বাংলা গল্প//নববর্ষের গল্প//Bangla Golpo//Bengali Story//Bangla Choto Golpo ।
পয়লা বৈশাখের ভুড়িভোজ
রূপবালা সিংহ রায়
ধুর ! কেউ সংসার করে ! সংসার এমন হয় জানলে কে করতো বিয়ে শুনি ? একে তো গিন্নির জ্বালায় জর্জরিত , তারপর চৈত্র মাস শেষ হতে না হতেই ভ্যাপসা গরম । জীবনখানা জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে এক্কেবারে - আপন মনে ভাবতে ভাবতে বিরক্তি ভাবে এক হাতে বাজারের ব্যাগ আর অন্য হাতে ছাতাটা নিয়ে বাড়ি ফিরছেন আশুতোষ বাবু । বয়স এই পঁয়ষট্টির কাছাকাছি । দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে । এখন সংসারে মানুষ বলতে তিনি আর তার স্ত্রী । রিটায়ারমেন্টের পেনশনে এতে তাতে করে বেশ চলছে তাদের সংসার । এমনিতেই স্বভাবে বেশ শান্ত প্রকৃতির মানুষ তিনি । সাত কথায় এক কথা বলেন । খুব সহজে তাঁর মাথা গরম হয় না । কিন্তু আজ তিনি বেজায় রকম চটে আছেন । সকাল বেলা বাজারে আসার সময় গিন্নিকে বলেছিলেন -" আজ পয়লা বৈশাখ , তো অল্প করে একটুখানি মটন নিয়ে আসি । দুজনে মিলে খাব"। তা শুনে গিন্নি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বললেন - "বয়স হচ্ছে সে খেয়াল আছে । তিন দিন আগে যখন মেয়ে জামাই এলো খেলে তো তখন মটন" । আশুতোষ বাবু সবে বলতে যাচ্ছিলেন -"সে তো এক টুকরো । কি হয় তাতে" ? তার কথা শেষ হওয়ার আগেই গিন্নি বললেন -" অত লোভ করো না তো । যাও সকাল সকাল বাজার যাও দেখি । যা গরম পড়েছে ! বেলা বাড়লে আবার রোদের তেজও বেড়ে যাবে । এই নাও ফর্দ , সব মিলিয়ে মিলিয়ে আনবে কিন্তু । একটাও যেন বাদ না যায়" । ফর্দ দেখে মাথায় হাত আশুতোষ বাবুর । করলা থেকে শুরু করে কাঁচকলা , সজনে ডাটা , বেগুন , নিমপাতা , ঝিঙে , পটল , রাঙা আলু , ঠাকুরের পঞ্চমিষ্টি , ফুল-বেলপাতা সব আছে কিন্তু মাছ-মাংসের নাম গন্ধ টুকুও নেই । মটন না হয় নাই হলো চিকেন তো হতে পারতো । আচ্ছা তাও না হয় বাদ দিলাম ইলিশ না হোক একটা বড় রুই মাছ তো আনতে পারতাম । কাল চুনো মাছ এনেছিলাম বলে কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে ছিল । যাই একটা বড় মাছ আনার কথা বলি গিয়ে ভেবে মনের মধ্যে একরাশ উচ্ছ্বাস নিয়ে রান্নাঘরে গিন্নিকে যেই না বলতে যাবে , অমনি গিন্নি বলে উঠলেন - "এখনো যাওনি বাজারে ? বেচারা ! আশুতোষ বাবু আর কথা বলার সাহসটুকুও না পেয়ে হতাশ হয়ে বাজারে গেলেন ।
বাড়ি ফিরে হাতমুখ ধুয়ে সকালের খাবার খেতে বসলেন তিনি । সামনে হাজির সেই দুটো আধ পোড়া রুটি , একটু ভেন্ডি ভাজা আর চিনি ছাড়া এক কাপ চা । মুখ বেঁকিয়ে খেতে খেতে গন্ধ পাচ্ছেন আশুতোষ বাবু , কাদের বাড়ি যেন মটন রান্না হচ্ছে । আহ্ ! একবার করে মাটনের গন্ধ শুকচ্ছেন আর খাচ্ছেন । খাওয়া শেষে প্রতিদিনের মতো খবর দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি ।
ঘুম ভাঙলো গিন্নির চিৎকারে -"বলি এই গরমে সারাদিন কি হেঁসেলেই পড়ে থাকবো ? আসুন মহারাজ দুটো অন্ন গ্রহণ করে আমায় কৃতার্থ করুন । আশুতোষ বাবুর কোনো হেল দোল না দেখে গিন্নি আরো ক্ষেপে গিয়ে বললেন - "বাবুর পায়ে ধরে খাওয়াতে হবে নাকি "? আশুতোষ বাবু বললেন -"আমি খাব না। আমায় কৃতার্থ করতে হবে না বেগম সাহেবা ! আপনি আপনার কাজে যান" । গিন্নি আরো রেগে গিয়ে ডাইনিং টেবিলে রাখা ভাতের থালাখানা যেই না সবেমাত্র দু হাত দিয়ে উঁচু করেছে অমনি আশুতোষ বাবু অনর্থ হবে ভেবে তড়িঘড়ি করে এক লাফে উঠে খাবার টেবিলে গিয়ে বসলেন ।
গিন্নি - "তুমি যে বললে তুমি খাবে না "।
আশুতোষ বাবু -"না খেয়ে কি উপায় আছে? খেলে তবু ভাতগুলো আমার পেটে যাবে। আর না খেলে তো সেগুলো সারা মেঝে জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবে যে ! তারপর সেই ভাতগুলো আবার আমাকেই তুলতে হবে । শুধু তো সেইটুকু নয় নতুন করে আমাকেই আবার রান্না করে খাওয়াতে হবে । তার থেকে বরং নুন জল যা দাও খেয়েই নিই । তাতেই আমার মঙ্গল ।
গিন্নি এক গাল হেসে তরকারির বাটি দুটো রান্না ঘর থেকে এনে আশুতোষ বাবুর পাশে বসলেন । একটা বাটিতে শুক্তো আর একটা বাটিতে মটন দেখে আশুতোষ বাবু বললেন -"করেছো কি গিন্নি ! মটন কোথায় পেলে ?
গিন্নি - "সেদিন যে এনেছিলে আমি একটু তুলে রেখেছিলাম আজকের জন্য । তোমার মাটন যে খুব পছন্দ সে কি আমি জানিনা ? তার ওপর আজ পহেলা বৈশাখ ! এমন কোনো পয়লা বৈশাখ গেছে যে তোমায় আমি মটন রান্না করে খাওয়াইনি । আর হ্যাঁ সেই যে মেয়ে জামাই যেদিন এসেছিল এক পিস মাংস দিয়েছিলাম বলে তো বুড়োর রাগ হয়েছিল । সেদিন বেশি দেইনি কেন জানো ওখানে অনেক তেল মশলা ছিল । আজ দেখো আমি তোমার জন্য কেমন কম তেল মশলা দিয়ে পাতলা মাটনের ঝোল বানিয়েছি" ।
আশুতোষ বাবু -"গিন্নি তুমি যা বানিয়েছ তাই অনেক । তুমি যদি শুধু নুন দিয়ে সিদ্ধ করে দিতে তাই খেয়ে নিতাম বলে শুক্তো রেখে আশুতোষ বাবু মটন দিয়ে খেতে শুরু করলেন । আর তার স্ত্রী একটু মুচকি হেসে আদুরে কন্ঠে বললেন -"পেটুক কোথাকার"....
কলমে: রূপবালা সিংহ রায়
সকলকে জানাই শুভ নববর্ষের অনেক অনেক শুভেচ্ছা , অভিনন্দন ও প্রণাম । নতুন বছর সবার ভালো কাটুক । ভালো থাকুন , সুস্থ থাকুন । সবসময় হাসিখুশি থাকুন । শুভ নববর্ষ ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন