বাবা - রূপবালা সিংহ রায়//বাংলা গল্প//Bangla Golpo//Bengali Story//Father's day story ।

 

বাবা

রূপবালা সিংহ রায়


ঝড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঝড়ের গতিতে বাইক চালাচ্ছে সুজিত। হাতে মস্ত একটা কেকের প্যাকেট। ঘড়ির কাঁটা নটা ছুঁই ছুঁই। এদিকে সন্ধ্যে থেকে শুরু হয়েছে ঝড় বৃষ্টি। মাঝে জোরে বৃষ্টি হওয়ায় বেশ দেরি হয়ে গেছে তার। কেক যাতে নষ্ট না হয়ে যায় সেই কারণেই দাঁড়িয়ে গিয়েছিল একটু। কিন্তু সে আর কি মানুষ বোঝে! তারা বোঝে টাকা দিয়ে অর্ডার করেছি মানে তা সময় মত হাজির হওয়া চাই। এইতো আগের ডেলিভারিটা করতে গিয়ে কত কথাই না শুনতে হলো তাকে-- এত দেরি হল কি করে? বাচ্চাটা কতক্ষণ অপেক্ষা করে আছে ইত্যাদি ইত্যাদি... কথা শুনিয়েও শান্তি হলো না তাদের, রিভিউটা পর্যন্ত খারাপ দিল! পরেরটাতে কি হবে কে জানে! ওদিকে বাড়িতেও ফিরতে হবে। আজ আবার ছেলেটার জন্মদিন। যদিও ছোট্ট দেখে একটা কেক সে নিয়েছে তার জন্য। সেইসঙ্গে বউকে বলে এসেছে একটু চিকেন এনে রান্না করতে। ছেলেটা চিকেন খেতে খুব ভালোবাসে, ওটুকু হলেই ও খুশি। এরপর যদি কেকটা দেখে তো আনন্দে পাগল হয়ে নাচতে শুরু না করে ভাবতেই এক হালি হাসি ফুটে এলো তার মুখে। ইচ্ছা ছিল একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার কিন্তু এই ঝড়টাই সব পন্ড করে দিল। অবশেষে গুগল ম্যাপ দেখে সে এসে পৌঁছালো নির্দিষ্ট ঠিকানায় কেকটা ভেলিভারি দেওয়ার জন্য। এদিক ওদিক তাকিয়ে কাস্টমারকে ফোন করতে যাবে অমনি শুনতে পেল -- ও ভাই উপরে এসো, এক্কেবারে উপরে ছাদে। ওপরে আসতে সেই ভদ্রলোকটি বললেন -- এত দেরি হল যে? সুজিত ভাবলো এবার সে শেষ। না জানি আরো কত কি শুনতে হবে তাকে! চুপ করে কেক হাতে করে দাঁড়িয়ে আছে সে প্যান্ডেলের বাইরে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও খোলা গেটটা দিয়ে তার চোখ দুটো চলে গেল প্যান্ডেলের মধ্যে। সারা প্যান্ডেলটা রংবেরঙের বেলুন আর আলো দিয়ে সাজানো। প্যান্ডেল ভর্তি অনেক ছোট ছোট বাচ্চা ও বড়রা নিশ্চয়ই পার্টি হচ্ছে। তারই মাঝে ঘর আলো করে বসে আছে তার ছেলের বয়সী একটা ছেলে। মাথায় বার্থডে টুপি পরনে দামি স্যুট-বুট, হাতে ঘড়ি। সামনে থাকা টেবিলটার পাশে পড়ে আছে তিনটে বড় বড় কেকের খালি বাক্স। হয়তো কম পড়ে গেছে বলে এটা অর্ডার করেছেন তারা। একদিকে চলছে গল্পগুজব অন্যদিকে চলছে খাওয়া দাওয়া। এমন সময় একজন ভদ্রমহিলা এসে তার হাত থেকে কেকের প্যাকেটটা নিয়ে তাকে ঘরে আসতে বলল। কেমন যেন লাগছে যেতে ভেতরে সুজিতের। তাই বলল -- নানা ম্যাডাম ঠিক আছে...


অমনি সেই লোকটা যিনি দেরি হওয়ার কথা বলছিলেন উনি বললেন -- কি ঠিক আছে? ঠিক নেই কিছু আজ আমার ছেলের জন্মদিন, তুমি ওর জন্য কেক নিয়ে এলে আর তোমায় কিছু না খাইয়ে কি করে পাঠাই বল? 


-- এটা তো আমার কাজ স্যার 


-- এই এসো তো বলে উনি সুজিতের হাত ধরে নিয়ে গেলেন প্যান্ডেলের মধ্যে যেখানে সবাই খাওয়া-দাওয়া করছে। সুজিত কি করে খাবে বুঝতে পারছে না! পেটে ছুঁচো ডন মারছে তবুও যেন খেতে ইচ্ছা করছে না তার, মাথার মধ্যে কেবল ঘুরছে ছেলের কথা। ছেলেটা বাড়িতে বসে আছে তার অপেক্ষায়। সে গেলে তারপরে খাবে, ফোন করে সেটা জানিয়েও দিয়েছে সে। ওদিকে ব্যাগে রাখা আছে তার কেকটা। তাকে ফেলে কি করে খাই এত ভাল ভাল খাবার? মনে পড়ে গেল -- তার বাবার কথা। রাজমিস্ত্রি কাজ করতো বাবা। বিল্ডিং তৈরি হয়ে গেলে ঠিকাদার যেদিন খাওয়াত বাবা সেদিন মাকে বলে যেত 'ওদের একটু দেরি করে খেতে দিও'। আমরা ভাই বোনেরা অপেক্ষা করে থাকতাম বাবার জন্য। বাবা সঙ্গে করে নিয়ে যেত তার খালি টিফিন কৌটোটা আর তাতে ভর্তি করে আনত মাছ-মাংসের তরকারি। বাদই দিলাম বাবার কথা অনেক ভালো ভালো বড়লোককে দেখেছি যাদের আছে বাচ্চাকে কিনে খাওয়ানোর মতো টাকা পয়সা। তারাও তো বলে এখন পেট ভর্তি আমারটা বরং পার্সেল করে দাও। এটা বোধহয় বাবাদের ধর্ম সে ধনী হোক কিংবা গরীব। 


-- কি হলো ভাই খাচ্ছ না কেন? এই এখানে প্লেট দিয়ে যাও,খাবার নিয়ে এসো...


-- দাদা আমি খেতে পারব না। আজ আমার ছেলেটার জন্মদিন। ও আমার জন্য বসে আছে না খেয়ে। কিছু মনে করবে না দাদা। আমাকে ক্ষমা করে দেবেন বলে সে উঠতে গেলে ভদ্রলোক তার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বললেন -- এই শুনছো ভাইটার খাবারগুলো পার্সেল করে দিও তো। আর একটু বেশি করেই দিও। আজ ওর ছেলেরও জন্মদিন 


-- ঠিক আছে করে দিচ্ছি কিন্তু কেকটা অন্তত খেয়ে যাক..


-- না না পারবে না ও খেতে, ওর গলা থেকে নামবে না। ওটাও পার্সেল করে দাও


-- তোমার মত তাই না। 


-- ঠিক ধরেছ, আজও বাবারা অমনই আছে.....



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।