বসন্ত বিরহ- রূপবালা সিংহ রায়// বাংলা গল্প// নতুন গল্প// Bengali Story//New Bengali Story//বসন্তের গল্প।
খবরের কাগজে চোখ বোলাতে বোলাতে প্রতুল বাবুর হঠাৎই চোখ পড়লো তাঁর স্ত্রী রুক্মিণীর উপর। রোদ ঝলমলে বসন্তের এই সকালটারই মত সেও যেন এই পঞ্চাশ ঊনপঞ্চাশ বছর বয়সেও ঝলমল করছে। তার চেহারায় নেই এতোটুকু ক্লান্তি-বিরক্তি এমনকি একাকিত্বের ছাপটুকুও। যেমন বিয়ের প্রথম প্রথম লাগত তাকে আজ যেন ঠিক তেমনটাই লাগছে। প্রাণবন্ত শান্ত কোমল সুশীল। আনমনে ব্যালকনিতে থাকা তার শখের ফুল গাছগুলোকে পরিচর্যা করছে সে। এটাই তার সারাদিনের রুটিনের মধ্যে অন্যতম এক কাজ এখন। বাড়িতে মানুষ বলতে তিনি আর রুক্মিণী। ছেলে চাকরি সূত্রে বাইরে থাকে বৌমা আর নাতনিকে নিয়ে। মেয়ে দুটো ব্যস্ত যে যার সংসারে। বড্ড অবাক লাগে তাঁর রুক্মিণীকে দেখে! কিভাবে সে ভালো থাকে একা একা? চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের এই তিন মাস হল এতেই যেন হাঁপিয়ে উঠেছেন তিনি খাঁ খাঁ এই বাড়িটাতে থাকতে থাকতে। আগে কাজের চাপে কেবলই মনে হতো বাড়ি থাকলে বোধহয় ভালো থাকা যেত কিন্তু এখন তাঁর আর ভালো লাগছে না। তবুও সকালে মর্নিং ওয়াকে যাচ্ছেন, বিকেলে চায়ের দোকানে। আর রুক্মিণী তো একদমই বার হয় না ঘর থেকে। সারাদিন ঘরের কাজ করতে থাকে। কি করে পারে ও? কৌতূহলটা মেটানোর জন্য গেলেন তার কাছে। কোনো কিছু না বলেই একে একে হাত বোলাতে লাগলেন বাগান বিলাস, গোলাপ, মধুমালতি, কাঠগোলাপ, কামিনী ও বিভিন্ন রকমের নয়নতারা ফুলের পাপড়ি গুলিতে।
-- কিছু কি বলবে?
-- না তেমন কিছু নয়
-- ও আচ্ছা বলে আবারও নিজের কাজে মনোনিবেশ করল রুক্মিণী। আর আড় চোখে লক্ষ্য করতে লাগলো ব্যালকনিতে প্রতুল বাবুর ইতস্তত ভ্রমণ। কিছু আর না বলে নিজের কাজ সেরে সে গেল স্নান ঘরে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল প্রতুল বাবুর চায়ের দোকানে যাওয়ার নামই নেই। অগত্যা নিজের জন্য চা বসাতে বসাতে রুক্মিণী তাকে জিজ্ঞাসা করল -- বলছি, বেরোবে নাকি চা বসাবো?
-- আজ আর বেরোতে ইচ্ছা করছে না। তুমি বরং চা-ই.. বসাও।
সোপায় বসা প্রতুল বাবুর হাতে চায়ের কাপটা ধরিয়ে রুক্মিণী গেল তার সাধের ব্যালকনিতে। আনমনে চায়ে চুমুক দিচ্ছে আর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে তার গাছগুলোকে। তাই দেখে প্রতুল বাবুও গেলেন সেখানে। তারপর জিজ্ঞাসা করেই ফেললেন নিজের মনের মধ্যে ঘুরতে থাকা প্রশ্নটা।
মুচকি হেসে রুক্মিণী বলল -- শিখে গেছি জানো, একা থাকাটা শিখে গেছি। বিয়ে হয়ে তোমার বাড়ি আসার পর খুব দম বন্ধ লাগতো আমার। গ্রামের খোলামেলা পরিবেশে বড় হওয়া আমি এই ইট পাথরের চার দেয়ালে বড্ড হাপিয়ে উঠতাম। দম বন্ধ হয়ে আসতো। তার ওপর তোমার হাতেও ছিল না পর্যাপ্ত সময় আমায় দেওয়ার মত। তারপর একে একে বাচ্চারা এলো ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। ক্রমে ওরাও বড় হল স্কুল কলেজে যেতে শুরু করল। আমি আবারও একটু একটু করে একা হতে শুরু করলাম। খুব মন খারাপ হতো। মনে পড়ে সেদিনের কথা তরকারিতে কোনো কারনে লবণ দিতে ভুলে গিয়েছিলাম। তুমি কত কথা শুনিয়েছিলে। তোমার ওপর অভিমান জমতে জমতে একদিন খুব রাগ হয়েছিল নিজের ওপর। তারপর থেকে একটু একটু করে নিজের ভালোলাগার কথাটা ভাবতে শুরু করি। কি হবে নিজেকে খারাপ রেখে বলো? যতই যাই হোক তোমরা বাইরে গিয়ে দুটো মানুষের সাথে কথা বলো ভুলে যাও সব কথা। ভুলতে পারিনা আমি। গুমড়ে গুমড়ে মরি সারাদিন। তারপর একটু একটু করে তৈরি করি আমার এই ছোট্ট বাগানটা। ভালো আছি আমি এদের নিয়ে। আমার আর কাউকে লাগেনা।
-- আমাকেও না?
-- ছিঃ অমন কথা বলতে নেই। ও কথা শোনাও যে পাপ। তুমি দেখো আমি তোমার আগে যাব..
-- তুমি গণৎকার বুঝি?
-- তা আমি জানিনা। তবে প্রতিশোধ নেওয়ার আছে যে..
-- প্রতিশোধ! কিসের প্রতিশোধ?
-- ওই যে তুমি আগে কথায় কথায় বলতে চলে যাও। তাই আমি চাই, আমি যেন আগে যাই। তখন বুঝবে আমি ছাড়া থাকতে কেমন লাগে।
হঠাৎ করে ছেলের ডাকে সম্বিৎ ফিরলো প্রতুল বাবুর। -- বাবা, কি হলো কিছু বলছো না যে?
চশমাটা খুলে ঝাপসা হয়ে আসা চোখ দুটো ডান হাত দিয়ে হালকা মুছে নিয়ে প্রতুল বাবু বললেন -- নারে বাবু, আমি যাব না তোর সঙ্গে। তুই নিশ্চিন্তে ফিরে যা। আমি ভালোই থাকবো এখানে।
কিছুটা রাগ আর কিছুটা অভিমান নিয়ে ছেলে গিয়ে বসলো সোফাতে।
তাই দেখে বড় মেয়ে গিয়ে বলল তার বাবাকে -- বাবা তুমি একা একা থাকবে কি করে? মা নেই, তোমার দেখাশোনা কে করবে?
ছোট মেয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল -- তোমায় একা এখানে রেখে আমরা কিভাবে নিশ্চিন্তে থাকবো বাবা?
-- ভাবিস না তোরা আমায় নিয়ে অত। আমি ঠিক থাকব। আর তাছাড়া রান্নার মেয়েটা তো আছে ও রান্নাবান্না করে দিয়ে যাবে।
বড় মেয়ে -- সে তো আর সারাদিন থাকবে না! নিজের কাজ হয়ে গেলে চলে যাবে।
-- বুঝি রে তোদের দুশ্চিন্তার কারণ কিন্তু আমি চলে গেলে তোর মায়ের গাছগুলোর কি হবে রে? আর তাছাড়া তার প্রতিশোধেরই বা কি হবে?
-- প্রতিশোধ!
-- ও কিছু না। চল খুব খিদে পেয়েছে। বাবু আবার বিকেলে বেরোবে। বেলা তো গড়িয়ে গেল।
-- ঠিক আছে, তুমি এসো বলে মেয়েরা খাবার জোগাড় করতে গেল।
ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তখনো পর্যন্ত প্রতুল বাবু। আলতো করে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছেন রুক্মিণীর ফুল গাছগুলোকে। আজও বসন্তের একটা দিন হলেও, দূর থেকে কোকিলের কণ্ঠস্বর ভেসে এলেও বাইরেটা যেন কড়া রোদ্রের তাপে খাঁ খাঁ করছে ঠিক তাঁর বুকের মধ্যেটার মত। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া পথচারীটা রীতিমতো ছাতা হাতে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ঠিক যেমনটা তিনি আজ একা হেঁটে চলেছেন জীবনের এই পথে। তৃষ্ণার্ত কাকটা উড়ে এসে ব্যালকনিতে থাকা জলের পাত্র থেকে জল তুলে তুলে খাচ্ছে আর তৃপ্তি পাওয়ার চেষ্টা করছে, বাঁচার চেষ্টা করছে তার মত করে। পাশের ছাদের দড়িতে মেলে রাখা জামাকাপড় গুলো যেমনি করে কড়া রৌদ্রের তাপে রং হারিয়ে ফেলছে তেমনি করে তিনিও হারিয়ে ফেলছেন জীবনে বাঁচার ইচ্ছাটুকু। অপর পাশের বাড়িটার বারান্দায় রাখা গাছগুলো যত্নের অভাবে, জলের অভাবে তার মতো করে নেতিয়ে পড়ছে। তবুও এত কিছুর মধ্যে রুক্মিণীর ফুল গাছগুলো এখনও ওর স্মৃতিগুলোর মত সতেজ। তারা রংবেরঙের ফুল ফুটিয়ে মৃদু হাওয়ার তালে মাথা নাড়াচ্ছে আর প্রতুল বাবুর একাকীত্বকে, বেদনাকে, স্মৃতিকে, বিরহকে বসন্তের রঙে রাঙিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।
#বিরহ_বসন্ত
#রূপবালা_সিংহ_রায়...🖋️©️
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন