার বাকি অর্ধেক অংশ। চোখ থেকে জল বেরিয়ে আসে তার। এই ভেবে যে আমার ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের প্রাণ দিল সে এই জন্যই বোধ হয় মা, মা...ই হয়। এই জন্যই বোধহয় কোকিলের বাচ্চাটাকে বাসায় রেখে সমান মায়া-মমতা দিয়ে ভালোবাসে মা কাকটা....


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।