রাঙিয়ে দিয়ে যাও - রূপবালা সিংহ রায়// বাংলা গল্প// দোলের গল্প// Bengali Romantic Love Story//Love Story//ভালোবাসার গল্প।
রাঙিয়ে দিয়ে যাও
রূপবালা সিংহ রায়
স্কুলে ছুটির ঘন্টা পড়তেই বেশ একটু ইচ্ছাকৃতভাবে, তড়িঘড়ি করে বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিল তনুজা । তাড়াতাড়ি বেরিয়ে না পড়লে মেঘনা, তিয়াসা, অনুরাধা আবার ধরে ফেলবে রং মাখানোর জন্য। গতকালই তো মেঘনা বলছিল- ছুটির পরে অপেক্ষা করিস সবাই স্কুল মাঠে রং খেলা হবে। তাই শুনে তিয়াসা বলেছিল - তুই তো এক্ষুনি বাচ্চাদের গিয়ে বলে এলি, আগামীকাল যেন ক্লাসে রং না নিয়ে আসে। আর তুই নিজেই নিয়ে আসবে টিচার হয়ে! মেঘনা রাগ দেখিয়ে বলেছিল - এই বেশি বকিস না তো। বাচ্চারা কি দেখতে যাবে আমরা কি করছি, না করছি? ছুটির পর সব বাচ্চারা যখন বেরিয়ে যাবে তখন খেলবো। আর তুই কি ভাবলি ওরা রঙ আনবে না? নিশ্চয়ই আনবে আর লুকিয়ে রাখবে সেটা। তারপর স্কুল গেটের বাইরে গিয়ে কি করবে সেটা দেখিস। আমরা তো আর ওদের মতো রাস্তায় গিয়ে রং খেলতে পারবো না তাই স্কুল মাঠটাই শ্রেয়। আর তাছাড়া অত ভাবিস না তো প্রিন্সিপাল ম্যামের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে আমার। অন্যান্য স্যার ম্যামেরাও থাকবে সেখানে। বেশ মজা হবে- এসব বলতে বলতে মেঘনা এসে ধরেছিল তনুজাকে। তনুজা, মেঘনা, তিয়াসা আর অনুরাধা প্রায় সমবয়সী বলেই ওদের মধ্যে ভাবটাও প্রবল। অন্যান্য স্যার ম্যামেরা ওদের চারমূর্তি বলেও ডাকে। তনুজা এখানে চাকরি করছে তা প্রায় পাঁচ বছর হবে। স্কুলের বাচ্চারা তাকে বেশ ভালবাসে। ভালো টিচার হিসেবেও তার খুব নাম। মেঘনা এসে রং খেলার কথা বলায় কোনো রকমে হ্যাঁ হু করে বেরিয়ে এসেছিল সে গতকাল। মন চাইলেও যে পরিস্থিতি তার সাথ দেয় না তাই তো আজ ছুটির ঘন্টা বাজতেই অনুরাধাকে না থাকতে পারার একটা অজুহাত দিয়ে বেরিয়ে পড়ল তাড়াতাড়ি করে। পাছে মেঘনা না তাকে দেখে ফেলে। সে দেখে ফেললে আর রক্ষে থাকবে না। কিছু বলার আগেই না আবার রং মাখিয়ে ভূত করে দেয়!
স্কুল গেটের বাইরে বেরিয়ে এসে দেখে তনুজা, মেঘনার কথাই সত্যি। বাচ্চারা সব রং খেলায় মেতেছে। যদিও আজ দোল নয়, দোল আগামীকাল। কিন্তু স্কুল বন্ধ থাকবে, তাই তারা আজই রং মাখাচ্ছে বন্ধুদের। বাদ নেই মায়েরাও। তারাও মেতেছে বাচ্চাদের সঙ্গে। এইতো জীবন। জীবনে এই ছোট ছোট খুশি গুলো না থাকলে সেটা আবার কিসের জীবন! সবার জীবনে এই রঙের ছোঁয়া থাকলেও রং নেই তার জীবনে। বছর তিনেক আগে তা মুছে গেছে তার স্বামী পুলকের সঙ্গে। আজ যে সে বিধবা। যদিও সেসব মানতে নারাজ সে। এখনকার যুগে দাঁড়িয়ে কে মানে ওসব? কিন্তু মানতে হয়, কথার ভয়ে। যদিও সে এখন আর থাকে না তার শ্বশুরবাড়িতে। তাই তাদের কাছ থেকে কোনো কথা শুনতে হয় না। কথা শুনতে হয় নিজের বৌদির কাছ থেকে। মা কিছু বলতে পারেনা বললে অশান্তি চরমে ওঠে, ভালো লাগে না তনুজার। খুব ভাবে চায় আলাদা জায়গায় থাকতে কিন্তু পারেনা মায়ের জন্য। মা বলে-- মেয়ে মানুষ হয়ে একা একা থাকবি? গ্রাম গাঁ বলে কথা পাঁচ জনে পাঁচ কথা বলবে কি দরকার বল? আর তাছাড়া এটাও তো তোরই বাড়ি। থাক না তুই তোর মত আলাদা হয়ে তোর ঘরে। তুই যদি আমার আরেক ছেলে হতিস থাকতিস না বল? পারতিস ছেড়ে যেতে আমায়? খুব কান্না পায় তনুজার। বলে -- তুমি চলো আমার সঙ্গে মা মেয়েতে ভালই থাকবো আমরা। কিন্তু গ্রামের সহজ সরল লেখাপড়া না জানা গৃহবধূ মা স্বামীর ভিটে ছেড়ে অন্য কোথাও থাকতে নারাজ। তাই বাধ্য হয়ে তাকে থাকতে হচ্ছে মায়ের সঙ্গে।
আনমনে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কানে এল-- ম্যাম রং দিই একটু?
-- এই না না! একেবারেই না। নিজেরা মাখছিস মাখ, আমায় মাখাবি না।
তাই শুনে বাচ্চারা আবারো নিজেদের মধ্যে রং খেলতে শুরু করলো। তাই দেখে মুচকি হেসে হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে থাকে তনুজা - ছোটবেলাকার কথা। এমনই দোলের দিনে দাদার সঙ্গে দোল খেলার কথা। বড়দের পায়ে আবির ছোঁয়ানোর কথা। একটু বড় হয়ে কলেজ থেকে ফেরার সময় বন্ধুদের সঙ্গে আবির খেলার কথা। বিয়ের পর পুলকের সঙ্গে উদযাপন করা প্রথম দোলের সময় শান্তিনিকেতন যাওয়ার কথা। মনে পড়ে বছর ঘুরতে না ঘুরতে, সেই রং জীবন থেকে মুছে যাওয়ার কথা। সেইসঙ্গে মনে পড়ে গত বছর দোলের দিন স্কুল মাঠে রং খেলার কথা। মেঘনা ওরা জোর করে সেদিন রং মাখিয়ে দিয়েছিল তাকে। সেও রং মাখিয়েছিল তাদেরকে। তারপর বাড়ি ফিরতে শুরু হয় বৌদির কথা। উল্টোপাল্টা কথা শুনে তারও রাগ হয়, সেও বলে। কিছু কথা কাটাকাটিও হয়। তারপর রাতে দাদার কানে কথাটা উঠলে দাদাও কেমন যেন বৌদির কথায় কথা মিলিয়ে একই কথা বলে। খুব কষ্ট হয় তনুজার। দাদা ওসব বিশ্বাস করে ভাবতেও অবাক লাগে তার! তাই এ বছর রংয়ের থেকে এড়িয়ে যাওয়া।
সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ইতিমধ্যে সে এসে পৌঁছায় স্টেশনে। এখনো তার ট্রেন ঢুকতে মিনিট পনেরো বাকি। তাই সামনের লেডিসে যাওয়ার জন্য স্টেশনের উপর ইতস্তত হাঁটতে থাকা লোকগুলোকে কাটিয়ে কাটিয়ে হাঁটতে থাকল সে। এমন সময় এক মুঠো রং এসে রাঙিয়ে দিল তার মুখ-কপাল-মাথা। কোনোরকমে চোখ দুটোকে ঝেড়ে বিরক্তি ভাবে তাকাতে চোখ পড়ল একমুখ হাসি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে অনিরুদ্ধ দার ওপর। তাকে অমন হাসতে দেখে আরো রাগ হলো তনুজার। রাগে মুখ থেকে কোনো কথা বার হচ্ছে না তার। অনিরুদ্ধ মেঘনার দাদা। একবার মেঘনার জন্মদিনে ওদের বাড়িতে গেলে তনুজার দেখা হয় তার সঙ্গে। তারপর মেঘনাকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া, নিয়ে যাওয়ার অছিলায় অনেকবার তনুজার সঙ্গে দেখা হয়েছিল তার। একদিন মেঘনা তো কথায় কথায় বলেই ফেলেছিল তুই আমার বৌদি হবি তনুজা? তাহলে দুই বন্ধুতে মিলে একসঙ্গে থাকতে পারবো। সেই সাথে খুব মজাও হবে। আর তাছাড়া আমার দাদার মনে হয় তোকে খুব পছন্দ হয়েছে। দেখিস না আজকাল আমায় কেমন বাইকে করে স্কুলে ছেড়ে দিয়ে যায়। কই তোর সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে তো আমি হাজার বার বলার সত্ত্বেও ছাড়তে আসেনি। কথাটা তখন কানে না তুললেও আজ তার সত্যতা ভালো করেই বুঝতে পারছে সে। সেও যে মনে মনে অনিরুদ্ধকে পছন্দ করে না সে কথা সে অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু সে যে বিধবা সেই কথাটাও ভুলতে পারেনি এখনো পর্যন্ত সে।
কোনো রকমে নিজেকে সামলে সে বলল -- এটা কিন্তু ঠিক করলেন না অনিরুদ্ধদা।
-- কেন রং মাখানো কি অপরাধ?
-- সেসব আমি জানিনা তবে কারোর অনুমতি ছাড়া রং মাখানোটা একেবারে উচিত নয় বলে আমার মনে হয়..
-- আমারও তাই মনে হয় তনুমা। এই দুষ্টু দুটোকে নিয়ে আর পারিনা। তুই একটু শাসন করে দে তো। এই দেখ আমাকেও কেমন রং মাখিয়ে সং সাজিয়ে দিয়েছে এই মেয়েটা। এই অবস্থায় কি করে যাই বলতো তোদের বাড়ি? তোর মায়ের সঙ্গে কথা বলতে, তোকে আমার বৌমা বানানোর জন্য। তুই বরং আজ একাই যা। আগামী কাল-পরশু আমি যাবো তোদের বাড়ি। অনিরুদ্ধের বাবার মুখে কথাগুলো শুনে কেমন যেন লজ্জা পেল তনুজার।
-- আরে তোর ট্রেন ঢুকছে তো! দাদাকে রংটা মাখিয়ে দিয়ে যা বলে মেঘনা এক মুঠো রং ধরল তনুজার সামনে। অনিরুদ্ধও এক বুক প্রত্যাশা নিয়ে মুখ বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে তনুজার সামনে। আর তার কানে ভেসে আসছে রবি ঠাকুরের গান - "রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও , যাও গো এবার যাবার আগে"--
তনুজা মেঘনার হাত থেকে একটু রং নিয়ে অনিরুদ্ধকে মাখাতে গিয়েও না মাখিয়ে ট্রেনে উঠতে উঠতে বলল -- আগামীকাল দোল আজ নয়, রং মাখতে হলে চলে এসো...
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন