বাংলা গল্প// ছোট গল্প// Bangla Golpo// Noboborshoer Golpo// Bengali Story ।
ভালো মানুষ
রূপবালা সিংহ রায়
আজ বাদে কাল পহেলা বৈশাখ। নতুন বছরের আগমন নিয়ে সবার মধ্যে কত উৎসাহ। বিশেষ করে যাদের টাকা-পয়সা আছে তাদের। যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় তাদের জীবনে কি আর অত উৎসব আসে। তাদের কাছে বছরের শেষ দিনটা যেমন বছরের প্রথম দিনটাও ঠিক তেমনি। চিন্তার ভাঁজ কপালে নিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা খেটে মরতে হয়, ছেলেপুলেদের মুখে দুটো ভাত তুলে দেওয়ার জন্য। তেমনি একজন দিন আনা দিন খাওয়া ঘরের ঘরনি হল শম্পা। তাদের বাস কলকাতা নামকরা এক ঘিঞ্জি বস্তির এক টুকরো কুঁড়ে ঘরে। ছোট ঘরে থাকলেও স্বপ্নটা তার বিশাল বড়। তার স্বপ্ন তার মেয়েদের নিয়ে। সে চায় না তার মেয়েরা তার মত করে জীবন অতিবাহিত করুক। সে চায় তারা বড় হয়ে বড় ঘরের মেয়েদের মতো ভালো জায়গায় চাকরি করুক, আর সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচুক। তাই সে তাদেরকে ভর্তি করেছে একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। খুব একটা নামকরা না হলেও পড়াশোনা মন্দ হয় না। তাই তার স্বামী আর সে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে তাদের পড়াশোনা করার টাকা পয়সা জোগাড় করার জন্য। বড় মেয়েটাকে পড়াতে তেমন কষ্ট হচ্ছিল না কিন্তু এবছর ছোটটাকেও ভর্তি করাতে গিয়ে বেশ হিমশিম খেতে হয়েছিল তাদেরকে। তাই সে আরও একটা বাড়িতে কাজ ধরেছে, চেষ্টা করছে আরও দু-একটা কাজেরও।
তিন বাড়িতে কাজ করা শেষ, বাকি বোস বাড়িটা। অন্য বাড়িগুলো থেকে পয়লা বৈশাখে কিছু না দিলেও বোস বাড়ির মাসিমা প্রত্যেক বছর মেয়ে দুটোকে নতুন জামা দেয়। ওপর থেকে কড়া হলেও মনটা খুব নরম তার। কিন্তু এ বছর বোধহয় আর দেবে না, দেওয়ার হলে আগেই দিয়ে দিত। প্রত্যেক বছর পয়লা বৈশাখের প্রায় সপ্তাহখানেক আগে সে জামা পেয়ে যায়। সেদিন শম্পা দেখেছিল মাসিমা আর তার বৌমা গেল কেনাকাটি করতে। কিন্তু এতদিন পেরিয়ে গেল তবুও কিছুই দিল না মানে দেবে না বোধ হয় এবছর। আর দেবেই বা কি করে? ছোট মেয়েটা কে ভর্তি করার জন্য আগাম পাঁচ মাসের টাকাটা যে নিতে হলো। সেই জন্যই বোধহয় এ বছর আর কিছু দেবে না! কিন্তু মেয়ে দুটো ওদিকে আবার হাঁ পিত্তেশ করে বসে থাকবে। হাতে টাকাও নেই যে দুটো জামা কিনে নিয়ে যাব ওদের জন্য। এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে বোস বাড়িতে তার কাজ শেষ। বাড়ি যাওয়ার সময় একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাসিমাকে বাড়ি যাওয়ার কথা বলতে গেলে মাসিমা তার হাতে ধরিয়ে দেয় কিছু টাকা।
সে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে -- কিসের মাসীমা? আমি তো...
-- এটা এই মাসের মাইনে।
-- কিন্তু আমি তো আগাম নিলাম। ওই যে মেয়ের ভর্তির সময়
-- ওটা তোর মেয়ের পয়লা বৈশাখের উপহার ছিল। তুই প্রতিমাসের টাকাটাই পাবি। আর এতে কিছু টাকা বেশিও আছে। ওটা তোর বকশিশ। ওটা থেকে মেয়েদের জন্য জামা কিনিস আর সেই সঙ্গে নিজের জন্য একটা শাড়িও। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে না থেকে বাড়ি যা দেরি হয়ে যাচ্ছে...
ঘাড় নাড়িয়ে ঠিক আছে বলে একরাশ ভালো লাগা নিয়ে বাড়ি ফিরে শম্পা। সত্যি আজও কিছু ভালো মানুষ আছে এই সমাজে। আর এই জন্যই বোধহয় সমাজটা টিকে আছে...
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন