অনুশোচনা // বাংলা গল্প // Bengali Story // Bangla Choto Golpo ।

 অনুশোচনা

রূপবালা সিংহ রায়

হঠাৎ ঘুম ভাঙতেই পাশে শ্রাবণীকে দেখতে না পেয়ে চমকে উঠে বসে পড়ল ঋদ্ধিমান। সবে ভোরের আলো ফুটবে ফুটবে করছে। জানালার পর্দাটা সরিয়ে দেখল চারিদিক না অন্ধকার না তেমনভাবে পরিষ্কার। মনের মধ্যেটা এখনো পর্যন্ত অজানা এক আতঙ্কে অস্থির। কি যে একটা স্বপ্ন দেখছিল ঠিক করে মনে করতে পারছে না সে। তবে তা যে ভয়ানক কিছু একটা নিয়ে ছিল সে ব্যাপারে সে নিশ্চিত। হঠাৎ মাথায় এলো ওয়াশরুমে নেই তো? উঠে গিয়ে দেখল ওয়াশরুমটা। না! ছিটকানিটা তো বাইরে থেকেই লাগানো আছে। তবুও মনের সন্দেহখানা দূর করার জন্য খুলে দেখলো একবার। না নেই সে সেখানে। উঁকি মারলো রান্নাঘরে।তারপর ঘুরে এলো বাচ্চাদের ঘরটাও। সেখানেও নেই সে। তাহলে এত সকাল সকাল কোথায় গেল ও? -- ভাবতে ভাবতে সোফায় বসে পড়ল সে। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তাকিয়ে নিল মেইন দরজাটার দিকে। না, ছিটকানিটা তো উপরেই তোলা আছে। একটা নিশ্চিন্তের ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল তার সমগ্র অঙ্গ প্রত্যঙ্গ জুড়ে। তাহলে নিশ্চয়ই দাঁড়িয়ে আছে ব্যালকনিতে। ভেবে আস্তে করে উঠে সে ব্যালকনিতে যাওয়ার দরজাটা খুলে গেল সেখানে। তারপর মৃদু পায়ে গিয়ে দাঁড়ালো শ্রাবণীর পাশে। ততক্ষণে অন্ধকারটা সরে গেছে। চারপাশটা মোটামুটি দৃশ্যমান। শোনা যাচ্ছে পাখির কূজন। দু একজন পথচারী মর্নিং ওয়াক করতে বেরিয়েও পড়েছেন। খবরের কাগজের ছেলেটা সাইকেলের পেছনে করে এক ঝাঁপি খবরের কাগজ নিয়ে যাচ্ছে বাড়ি বাড়ি বিলি করতে। আলতো নরম হাওয়ায় এদিক ওদিক দুলছে শ্রাবণীর চুলগুলো। আনমনে কি যেন ভেবে চলেছে সে। তাই বাধ্য হয়ে ঋদ্ধিমান জিজ্ঞাসা করল তাকে -- কিগো এত সকাল সকাল উঠে পড়লে যে?


 আচমকা ধ্যান ভাঙার মতো চমকে উঠে শ্রাবণী বলল -- ও তুমি আমি! তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। উফ! এমনভাবে ভয় দেখায় কেউ? বুকটা এখনো ধড়ফড় করছে।


-- কি ভাবছিলে এত?


-- ও কিছু না। রাতের অন্ধকারকে দূরে ঠেলে কিভাবে ভোরের আলো ফোটে তাই দেখছিলাম..


-- সত্যি বলছো?


-- আরে বাবা হ্যাঁ। কি হয়েছে বলোতো তোমার? কাল থেকে কেমন যেন করছো? যেন মনে হচ্ছে চোখে চোখে রাখছো আমায়!


-- আরে ধুর, যা তা একেবারে। চোখে চোখে কেন রাখতে যাব?


-- উঁহু, আমি বিশ্বাস করছি না তোমার কথা। যতই তুমি ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করো, ঢাকতে পারবেনা। আমি চিনি না তোমায়.. তাই যদি না হবে তবে কেন উঠলে এত সকাল সকাল?


 শ্রাবণীর কথার কোনো প্রতি উত্তর না দিয়েই ঋদ্ধিমান ডুবে গেল গত পরশুদিনে। কেন যে মাঝে মাঝে মাথাটা এত গরম হয়ে যায় নিজেই বুঝতে পারে না সে। চাইলেও নিজেকে বাগে রাখতে পারে না। মুখ থেকে বেরিয়ে আসে আজেবাজে কথা। আর তার শিকার হয় শ্রাবণী। পরে খুব আফসোস হয় তার। কেন বললাম কথাগুলো? না বললেই তো পারতাম। ভালো করেও তো বলা যেত। অতটা না বললেও হত। ও খুব কষ্ট পেল এমন হাজারো কথা ঘুরতে থাকে তার মাথার মধ্যে। অনুশোচনার আগুনে পুড়তে থাকে গোটা দিনটা। এমনই অনুশোচনার আগুনে পুড়তে পুড়তে নিজের উপর রাগ হচ্ছিল তার নিজের এই ব্যবহারের জন্য। ভাবছিল কিভাবে এর থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়, তাই এই নিয়ে এক বন্ধুর সাথে কথাও হয় তার। সে বলে -- মেডিটেশন কর। ধুর! মেডিটেশন কি সে করতে চাইনি মনই বসে না। মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে হাজারও চিন্তা। আজ সারাদিন কি করব? বাজারে যেতে হবে, অফিসে কি কি কাজ আছে? বাচ্চা দুটোকে স্কুলে ছাড়তে হবে। ওদের আবার এডমিশন চলে এলো। শেষ পর্যন্ত আর করা হয়ে ওঠেনা মেডিটেশনটা।

 অফিস থেকে বেরিয়ে বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে বলতে সে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে ঢোকে পাশে থাকা একটা পার্কে। দুপাক হাঁটার পর একটা খালি বেঞ্চ দেখে বসতে যাবে তখন কানে এলো এক বৃদ্ধ ভদ্রলোকের কণ্ঠস্বর ততক্ষণে বন্ধু ফোনটা রেখে দিয়েছে -- সাবধানে, বাঁদিক দিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটো। দেখো কারো ধাক্কা না লাগে। অসুস্থ ধীরুগামী ভদ্রমহিলা তাঁর দিকে না তাকিয়েই নিজের মতো হাঁটছেন আর বলছেন--  আর দেখে হেঁটে কি হবে? আমি কি আর বেঁচে আছি, কবেই মরে গেছি! এবার শ্বাসটুকু গেলেই বাঁচি। জীবনের প্রতি যে তাঁর বিতৃষ্ণা এসে গেছে তাঁর কথায় তা স্পষ্ট। হঠাৎ করে একটু হোঁচট খেলেন তিনি। ঋদ্ধিমান ধরতে যাওয়ার আগেই নিজেকে সামলে নিলেন। তা দেখে ভদ্রলোক আবারো বললেন -- দেখে হাঁটো। তা শুনে ভদ্রমহিলা বললেন -- এখন শেষ জীবনে দরদ একেবারে উথলে পড়ছে। সারা জীবন যখন জ্বালিয়েছিলে কই তখন তো আসেনি তোমার দরদ? সে কি কথা! খোঁটার পরে খোঁটা! এখন করছে, জানে কদিনই বা আছে তাই। তা না হলে কে করত এসব? ভদ্রমহিলার কথাগুলো শুনে আর না বসে সেগুলো ভাবতে ভাবতে পায়ের গতি বাড়িয়ে ঋদ্ধিমান আর এক পাক ঘুরে এলো ভদ্রলোকটির কাছে । দেখলো বয়সের ভারে তার চামড়াগুলো বেশ খানিকটা ঝুলে পড়েছে। চোখেমুখে ঘুম ঘুম ভাবের ছাপ স্পষ্ট। হয়ত স্ত্রীকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে রাতে ঘুম হয়নি। সেই সঙ্গে রয়েছে সঙ্গী হারানোর এক তীব্র আতঙ্ক। এই বৃদ্ধ বয়সে সেই যে তাঁর দিন রাত্রির একমাত্র সঙ্গী। অন্যরা যারা একসময় জীবন জুড়ে ছিল তারা এক এক করে কালের নিয়মে ছেড়ে গেছে। এখন এও যদি যায় কি হবে তাঁর? হয়তো তার মত তিনিও অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ। যে সময় সাথ দেওয়ার ছিল দেননি। ভালোবেসে দুটো ভালো কথা বলার ছিল বলেননি। তাই হয়তো মাসিমার মনে এত ক্ষোভ, রাগ আর অভিমান। না, এবার একটু শোধরাতে হবে নিজেকে। প্রয়োজনে ডাক্তার দেখাবো -- ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফিরে আসে সে।


-- কিগো কোথায় হারিয়ে গেলে? আবার আমায় বলছিল বড়ো - মুখ  বেঁকিয়ে কথাটা বললে শ্রাবনী।


-- ও কিছু না বলে মুচকি হেসে রিদ্ধিমান জড়িয়ে ধরে তাকে। ততক্ষণে পুব আকাশে দেখা যাচ্ছে রক্তাভ কোমল সূর্যটাকে। আর তার পাশ থেকে উড়ে যাচ্ছে দুটো রঙিন পাখি।


#অনুশোচনা

#রূপবালা_সিংহ_রায়

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।