বাংলা গল্প// নববর্ষের গল্প// Bangla Golpo//Bangla Premer Golpo//Bengali Romantic Love Story//Love Story ।

 নবীন বরণ

রূপবালা সিংহ রায়...🖋️


শর্বরীকে এমন অবস্থায় দেখে বুকের মধ্যেটা পুড়ে খাঁক হয়ে যাচ্ছে তিমিরের । আজ প্রায় ছয় বছর পর দেখা তার সাথে । শেষ যেদিন দেখা হয়েছিল সেদিনের কষ্টটার থেকে আজকের কষ্টটা যেন একশো গুণ বেশি । সেদিন একটা শূন্যতা ছিল ঠিকই তবুও নিজেকে সামলে নিয়েছিল শর্বরীর সুশীল মুখে অফুরান হাসির ছটা দেখে । আজও কানে বাজে শর্বরীর বলা শেষ কথাখানা -" কি গো তিমিরদা কেমন দেখলে আমার বরকে" ? সেদিন ছিল পয়লা বৈশাখ , সেইসঙ্গে শর্বরীর বিয়েও । মামাতো বোনের মুখে কথায় কথায় শর্বরীর বিয়ের কথা শুনে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি তিমির । প্রায় ঊর্ধ্বশ্বাসের ছুটে গিয়েছিল মামা বাড়িতে । ছোটবেলায় বারবার মামাবাড়ি যাওয়ার বায়নার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল শর্বরী । মামার বাড়ির পাশের বাড়িতে থাকতো শর্বরীরা । এখানে এলে মামাতো ভাই , বোন আর শর্বরীর সঙ্গে খেলা করত সে । খেলার ছলে কখন যে শর্বরীকে ভালো লাগতে শুরু করেছিল তা সে নিজেই বুঝতে পারেনি । পরে সে ভালোলাগা ভালোবাসাতে পরিণত হয় । কিন্তু শর্বরীকে তা কখনো বলা হয়ে ওঠেনি । আজ বলি কাল বলি করে না বলাই রয়ে গেল । একটু বড় হওয়ার পর ছুটিছাটাতে তিমির নিজেই চলে আসতো মামার বাড়িতে । শর্বরী তখন ব্যস্ত নিজেকে নিয়ে । কথাবার্তা সীমিত থাকতো কেমন আছো ? কখন এলে ? পড়াশোনা কেমন হচ্ছে ? ইত্যাদিতে .... তারপর পড়ার চাপ আর ক্যারিয়ারের দিকে নজর দেওয়ার ফলে মামা বাড়ি যাওয়াটা কম হলেও পয়লা বৈশাখের আগের দিন রাতে সে গিয়ে পৌঁছাতো সেখানে । কারণ ওখানকার বর্ষবরণের প্রভাতফেরীর মধ্যে মূল আকর্ষণ ছিল শর্বরী । শর্বরী সকাল-সকাল নতুন শাড়ি পরে হাজির হত মামা বাড়িতে । বড়দের প্রণাম করে বোনকে নিয়ে মিশে যেত প্রভাত ফেরীর দলে । সে তার মধুর কন্ঠে গাইতো বর্ষবরণের গান । যেটা ছিল তিমিরের কাছে সারা বছর তাকে না দেখে কাটানোর রসদ । কানেই তুলতো না ঠাকুমার বলা কথা - "দাদুভাই বৎসরের পেথ্থম দিন আপন বাড়িতেই থাইকতে হয় । তা নইলে হারা বৎসর বাড়ি ছাড়া হইয়া থাইকতে হয় ! তাই বলি কি শুনো মামা বাড়ি না হয় পরে কনো একদিন যাইও" । ঠাকুমার কথা শুনে তিমির মনে মনে বলতো -"ঠাম্মি থোরিই না আমার মন সারা বছর এখানে থাকে , সেই ছোটবেলা থেকে মামা বাড়িতেই পড়ে আছে শর্বরীর কাছে । শরীর থাকলে কি আর থাকা হয় ঠাম্মি ? মনের কি তাহলে কোনো দাম নেই ? মুখ ফুটে আর বলা হতো না কথাগুলো । বরাবরই চাপা স্বভাবের সে । তাই হয়তো শর্বরীও তার মনের খবর জানতে না পেরে সেদিন পর হয়ে গিয়েছিল । তারপর থেকে আর সেখানে যাওয়া হয়নি তিমিরের । মামা-মামি , ভাই-বোন কতবার করে বলেছে তাকে যেতে কোনো না কোনো বাহানায় এড়িয়ে গেছে সে । কার জন্যই বা যাবে সেখানে ? গেলেই তো স্মৃতিগুলো তাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে । তাই নিজের চাপা কষ্ট নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখে সে ।


কিন্তু সেদিন যখন খাবারের টেবিলে মায়ের সাথে মামিমার কথা হচ্ছিল , মামিমা বলছিলেন শর্বরীর কথা । ও নাকি এখন ওর বাপের বাড়িতেই থাকে । বছর আড়াই এর একটা মেয়ে আছে । ওর স্বামী নাকি একটা অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে । শ্বশুর বাড়ির লোকজন তেমন সুবিধার নয় । তাই বাধ্য হয়ে এখানে চলে আসা । ওর মাও মারা গেছে বেশ কয়েক বছর আগে । বাবা অসুস্থ । দাদা বৌদির সংসারে বাড়তি বোঝা হয়ে আছে । কাজ খুঁজে বেড়াচ্ছে । আরও একটা সংশয় সে কাজে বেরিয়ে গেলে বাচ্চাটাকে কে দেখবে ? এইসব বলে নাকি কান্নাকাটি করছিল মামির কাছে । মায়ের ফোনটা স্পিকারেই ছিল । শর্বরীর কথা শুনে খাবার যেন আর মুখেই উঠছিল না আর তিমিরের । বড্ড ইচ্ছে হলো তাকে দেখার । তাই আবার আসা মামা বাড়িতে । চৈত্র মাসের শেষ দিক । হাতে গোনা আর কয়েকটা দিনই বাকি পয়লা বৈশাখের । আজকাল দিনের বেলাটা একটু গরম বাড়লেও বিকেল বেলাটা একটা মিষ্টি হাওয়া বয় । যা শরীর মন দুটোকেই জুড়িয়ে দিয়ে যায় । মামা বাড়িটা গ্রাম্য অঞ্চলে । পরিবেশটা বেশ শান্ত ও মনোরম । চারিদিকে সবুজ আর সবুজ । রাস্তার একপাশে জনবসতি আর অন্যপাশে চাষের জমি । বিকেল হলে গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই আর ঘরে থাকেন না । যে যার মত রাস্তার ধারে এসে বসে গল্প করেন । বেশিরভাগ মহিলারা । রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে তিমিরের হঠাৎ চোখ পড়ল শর্বরীর দিকে । একলা বসে আছে সে । মেয়েটা পাশে খেলছে । তাকে একলা বসে থাকতে দেখে তিমিরও গিয়ে বসল তার পাশে । তিমিরকে পাশে বসতে দেখে শর্বরী উঠে যেতে উদ্যত হলে তিমির বলল - আমার পাশে বসতে কি তোর মানে... তোমার মানা আছে ?


- মানা কেন থাকতে যাবে ? তবে পাঁচজনে পাঁচ কথা বানাবে কি দরকার তাদের সুযোগ দেওয়ার ?


- লোকে কি বলবে তাতে কি আসে যায় ? আর তাছাড়া সবাই জানে আমরা ছোটবেলাকার বন্ধু। একসাথে কত খেলেছি । কত ঝগড়া করেছি । কই তখন তো কেউ কিছু বলেনি ?


- তখন আর এখনকার মধ্যে অনেক ফারাক । আর হ্যাঁ আমি চাইনা তুমি আমার পাশে বসো ।


- কিন্তু কেন ?


- কেন মানেটা কি ? তুমি কি সব আবোল তাবোল লিখে পাঠিয়েছো তোমার বোন কাছে !


-যেটা সত্যি সেটা বলেছি ।


- ভুল করেছো ! বিয়ের আগে যদি বলতে তবুও আমি ভেবে দেখতাম । কিন্তু এখন আর তা হয় না । তুমি কেন বুঝতে পারছ না তিমির দা ? আমার বিয়ে হয়ে গেছে ! আমার স্বামী নেই । আমি বিধবা । তার ওপর আমার একটা মেয়ে আছে । কোনো কিছু ঝোঁকের বসে বলা সহজ কিন্তু সেটা মেনে চলা বড্ড কঠিন । জীবন অতো সহজ নয় । তুমি না হয় আমায় মেনে নিলে কিন্তু তোমার বাবা-মা তোমার মামা-মামী মানবে ? তাদের কথা না হয় বাদই দিলাম তোমার ঠাকুমা ? যতদূর শুনেছি তিনি নাকি বেশ সংস্কারি মানুষ । তোমার মা আজও তার মুখের ওপর কথা বলতে পারে না । তাই বলছি ফিরে যাও তুমি । আর এখানে এসো না । আমাকে আমার মত থাকতে দাও প্লিজ । চলে যাও তুমি ।


শর্বরীর চোখে জল ছলছল করছে । যা সহ্য করা তিমিরের পক্ষে বড় বেদনাদায়ক । তাই বাধ্য হয়ে চলে এলো বাড়িতে । বোনের কথা মত সব জানালো সে তার মাকে । মা ছেলের কথা ভেবে তার বাবাকে মানাতে পারলেও ঠাকুমাকে কে জানাবে সেই নিয়ে সবাই বেশ উৎকণ্ঠিত । শেষমেষ তিমিরই গিয়ে সবকিছু জানালো তার ঠাম্মিকে । সব শুনে ঠাকুমা একগাল হেসে বললেন -"ও এই কথা । এ্যার লাইগা এত্ত যুক্তি আঁটা হগ্গলের । ওই জন্যই কই কয়দিন ধইরা সবাইরে যেন কেমন অন্ন অন্ন লাগে । বুইঝা উঠইতা পারতেছিলাম না । এ্তে মোর কোনো আপত্তি নাই । তুমি ভালো থাইকলে আমরা হগ্গলেও ভালো থাকুম দাদুভাই । তাছাড়া মাইয়াডারে তো দেখছি দুই একবার । বেশ ভালো বইলাই মনে হয় । ভালো থাকো তোমরা । তোমাদের সুখই মোর সুখ বুঝলা । এ্যার জন্য আবার এত রাক-ঢাক ।

তিমির উচ্ছ্বাসের সঙ্গে ঠাম্মিকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করল - তুমি খুশি ঠাম্মি ? আমি তো ভাবলাম তুমি রাজি হবে না ?


- কেন্ রাজি হমুনা শুনি ? বিধবা বইলা কি তার আর বিয়া হইবো না ? কচি একটা মাইয়া , সারাজীবন একলা কেমনে থাইকবে শুনি ? তুমি জানো আমার ঠাহুমাও ছিলেন বাল্যবিধবা । হোনা কথা , মায়ের মুখে শুইনছি । ঠাহুমারে আডারোশো ছাপ্পান্ন সনে বিদ্যাসাগর মশাই নিজে দাঁড়াইয়া থাইকা বিয়া দিছিলেন । তহন যদি হইতে পারে , আজ হইবো না কেন্ ? আর রইল বাচ্চা খানার কথা , তোমরা আজকাল দত্তক নাও না ? আগেও তো নিত । কারোর কথায় কান দিও না বাপু । নিন্দুক তহনও ছিল , আজও আছে , ভবিষ্যতেও থাইকবে । তারে লইয়া আসো দেহি কাল । কাল তো পহেলা বৈশাখ নতুন বৎসরে নতুন পুতি সমেত নাতবৌরে বরণ কইরা ঘরে তুলি দেকি ।

আজ পয়লা বৈশাখ । যেন ধুম লেগে গেছে তিমিরদের বাড়িতে । হাসি-আড্ডা , হই-হুল্লোড় , খাওয়া-দাওয়া সমেত তিমিরের লেখা গান শর্বরীর কন্ঠে -


এসো হে নবীন

এসো দ্বারে মোর ,

পুরাতন ছাড়ি তুমি

নিয়ে এসো ভোর ।

আলোকের ছটা এসে

ঘোঁচাক আঁধার ,

মুছে দিক খারাপেরে

যত আছে ভার ।

ভালোবাসা ফিরে পাক

ছোট্ট কুঠির ,

গরল তরলের ন্যায়

হয়ে যাক নীর ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ন্যায় বিচার - রূপবালা সিংহ রায় // Nay Bichar by Rupbala Singha Roy // Bengali Poetry // Pujor Kobita // Poetry On Durga Puja.

সবার আমি ছাত্র – সুনির্মল বসু // Sobar Ami Chatro // Teachers day poem

শরৎ - রূপবালা সিংহ রায় // Sorot Kobita // Durga Puja Kobita// পুজোর কবিতা // দুর্গা পূজার কবিতা।